ধিক্ বাঙালি পুরুষ!

0

মুমিতুল মিম্মা:

জীবনে প্রথম বাসে ওঠা শুরু করি ২০১১তে হলিক্রস কলেজে ভর্তি হবার পর থেকে। আজিমপুর থেকে রোজ সকাল ৭টার দিকে আমি বের হতাম তারপরে ২৭ নাম্বার বাসে করে ফার্মগেট। বাসে উঠতেন হাজারো নারী-পুরুষ। বাঙালি পুরুষের মনোবিকার প্রথম নিয়মিত টের পাই ঐ বাসে করে যাবার সময়ই।

আমি বরাবরই মহিলা সিটে বসতাম- মেয়ে হবার দায়ে নয়, পুরুষের ঘিনঘিনে ‘হাত’ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে। বাসের মহিলা সিটে বসেও কোনো কোনো সময় রক্ষা হতো না। একদিন ফার্মগেটে নামার মুহূর্তে এক পুরুষ ভীড়ের মধ্যে নিম্নাঙ্গে দিলেন যুতসই চাপ। সেদিন বাস থেকে নেমেই বমি করে ফেলেছিলাম।

বাসে বই পড়া আমার খুব বদঅভ্যাসের একটা। কেন বদঅভ্যাস বললাম? একদিন বাসে বসে সঞ্চিতা পড়ার ভীষণ মগ্ন সময়ে আমি চমকে উঠেছিলাম আমার উরুতে পাশের সিটের পুরুষের ‘ভীষণ আদুরে’ অথচ দৃঢ় স্পর্শে। আরেকদিন উত্তরা যাব, কিন্তু ব্যাগে কোন বই নেই। হাতের কাছে ছিল ‘খেলারাম খেলে যা’। ব্যাগে সেটা নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলাম। জানতাম না বইয়ের ভেতরে কী লেখা। সাভার থেকে লেগুনাতে উঠে বই নিয়ে বসলাম। পাশের সিটে একজন পুরুষ।

‘খেলারাম খেলে যা’র পাতায় পাতায় কচি মেয়ে পটানোর এবং তার সাথে মিলিত হবার বিবরণ (প্রথম প্রথম আমার তাইই মনে হয়েছিল) দেখে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল পুরো। পৃষ্ঠা উল্টে উল্টে আমি ভালোকিছু পড়ার জন্যে খুঁজছিলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম পাশের পুরুষের নিঃশ্বাস ইতোমধ্যেই ‘ঘন’ হয়ে এসেছে। বুঝে উঠতে পারলাম না প্রথমে পরে দেখলাম তার চোখ ‘খেলারাম খেলে যা’র উপরে! এক পৃষ্ঠা চটি পড়েও এরা ‘ঘন’ নিঃশ্বাস ফেলতে পারে! আহারে বাঙালি পুরুষ!

কালেকালে অনেক কিছুই দেখা হলো। সেই আমি, আমার অনেক মূল্যবোধ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কিন্তু বদলায়নি একটা জিনিস – বাঙালি পুরুষ! যাদের ‘উত্থান’ বড় ভয়াবহ বড় মারাত্মক। মাঠে ঘাটে মিটিং মিছিল সবখানে তাদের উত্থিত হয়ে যাবার একটা প্রবল আশংকা আছে। যখনই উত্থিত হবে এই উত্থান আশেপাশের মেয়েদের উপর প্রয়োগ করার আরেকটা তীব্র খোলামেলা বাসনা আছে বাঙালি মধ্যবয়সী পুরুষের। খোলামেলা বাসনা কারণ পুরুষ মানুষের শরমের কী? রাস্তা ঘাটে মা ডেকে ধর্ষণ করে ফেলার ভীষণ অভ্যাস প্রমাণ করে এই উত্থান কী মারাত্মক! 

ইনবক্সে অনেক ছেলের সাথে আমার কথা হয় লেখা নিয়ে, মূল্যবোধ নিয়ে। সেদিন আদারবক্সে দেখলাম এক মধ্য বয়সী বাঙালি পুরুষ আমাকে তার উত্থান দেখাতে চেয়েছেন ছবি পাঠিয়ে আর চেয়েছেন ‘লাগাতে’। ইনবক্সে ফুটন্ত গোলাপ হয়ে আমার বলতে ইচ্ছে করছিল, “আমি তো এসবের কিছুই জানি না। কীভাবে কোথায় লাগাতে হয় আমাকে একটু শিখিয়ে দাও না গো!” আমি তার ‘জ্যোৎস্নাস্নাত ঘন জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছখানা’ দেখলাম। বমি পেল না। কেন পেল না সেটা ভাবতে ভাবতেই জিজ্ঞেস করলাম প্রভাপিকে। ওর উত্তর না পেয়ে ভেবে নিলাম হয়তো এসব দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি অথবা বড় হয়ে গেছি! একজন মানুষ কী করে তার ব্যক্তিগত জিনিসের ছবি অচেনা মেয়েদের পাঠাতে পারেন তা আমার মাথায় আসে না। অবশ্য শিব লিঙ্গে দুধ ঢালা বাঙালি সমাজে উত্থিত লিঙ্গটাই হয়তো পুরুষত্ব দেখাবার সবচেয়ে বড় নিয়ামক। এখন আর তাই বাঙালি পুরুষের নোংরামি দেখতে দেখতে কাহিল লাগে না, বরং অপেক্ষা করি আরও কিছু দেখার জন্যে।

আমাদের চারপাশের নিপাট ভদ্র ছেলেরাই কোথাও না কোথাও গিয়ে পুরুষ হয়। আজ যে ছেলেটা আমার ভাই হয়ে ভদ্রভাবে আমার সাথে বাসে উঠছেন সেই ছেলেটাই অন্য কোথাও গিয়ে গা হাতড়াবেন মেয়েদের – এ কথা চোখ বন্ধ করে আমি বলে দিতে পারি। কেন পারি জানেন? কারণ মেধা আর মননে আপনি যত বড়ই হন না কেন আপনি উঠে এসেছেন বাঙালি পুরুষের মজ্জাগত নোংরামি নিয়ে। এটাকে অবশ্য বাঙালি পুরুষ কতটা নোংরামি বলে স্বীকার করে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। তাদের ভাষায় এটা তাদের ‘প্রয়োজন’ও হতে পারে।

আমার অবশ্য মাঝেমাঝে মনে হয় ‘বাঙালি পুরুষ’ একটা গালির নাম!

লেখাটি ৫,৬১৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.