নিঃসঙ্গতা কি পুরুষের একার?

0

মালবিকা লাবণি শীলা:

আমার এক বান্ধবীর একটি বাচ্চা সহ প্রথম বিয়েটা ভেঙে যায়। ও অনেকদিন একা থাকার পর চল্লিশের কোঠায় যাবার পর ওর জীবনে একটি প্রেম আসে। দুজনের ইচ্ছেয় আর পছন্দে বিয়ে হয়  খুব গোপনে। কিন্তু কেন এই গোপনীয়তা?
কারণ, ছেলেটি ওর চেয়ে পনেরো বছরের ছোট। লোকে শুনলে কী বলবে!

অথচ দশ, বিশ, ত্রিশ অথবা তারচেয়েও বেশি বয়সের পার্থক্য সত্ত্বেও পুরুষের জন্যে এই অসম বিয়েকে কিন্তু খুব একটা দোষের চোখে দেখা হয়না। অথচ এটাকে কিছুটা হলেও দোষের চোখে দেখা উচিত।
কেন? পুরুষের গড় আয়ু নারীর তুলনায় কম, এটাই তো অনেক বড় একটি কারণ। বিপত্নীক পুরুষের জন্যে পুনর্বিবাহ খুব একটা অসুবিধাজনক হয় না। অপরপক্ষে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হলেও বিধবা নারীর জন্যে দ্বিতীয় বিয়েটা সামাজিকভাবে উদারতার সাথে মেনে নেয়া হয়না।

বিপত্নীক পুরুষের সন্তানাদি থাকলে সমাজের সবার চোখ করুণার জলে ভেসে যায়। আহারে! কে মানুষ করবে বাচ্চাদের, বাবা তো চাকরি করে একা ঘরে ফেরে, কে তার দেখাশোনা করবে! আর বাচ্চাসহ একজন বিধবার ক্ষেত্রে সমাজের কঠোর দাবী থাকে, সন্তানদের মানুষ করো, চাকরি করো, ঘরে এসে রান্না করো, কিন্তু ভুলেও নিজের মানসিক, শারীরিক চাহিদার কথা মনে এনোনা। যেন মেয়েদের চাকরি করে ঘরে ফেরাটা পুরুষের তুলনায় কম ক্লান্তিকর।

আমার বাবার এক কলিগ সন্তানের জন্মের কিছু পরেই স্ত্রীকে হারান। উনি আর বিয়ে করেননি। দাদা বৌদির সাহায্য নিয়ে সন্তানকে বড় করেন। তাঁর প্রসঙ্গ এলে সবাই বেশ গদগদ হয়ে যায়। অথচ কতো শতো মা যে এই একা সন্তান মানুষ করে যাচ্ছেন তাঁদের কথা কেউ বলেনা। আমার এক ক্লাসমেইটের মা অল্প বয়েসে দুটো বাচ্চা নিয়ে বিধবা হবার পর ভাইদের বাড়িতে থেকে নিজের ব্যবসা চালাতেন। তাঁর একটি প্রেম হয়েছিলো। ভাইয়েরা তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের ঘোর বিরোধী। শুধু মাত্র সেই প্রেমের কারণে সেই ভদ্রমহিলার সারা শহরে বদনামের অবধি ছিলো না।

যারা মারা গেছে তারাতো চলেই গেছে, কিন্তু যারা বেঁচে আছে তাদেরকেও জীবন্মৃত অবস্থায় কেন থাকতে হবে? সিঙ্গেল প্যারেন্টের জন্য তাঁদের সন্তানরা এক বিশাল অবলম্বন হিসেবে কাজ করে, কিন্তু এই সন্তানই মায়ের জীবনে সুখ অথবা দুঃখের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কিছুটা বুঝতে পারলে অনেক সন্তান তাদের মায়ের একাকীত্ব অনুভব করতে পেরে মায়ের জীবনে কারো উপস্থিতিকে স্বাগত জানায়, আবার কিছু সন্তান মা কোনো সম্পর্কে জড়ালে সমাজের শিখিয়ে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী এর বিরোধিতা করে মায়ের সাথে দূরত্ব তৈরি করে, ভুল বোঝে। তখন সেই মাকে বাধ্য হয়েই নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছা জলাঞ্জলি দিতে হয়।

একজন মানুষের সঙ্গী খোঁজার মূল কারণ তো শুধু শারীরিক নয়। মানসিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক অনেক সমস্যাই দুজন মিলে মোকাবিলা করলে সহজ হয়ে আসে। বাচ্চারা পড়াশোনা শেষে যে যে যার যার পেশায়, সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন প্রৌঢ়ত্বে অথবা বার্ধক্যে পৌঁছে যাওয়া মা বেচারির সুখ দুঃখের কথা বলারও কেউ পাশে থাকবে না।

সব দেশে সব সমাজেই এই সমস্যাগুলো বর্তমান। কিছুটা উদারতা আর সহানুভূতি দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করলে অনেক নিঃসঙ্গ দুঃখী মানুষের জীবনও ইতিবাচক দিকে বদলে যেতে পারে। যেটা সামাজিক উন্নয়নেও সহায়ক হবে। কিছু সুখী মানুষ মিলেইতো একটি সুন্দর সমাজ গড়তে পারে। ব্যক্তিগত ভাবে হতাশ আর রিক্ত মানুষের পক্ষে সমাজে ভালো কিছু দেয়া সম্ভব নয়।

লেখাটি ৫,১৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.