ফেসবুক, চ্যাটিং এর যুগে মূল্যবোধের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে

0

মলি জেনান:

মানুষ হিসেবে জন্ম নেয়ার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা বোধহয় তাকে যাপিত জীবনের সমস্ত কনফিউশন পায়ে হেঁটে এগুতে হয়; আর বেঁচে থেকেই জীবনের পোস্টমার্টেম করে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই বাঁচতে হয়, এখানে কোন শর্টকার্ট নেই।

প্রতিনিয়ত নিজের জীবনের টক-ঝাল-মিষ্টি-নুনের হিসেব করেই কাটছে। কখনো কখনো হতাশ হলেও উপভোগ করি বেশ। তবে ধন্দে পড়ে যাই, যখন কেউ তার নিজের সমস্যা নিয়ে আসে এবং দেখি সমস্যাগুলো কিছু ব্যতিক্রম বাদে অনেকটাই সার্বজনীন।

ছাত্র অবস্থায় ছাত্র ইউনিয়ন, বিতর্ক এসব বিষয়ে জড়িত থাকার দরুণ ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ এবং হ্যাঁ কে হ্যাঁ, আর না কে না বলার সাহসটা অর্জন করতে পেরেছিলাম বলেই আমার সমবয়সি বা ক্লাসের বন্ধুরা আমার ঠিক বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি, একটু দূরত্ব আর সমীহ রেখেই চলতো। এটা একটা বড় গ্যাপ আমার জীবনে, যে আমার সমবয়সী তেমন কোনো বন্ধু নেই।

এবার আসল গল্পে আসি- সেদিন আমার এক কলিগের সাথে কথা বলছিলাম; আগেই একটু বলে নিই, তিনি বিয়ে করেছেন এখনো এক বছর হয়নি, খানিকটা প্রেম এবং পরবর্তিতে পারিবারিকভাবে বিয়ে। তো তিনি এক পর্যায়ে বলছেন-

-ভাই বিয়ে করে তো খুবই বিপদে আছি।

আমি বললাম- দেখুন যদি বউয়ের সমালোচনা করতে আসেন, তবে আগেই মুখ বন্ধ রাখুন; কারণ যে ব্যক্তি অন্যের কাছে নিজের সঙ্গী/সঙ্গীনীর সমালোচনা করে, আমি তাকে ব্যক্তিত্বহীন ও দুর্বল চরিত্রের মানুষ বলে মনে করি।

-না রে ভাই, খুবই সমস্যায় আছি কাউকে বলাও যাচ্ছে না।

-কী ব্যপার বলুন তো?

-দেখেন ফেসবুকে আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে, যাদের সাথে প্রায়ই আমার টুকটাক চ্যাটিং হয়, কথাবার্তা হয়; এর মধ্যে কয়েকজন মেয়েও আছে। কিন্তু আমার বউ কয়েকদিন ধরে এটা নিয়ে খুবই ঝামেলা করছে। তাকে বুঝাতে পারছি না যে অনলাইনের এই যুগে এটা কোনো বিষয় না, আর এসব জাস্ট ফ্রেন্ডলি কনভারসেশন।

-হ্যাঁ, এরকমটা তো হতেই পারে। আমারও অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে, যাদের সাথে কথা হয় তার মধ্যে ছেলেও আছে। আসলে সমস্যাটা কোথায় বলুন তো? ফ্রেন্ডলি কনভারসেশন তিনি বুঝবেন না কেন? উনি আপনাদের কি কথোপকথন দেখেছেন?

– আরে বলবেন না একজনকে কয়েকটা স্টিকার পাঠিয়েছি, দেখুন।

বলে তিনি আমাকে তার পাঠানো স্টিকারগুলো দেখালেন- ‘ইন লাভে’র যে স্টিকারগুলো আছে তার দুই-তিনটা স্টিকার। একটা লাভ সিম্বলের আড়ালে কাছাকাছি দুই মুখ, শুধু একা লাভ সিম্বল ধরে রাখা, এক ছাতার নিচে দুইজন আর তা থেকে ঝরে পড়ছে ভালোবাসার বৃষ্টি এই রকম। তো, আমি স্টিকারগুলো দেখে হাসছিলাম। তিনি রুষ্ট হয়ে বললেন –

-আপনি হাসছেন, আমি খুবই বিরক্ত হচ্ছি সে আমার ইনবক্সে ঢুকবে কেন?

-হ্যাঁ, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সে আপনার ইনবক্সে ঢুকবে কেন? এটা নিয়ে পরে কথা বলবো, তার আগে বলেন যে স্টিকারগুলো আপনি পাঠিয়েছেন, তার মানে কি আপনি জানেন? লাভ সিম্বলের আড়ালে কাছাকাছি দুটো মুখ- হতে পারে তারা একে-অপরকে চুমু খাচ্ছে, কিংবা গালে গাল ছুঁয়ে আছে আর এক ছাতার নিচে দুজন থাকলে ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরে কখন, বলুন তো।

-আরে ভাই এটাতো জাস্ট ফ্রেন্ডলি কনভারসেশন। আমি অত ভেবে চিন্তে পাঠাইনি। আর সে বিবাহিত, দুটো বাচ্চাও আছে।

-না, এটা মোটেও ফ্রেন্ডলি কনভারসেশন নয় (বেশ দৃঢ়তার সাথে বললাম)। আপনি কি আপনার সকল বন্ধুদের এমন স্টিকার পাঠান, কিংবা সকল মেয়ে বন্ধুকে পাঠান? না বিশেষ কোন কোন বন্ধুকে পাঠান? আপনি আরেকজনের বউকে ‘চুমা-চাট্টি’ পাঠিয়ে প্লিজ তাকে ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ বলে জেনারেলাইজ করার চেষ্টা করবেন না। বলছেন সে বিবাহিত, সে কি আপনার সাথে এই বন্ধুত্ব তার সঙ্গীসহ উপভোগ করেন, নিশ্চয় না? আপনি যেমন আপনার বউ এর আড়ালে এই বন্ধুত্ব উপভোগ করেন, যার সাথে করছেন সেও তার সঙ্গীর আড়ালেই তা উপভোগ করেন, এবং একসময় এগুলো পাশে সরিয়ে নিজের কাজ ও স্বামী-সংসার-সন্তানে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

দেখুন দুজন মানুষ তাদের সবচেয়ে কাছের আপনজনদের আড়াল করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটা সম্পর্ক উপভোগ করছে, এটা আর যাই হোক বন্ধুত্ব নয়। বন্ধুত্ব অন্য রকম কিছু, তা আড়াল করার প্রয়োজন নেই, তা আপনাকে কখনোই হীনমন্য করে তুলবে না, বরং এগিয়ে যাবার প্রেরণা দেবে। আর এই যে আড়াল, এই আড়ালের উপভোগ যখন আপনার ভালো লাগা বাড়িয়ে দেবে, তখন আপনি আপনার সঙ্গীকে ঠকাবেন, আপনার মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হবে এবং আসলে ঠকবেন আপনি নিজেই। হ্যাঁ, আপনার স্ত্রী আপনার ইনবক্সে ঢুকে অন্যায় করেছেন, এমনও তো হতে পারে আপনার আচরণ তাকে বাধ্য করেছে আপনার প্রতি কৌতুহলী হতে।

দেখুন, সংসার দুজন মানুষকে এতটাই কাছাকাছি এনে দেয় যে একজন মানুষ আরেজনের সকল আচার-আচরণ, দোষ-গুণ, ভালো-মন্দ চুলচেরা বিশ্লেষণ করবার সুযোগ পায়, তাই একজনের সামন্যতম পরিবর্তনও আরেক জনের চোখ এড়ায় না।

– আপনার সাথে কথাবলার একটা বড় বিপদ হচ্ছে কী জানেন, যে, সহজ সাধারণ বিষয় নিয়ে কখনোই ভাবতাম না, আপনার সাথে কথা বললে তা নিয়েও ভাবতে হয়। আপনি তো আমারে বিপদে ফেলে দিলেন, এখন কী করা যায় বলেন তো?

– আমি দুঃখিত আপনাকে বিপদে ফেলে দেয়ার জন্য! কিন্তু এটা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবার কিছু নেই, এরকমটা হতেই পারে, তবে আপনি এখন কী করবেন, তা আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুধু এতোটুকু বলতে পারি যে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন কোন সম্পর্কটা আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ! এটা জানতে পারলে বিষয়টা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। আপনি চাইলেই যে সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলছেন, তাকে সত্যিই একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে উন্নীত করতে পারেন, যা নিয়ে আপনাকে হীনমন্যতায় ভুগতে হবে না; আর চাইলেই বিপরীত কিছু হতে পারে সেক্ষেত্রে হয়তো ঝামেলা এড়ানোর জন্য ঘরে ঢুকাবার আগেই সমস্ত কনভারসেশন ডিলিট করে ঢুকবেন, অন্য অনেকেই যা করে থাকেন। যা হবে আপনার মনোবিকৃতির প্রথম ধাপ এবং শ্রদ্ধা-বিশ্বাস-ভালোবাসা পূর্ণ দাম্পত্যের চিতার প্রথম কড়িকাঠ।

এটা একেবারেই আমার ব্যক্তিগত মতামত, আপনার সমস্যার সমাধান আপনাকেই করতে হবে। আর একটা বিষয় বলতে চাই, মানুষের মন কখনোই কোন সম্পর্কের দাস নয়, এমনকি দাসেরাও একসময় বিদ্রোহ করে। তাই কখনো একটা সম্পর্কে থাকা অবস্থায় আরেকটা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে যে সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তাকেই প্রাধান্য উচিত এবং এ ব্যাপারে সঙ্গী/সঙ্গিনীর সাথে সরাসরি কথা বলার মতো সাহস থাকতে হবে।

-ধন্যবাদ আপনাকে, আমার জন্য অনেক বকবক করতে হলো। তবে বিষয়গুলো কথনোই এভাবে ভাবিনি। থাকুন, পরে কথা হবে।

এই বলে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়েই তিনি চলে গেলেন। আর আমি ভাবছিলাম সত্যিই প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে পুরো পৃথিবীটাই মানুষের হাতের মুঠোয় ছোট্ট একটা ডিভাইসের মাধ্যমে। ফোন, ক্যামেরা, ইন্টারনেট, কী নেই; ভৌগোলিক দূরত্ব এখন কোন বাধাই নয়। চাইলেই যে কারও সাথে কথা বলা যাচ্ছে, এমনকি তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও আপনি শুনতে পাবেন, ইনবক্স করতে পারছেন মূহুর্তেই, এমনকি স-শরীরে যেখানে আপনি পৌছাতে পারবেন না (অন্য কারো বেডরুমে), সেখানেও আপনি ঢুকে যাচ্ছেন ভিডিও কলের মাধ্যমে।

তাই এই প্রযুক্তির ঠিক কতটুকুন আপনি নেবেন, কতটুকুন নেবেন না, তা কেউ আপনাকে ধরে বেঁধে শেখাতে পারবে না। এটা কোনো নিয়মকানুন দিয়ে সীমারেখা টানার বিষয় নয়। আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে আপনি কতটুকুন গ্রহণ করবেন। শুধু সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয় সকল কাজেই পরিমিতিবোধ জানাটা জরুরি। কোনো আইন দিয়ে সম্পর্কের সীমারেখা শেখানো যাবে না। আপনার সীমাবদ্ধতা আর পরিমিতিবোধই আপনাকে শিখিয়ে দেবে কোন সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আর এটা আপনাকেই করতে হবে। আপনার মানবিক মূল্যবোধের দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 564
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    564
    Shares

লেখাটি ১,৯২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.