প্রিয় জননী, সন্তানরা ছেড়ে যায়নি তোমায়

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

বাংলাদেশে তিনিই একমাত্র মা নন যিনি বুকের কলিজা কেটে দিয়েছেন আমাদের স্বাধীনতার জন্যে। কিন্তু তিনি আমাদের সেই সব মায়েদেরই মূর্তরূপ- লক্ষ মায়ের রূপ যেন তাঁর চেহারায় আমরা দেখেছি।

সেই সব লক্ষ লক্ষ মা যারা বুকে পাথর চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে পুত্রকে বলেছেন, ‘যা, দেশের জন্যে তোকে কোরবানি করে দিলাম’। আমরা জানি এই কথাটিই তিনি তাঁর পুত্রকে বলেছিলেন বাহাদুর পুত্র যখন দেশের মুক্তির জন্যে যুদ্ধে যেতে মায়ের অনুমতি নিতে এসেছে। আরও লক্ষ তরুণ যারা দেশ-মায়ের জন্যে জন্মদাত্রী মাকে ছেড়ে গিয়েছিল যুদ্ধে ওরা হুবহু এই শব্দগুলিই হয়তো সবাই বলেননি, কিন্তু ত্যাগটা তো একই- দেশের জন্যে পুত্রকে বা কন্যাকে কোরবানি দিয়েছেন।

তিনি কী করে এইসব লক্ষ মায়ের মূর্তরূপ পরিগ্রহ করলেন? কারণ তিনি পুত্রের লড়াইটাকে নিজেও ধারণ করেছেন এবং লক্ষ মায়ের হয়ে সারা পৃথিবীর সামনে বলেছেন, আমার এই দেশে আমার পুত্রের, আমাদের লক্ষ মায়ের লক্ষ পুত্রের ঘাতক যারা, পশুদেরও অধম পশুরা, ওদের বিচার করতে হবে। এবং তিনি আমাদের কাছে এলেন, আমরা যারা তাঁর পুত্রের প্রজন্ম এবং তার পরের প্রজন্ম এবং তার পরের প্রজন্ম। আমাদেরকে তিনি বললেন, তোমরা কি এইসব ঘাতকদের বিচার করবে না?

আমরা আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমিতে হতবাক হয়ে দেখলাম, সেইসব কৃমিকীট সম ঘৃণিত প্রাণীগুলি ময়লা আবর্জনার স্তুপ থেকে মাথা বের করছে। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম, আমাদেরই সমর নায়কদের একজন রাষ্ট্রনায়ক বনে এইসব ঘৃণিত প্রাণীগুলিকে পাশে টেনে নিয়েছে। আমরা তীব্র ঘৃণা ওর ক্ষোভের সাথে দেখেছি আমাদেরই মহাসড়কে সেইসব পশুরা আমার প্রাণপ্রিয় পতাকা, তাঁর পুত্রের রক্তমাখা পতাকা, ওরা ওদের বাহনে হেলায় ঝুলিয়ে রেখেছে। আমাদের শত্রুর পোষা কুকুরের আমাদেরই ভিটায় এসে আবার আমাদের দিকে মুখ ব্যাদান করে ভয় দেখিয়েছে।

তিনি আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের বিরুদ্ধে বলেছেন এবং ওদের বিচার দাবী করেছেন। গণ-আদালত করে বড় পশুটার প্রতীকী বিচার করেছেন। ওরা কিন্তু তাঁকে ছেড়ে কথা বলেনি। এইখানে এই বাংলাদেশে, যে দেশটি সৃষ্টির জন্যে তিনি তাঁর হৃৎপিণ্ডের একটি টুকরো কেটে দিয়েছেন, সেই দেশে পুলিশ তাঁকে লাঠিপেটা করে তাঁর রক্ত ঝরিয়েছে রাজপথে। তাঁর নাম ধরে ব্যঙ্গ করেছে শয়তানেরা। এবং ঐ যে বদরদের রানী একটা আছে না? গোলাপি শাড়ী গোলাপি লিপস্টিক? ঐ মহিলা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার।

আপনি ভাবুন, জননী যিনি বুকের ধন কোরবানি দিয়েছেন এই দেশটির জন্যে এই রাষ্ট্রটির জন্যে- তাঁকে এই দেশের আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ নিয়ে। এবং, এই অপরাধ এই গ্লানি আমরা কী দিয়ে মুছবো? তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ মাথায় নিয়েই।

কিন্তু জননী তো জননীই। রাষ্ট্র যা খুশী তাই করুক, সরকারগুলি যেখানে খুশী সেখানে গিয়ে আনুগত্য বন্ধক রাখুক, এই দেশের সন্তানেরা জননীকে ত্যাগ করেনি। আপনি কি দেখেননি ২০১৩ সালে লক্ষ লক্ষ মানুষের মাথার উপরে জননীর ছবি জ্বলজ্বল করছিল আপন মহিমায়। আমি সেদিন শাহবাগে কী আনন্দে কেঁদেছি, যখন দেখেছি সংশপ্তকের মতো হাজার রুমি সেখানে আম্মাকে বুকে ধরে আলবদরের ফাঁসির জন্যে প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়ে ছিল।

আজকে আম্মার জন্মদিন। ধন্য গো জননী তুমি, তুমিই যেন আমার দেশ, তোমার সন্তান রুমি মরে না, একজনের জায়গায় হাজার জন্ম নেয়। আমাদের ভালোবাসায় আমাদের অহংকারে আমার জন্মভূমি আর আম্মা একাকার হয়ে যায়। জননী। ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি, আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।

লেখাটি ৪২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.