পারিবারিক নির্যাতনকে ‘না’ বলুন

0

সুপ্রীতি ধর:

গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা শুনেছি। সেই থেকে মাথাটা ভারী হয়ে আছে। আজই যে নতুন শুনছি তা নয়, দিন যতো যাচ্ছে, বিষয়গুলোর ভয়াবহতা আমাকে স্পর্শ করছে বেশি করে। তার আরও একটি কারণ হচ্ছে, আমার অক্ষমতা। পেশার শুরুতে যখন নারী নির্যাতনের রিপোর্ট করতাম, তখন মনে হতো, আইন আছে, আইনের সংশোধন হচ্ছে, এতো এতো সভা-সেমিনার হচ্ছে নারী নির্যাতন বন্ধে, কাজেই সুফল একদিন আসবেই। কিন্তু এখন?

দিন যতোই যাচ্ছে, নির্যাতনের মাত্রা ব্যাপকতা পাচ্ছে, ধরন পাল্টাচ্ছে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কোনো কথা আর নেই, নারীমাত্রই নিপীড়নের শিকার। উচ্চঘরের হোক, বা বস্তিবাসীই হোক, কান্নার রং এক, সুরও এক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকতার জাহান জলির আত্মহত্যার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক ও ব্লগার বন্যা আহমেদ যখন তার প্রাক্তন স্বামীর উল্লেখ করে লিখেন যে, তিনিও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তার গায়েও হাত তুলেছিল তার স্বামী, তখন হোঁচট খাই। 

এই তো গেল শনিবার আমার বন্ধু নাহিদ সুলতানার ফোন, তখন সবে দুপুরে খেয়ে আলসেমি করছিলাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ। প্রথমে হতভম্ব হয়ে গেলেও মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করি,

কী হয়েছে রে?

– ‘আমার সুমি আর নাই রে সুপ্রীতি, সুমি মারা গেছে, সুমিরে ওর স্বামী মেরে ফেলছে’।

মাথায়ই ঢোকে না, কোন সুমি! নাহিদ জানায়, ওদের বাসায় কাজ করতো মেয়েটি, পরীর মা। সাথে সাথেই সুমির সুন্দর ফর্সা, হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠে। কী বলে, কীভাবে? 

বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে সুমি মারা গেছে। ও কদিন পরপরই বাচ্চা জন্ম দিতো একটা ছেলে বাচ্চার খায়েশ মিটাতে। ট্রাক চালক স্বামী বেধড়ক পিটাতো সুমিকে। নাহিদ অনেক বুঝিয়েছিল তাকে ফিরে আসতে, কিন্তু ও আসেনি। স্বামীর পরিচয় সমাজে বড়বেশি দরকার, এটা সুমি ছাড়া আর কে বুঝবে? তাছাড়া সুমিরও শারীরিক চাহিদা ছিল। সে তো আর তার স্বামীর মতোন বিভিন্ন পল্লীতে যাতায়াত করতে পারে না, তার একটা সাইনবোর্ড লাগে। এই সাইনবোর্ডই তার জীবনের কাল হয়ে গেল। 

মৃত্যুর পর ওর মৃতদেহটা যারা ধুয়েছিল, বস্তির সেই নারীরা জানিয়েছে, শরীরজুড়ে নীলচে দাগে ভরা ছিল সুমির। মরে যাওয়ার আগে মরা একটা ছেলে জন্ম দিয়ে গেছে সে শেষপর্যন্ত। নাহিদ এর কষ্টের জায়গা অনেক। তার মধ্যে অন্যতম হলো, এই যে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা সবাই সোচ্চার, এই যে নারী অধিকারের কথা বলি আমরা, কিন্তু ঘরের মানুষটাকেই তো বাঁচাতে পারি না। তবে এই আন্দোলন কোন কাজে লাগছে? কী করছি আমরা? বিরাট প্রশ্ন এখন নিজেদের কাছেই। 

এরকম হাজার হাজার লাখ লাখ সুমি প্রতিদিন মরছে বাংলাদেশে, কেউ একের পর এক বাচ্চা জন্মাতে গিয়ে, কেউ স্বামীর নির্যাতনে, কেউ বা নির্যাতন সইতে না পেরে নিজেই বেছে নিচ্ছে অকাল প্রয়াণ। এই তো নারীর জীবন!

সুমির ঘটনা বিস্মৃত হতে না হতেই সহকর্মী সাংবাদিক ইবতিসাম নাসিম মৌ এর ঘটনা সামনে এলো। ১৪ বছর সংসারের পর স্বামীটি এখন জেলে, ননদ-দেবরও ছিল জেলে, ছাড়া পেয়ে গেছে। স্বামীটিও পাবে অচিরেই। তারই তোরজোর চলছে। একাত্তর জার্নালে আজ মৌকে আনা হয়েছিল। তার কথা থেকে যতোটুকু জানলাম, আর প্রাক্তন সহকর্মী হিসেবে যতোটুকু জানি, ঘটনা তো নতুন না। পারিবারিক নির্যাতন, শাশুড়ি-ননদ-দেবরের নির্যাতন, তাতে স্বামীর প্রতিবাদ না করা মানেই সমর্থন দান। দিনের পর দিন এসব নির্যাতন সয়েছে মৌ। একবার এক ছেলে নিয়ে সে ডিভোর্স দিয়েছিল স্বামীকে। দুবছর পর আবার পারিবারিক সিদ্ধান্তেই একীভূত হওয়া। পরবর্তী জীবনে আরও দুই সন্তানের জন্মদান। এ নিয়ে তিন-তিনটি সন্তানের মা হওয়া। এর মাঝেই আবার নির্যাতন। ছেলেকে, মৌকে, এমনকি মৌ এর মায়ের গায়ে হাত তুলে ওর স্বামী, তাতে ইন্ধন ছিল বাকিদের। এটাই হয় শেষ পেরেক ঠোকা। মামলা করতে বাধ্য হয় মৌ। 

সৌন্দর্যে, ব্যক্তিত্বে, পেশাদারিত্বে অতুলনীয় এবং সাংবাদিক হিসেবে ক্ষমতায়িত মৌ যখন আজ নির্যাতনের মামলা করে স্বামীর বিরুদ্ধে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না, সমগ্র নারী সমাজের কী দুর্দশা আজ! সে তার লড়াইয়ে বন্ধুদের সহায়তা পাবে এটা নিশ্চিত জানি, কিন্তু গৃহকোণে, তিনটি সন্তান নিয়ে একজন মা যখন মৌ, তখন তার সেই লড়াইয়ে কে শামিল হবে? কেউ কি পারবে শামিল হতে? সেই লড়াইটা একা তারই হবে। আমি ভয় পাই সেই রাস্তাটুকুর কথা ভেবে। এ বড় কঠিন এবং কঠোরতম পথ, মসৃণতার লেশমাত্রও নেই। পারবে তো মৌ? আর তার তিনটি সন্তান? রাষ্ট্রের কোনো আইনই কি তাকে এই ব্যক্তি লড়াই থেকে মুক্তি দিতে পারবে? প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে ভিতরে। 

আরেকটি মেয়ে। ফেসবুকে সে আমার বন্ধুও না। উইমেন চ্যাপ্টার পড়ে সে। সেখান থেকেই আমাকে তার জানা। ইনবক্সে নক করে কিছু কথা বলতে চায়। ফোন নম্বর বিনিময় হলে আমি তার কথা শুনি। শুধু শুনিই আমি। কোনো জবাব নেই আমার কাছে। তারও তিনটি বাচ্চা। মৌ এর সাথে মিল আছে এই জায়গাটাতেই কেবল। স্বামী থাকে ফেলে দিতে পারে না, কিন্তু মায়ের ছেলে হয়ে আবার শাশুড়ির নির্যাতনের বিরুদ্ধেও কিছু বলে না। বার বার চলে গিয়েছিল মেয়েটি। স্বামী ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া একটি মেয়েকে যখন শাশুড়ি খ, চ এবং ম বর্গীয় শব্দ দিয়ে আঘাত করে, তখন মেয়েটির সত্ত্বায় লাগে, বিদ্রোহী হয়ে উঠে মন। কিন্তু তিনটি বাচ্চা তাকে প্রাণপনে আঁকড়ে থাকে বলে সে নুয়ে পড়তে পড়তে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে ক্রমশ:। কিন্তু তার যে অনেক ক্ষমতা আছে, নারীর যে ক্ষমতা অপরিসীম, এটা আমরা তাকে বুঝাতে চেষ্টা করছি। 

জানি না, সত্যিই জানি না। প্রতিদিন অসংখ্য মেয়ে ইনবক্স করে, মধ্যরাতে শারীরিক নির্যাতন, এমনকি মেরিটাল রেইপের শিকার হয়ে ঘেন্নায় গা ধুতে ধুতে অনেক মেয়ে আমাকে ফোন করে। ওদের কান্না আমার মধ্যেও ছড়িয়ে যায়। মাথা এলোমেলো লাগে। কিছুটা ফ্ল্যাশব্যাকও হয় আমার। 

মনে পড়ে যায় আরও একটি মেয়ের কথা। যে প্রতিটি দিন গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হতে থাকতো, ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকতো স্বামীর বীভৎস যৌন নির্যাতনের শিকার হবে ভেবে। কী বিকৃত ছিল সেইসব দিনগুলো। স্বামী এতোটাই পারভার্ট ছিল যে মেয়েটাকে রেখেও শান্তি পেতো না, প্রতিদিন গোপনে মেয়েটাকে পরখ করতো, কোথাও কোনো অঘটন ঘটলো কীনা! আজ এসব কাহিনী সুদূর অতীত। কিন্তু আসলেই কি অতীত?

এই যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মেয়েগুলো, এই যে সুমিরা মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, এই যে ইনবক্সের মেয়েগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন, প্রতিরাত, এর সমাধান কোথায়?

উইমেন চ্যাপ্টার পারিবারিক নির্যাতনকে ‘না’ বলুন শীর্ষক ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন লেখা ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একজন সম্পাদক হিসেবে শুরুটা করে দিলাম। বাকিগুলো পাঠকরা নিজেরাই লিখবেন, নিজের কথা, জানা গল্প। সব।  

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ২,৭৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.