পুরুষের অধিক যৌনানুভূতি ও নারীর অধিক ঢেকে থাকা

0

যারিন তাসনীম:

যদি কখনো নারীর পর্দা নিয়ে তর্ক করেন, খেয়াল করবেন তারা বলছে,  “পুরুষ মানুষ তো একটু ওরকমই, তাই বলে মহিলাদেরও এমন হতে হবে নাকি”? এই যে পুরুষ মানুষ একটু ওরকমই, এটা দিয়ে কিন্তু পুরুষের জাত মারেনি। জাত মেরেছে মেয়ে মানুষেরই।

পুরুষ মানুষ সমাজের কর্তা। তারা একটু আগডুম বাগডুম করতেই পারে। এতে দোষের কিছু নেই। মেয়ে হয়ে জন্মেছো, একটু রয়ে-সয়ে চলতে হবে। তোমাকেই ঢেকে থাকতে হবে।  এটা কম বেশি সকলের মতামত। মেয়ে মানুষকে ঢেকে থাকতে হবে, কারণ হাদিস মতে পুরুষের যৌনানুভূতি নাকি বেশি। তাই মেয়ে মানুষ দেখলেই পুরুষ মানুষের লালা ঝরে। এই লালা ঝরা বন্ধ করার জন্যই মেয়েরা গায়ে বোরখা চাপাবে, পুরুষের ঈমান রক্ষা করবে। পুরুষের ঈমান রক্ষা করার দায়িত্ব যেনো শুধুমাত্র নারীর।

পুরুষের যৌনানুভূতি যদি তারা কন্ট্রোল করে ঈমান রক্ষা করতে  না পারে, তাহলে গায়ে বোরখা চাপিয়ে, হাত, পা, মুখ ঢেকে নারীরা কতোদিন তাদের ঈমান রক্ষা করে যাবে? আর পুরুষের ঈমান রক্ষার দায়িত্ব একতরফাভাবে নারীর উপরই বা বর্তাচ্ছে কেনো? পুরুষের যৌনানুভূতি, এখানে পুরুষের করণীয় কি কিচ্ছু নেই? পুরুষের অনুভূতি যেহেতু বেশি, তাই তাদের তা কন্ট্রোল করার ব্যাপারে তাদেরই সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকা প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু তারা তা না করে খুব কৌশলে নারীর গায়ে মোটা কাপড় চাপিয়ে দিয়েছে।  এবং তারা সফল হয়েছে।  

তারা চেয়েছে, তারা অবাধে চলাফেরা করবে, রাস্তাঘাটে দুই চারটা মেয়ের শরীরে অনুভূতি বেশি, এই অযুহাত দেখিয়ে গুঁতো মারবে,  সুযোগ পেলেই তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের যৌনতা আর শারীরিক জোরের প্রমাণ দিতে ধর্ষণ করবে। হ্যাঁ, তারা সেসবই করছে। নিজেরা প্যান্ট, শার্ট পশ্চিমা পোশাক পরে ঘুরছে। দিনে চারবেলা অন্তত আটটা মেয়ের বুকে, নিতম্বে গুতো মারছে। যে যখন সুযোগ পাচ্ছে ৪,৫,৬ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে ২৫,২৬ বছরের কিশোরী পর্যন্ত তুলে নিয়ে শরীরের ক্ষুধা মেটাচ্ছে।  

তাদের ইন্দ্রিয় অনুভূতি এতোই বেশি যে, ভাইঝি, ভাগনী থেকে শুরু করে নিজের মেয়ে পর্যন্ত যৌন লালসার শিকার হচ্ছে। তাদের এই যৌনতার দায় সকল নারীর।  জ্বী হ্যাঁ, সকল মেয়ে মানুষের দায় এটি।  চার বছরের বাচ্চা থেকে সকল বয়সী নারীর।  তাই নিজেদের দায় এড়াতে চার বছরের বাচ্চা মেয়েটাকেও খেলার মাঠে যাবার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়।  মায়ের মনে ভয় হয়,  কখন জানি মেয়েটা কার লালসার শিকার হয়।

এই যে এতো রেখে ঢেকে চলছি, লাভের লাভ কি কিছু হচ্ছে? নাকি উল্টে পুরুষের ভেতর যৌনক্ষুধা বেড়ে যাচ্ছে?  তারা কি দায়সারা হয়ে যাচ্ছে না? অবশ্যই। তাদের মনে এটা পাকাপোক্ত ভাবে বসে যাচ্ছে,  আমার যৌনভূতি বেশি,  তাই একটা মেয়ের হাত দেখলে আমার সুরসুরি লাগতেই পারে। আমি তাকে ছুঁয়ে দেখতেই পারি। এই ধারণা আমরাই ঢুকিয়ে দিচ্ছি।

সবচেয়ে বেশি অবাক হওয়ার পালা তখন, যখন দেখা যায় বাচ্চা একটা মেয়ে আপাদমস্তক নিজেকে কালো কাপড়ে মুড়িয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে হাঁটছে।  এটা কি পর্দা? একটা বাচ্চা মেয়ের পর্দার কি আদৌ কোনো দরকার আছে? হয়তো আছে। পুরুষের তো আবার ‘অনুভূতি’ বেশি। তাদের মেয়ে হলেই হয়। চার, পাঁচ না ষোল, অতো কিছু ভাবার সময় আর কই! অথচ এর জন্য সবচেয়ে বেশি লজ্জা পাওয়ার কথা পুরুষের।  

তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মেয়েরা গায়ে মোটা কাপড় ঝুলায়। কিন্তু আফসোস, তারা লজ্জা নয় বরং গর্ব করে এমন নোংরা পুরুষত্ব নিয়ে। যে পুরুষত্ব রেহাই দেয় না বাচ্চা একটা মেয়েকেও। একটা পুরুষ যদি তার চোখ, মন সামলে রাখতে না পারে তাহলে তার দায় নিশচয়ই নারীর না। এটা পুরুষের অপারগতা, এটা পুরুষের ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্যই মূলত নারীকে ঢেকে রাখা। যতো দোষ এখন নারী শরীরের। পুরুষ মনের কোনো দোষ নেই। ওটা একটু আনচান করবেই।  

হায়রে নারীজাতি, আর কবে বুঝবে তোমাকে দাসী করে রাখার প্রক্রিয়া ঢেকে রাখা থেকেই শুরু। জীবনে ক’টা পুরুষ মানুষ নিজে টুপি আলখাল্লা পড়ে বউকে পশ্চিমা পোশাক পরিয়ে রাস্তায় বের হয়েছে, বলতে পারো? জানি এই উত্তর দেয়া সম্ভব না। কোনোদিন এমন কিছু হবেও না। কারণ তাতে পুরুষ মানুষের জাত যাবে। অথচ তুমি কতো সুন্দর বোরখা, হাত মোজা, পা মোজা, নেকাব লাগিয়ে পুরুষের ঈমান রক্ষা করে যাচ্ছো। কই, তোমার তো জাত যাচ্ছে না!  পুরুষ যদি আসলেই পুরুষ মানুষ হতো তাহলে তাদের অধিক অনুভূতি তারা নিজেরাই কন্ট্রোল করতো,  নিজের এলোপাথাড়ি মনকে নিজেই শান্ত করতো।  নারীকে ঢেকে থাকার দোহাই দিয়ে তাদের ঈমান রক্ষার দায়িত্ব চাপিয়ে দিতো না।  আসলে এরা ভীরু, পুরুষের মুখোশধারী সত্যিকারের কাপুরুষ।

লেখাটি ৭,৬২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.