একজন কাসেম বিন আবুবাকার, পেডোফিলিয়া ও বাঙলাদেশের মিডিয়া

আশরাফ মাহমুদ:

কাসেম বিন আবুবাকার ‘লেখক’ হিসেবে যাই হোক না কেনো, তার বক্তব্য ও লেখনী পড়ে মনে হয় লোকটি একজন পার্ভাট, সম্ভবত একজন পেডোফাইল (pedophile)। উচিত তাকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা, সাইকোলজিক্যাল টেস্ট করা (পেডোফিলিয়ার জন্য), এবং তার মানসিক চিকিৎসা করা।

তিনি মিডিয়ায় যে বক্তব্য দিয়েছেন- শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া তার এক ছাত্রীর প্রেমে পড়া এবং তার প্রতি আকৃষ্ট  হওয়া, এটি পেডোফিলিয়ার লক্ষণ। তার প্রচুর লেখনীতে-ও এইসব উপাদান আছে (যেমন- ছোট মেয়ে লজিং মাস্টারের প্রেমে পড়ে এবং পরে তাদের মাঝে প্রেম হয় ইত্যাদি)। অন্য কোনো দেশ হলে (যেসব দেশে ধর্ষণ, নারী ও শিশু অধিকার, এবং শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে যথেষ্ট আইন আছে এবং তা প্রয়োগ করা হয়) এতোদিনে তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। অথচ আমাদের দেশে অনেকে ব্যাপারটাতে “রোমান্টিকতা” খুঁজে পাচ্ছেন, মিডিয়া এই পার্ভাটকে মাথায় তুলছে, সাক্ষাৎকার নিচ্ছে।

পেডোফিলিয়া হচ্ছে শিশুদের প্রতি (বয়ঃসন্ধি-পূর্ব শিশুদের প্রতি, সাধারণত ১৩-১৫ বছর বয়েসের কম শিশুদের প্রতি) যৌন-আকর্ষণ অনুভব করা, তাদের সাথে যৌন-কাজে লিপ্ত হওয়া, শিশু পর্নগ্রাফি সংরক্ষণ কিংবা উপভোগ করা। এটি একটি মানসিক বৈকল্য, যার পেছনে মস্তিষ্কে গোলযোগ ও অন্যান্য সামাজিক কারণ আছে। এটি চিকিৎসা করলে-ও কখনো পুরোপুরি সারে না, ভালো চিকিৎসা হলে অস্বাভাবিক আচরণ কমে এবং নিয়ন্ত্রণে থাকে। পেডোফিলিয়ার জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা, শিশুদেরকে পেডোফাইলদের কাছে থেকে নিরাপদে রাখার জন্য।

এখানে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যে পেডোফাইল হওয়ার জন্য শিশুদের যৌন নিপীড়ন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই, বরং বক্তব্য ও আচরণে যদি এইরকম সম্ভাবনা পাওয়া যায় (যা কাসেমের বক্তব্য ও লেখনীতে পাওয়া যায়) তবে তাকে পরীক্ষা করা দরকার। তার অনেক “উপন্যাস” পেডোফিলিয়া পর্নগ্রাফি। গবেষণা মতে, চাইল্ড পর্নগ্রাফি “জমানো” বা সঞ্চয় করা, কিংবা উপভোগ করা পেডোফিলিয়ার অন্যতম প্রিডিক্টর (অর্থাৎ, চাইল্ড পর্নগ্রাফি উপভোগ বা সঞ্চয় করলে তার পেডোফাইল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি)।

কথা হচ্ছে কাসেমের লেখনী এতো জনপ্রিয় কেনো?

সাইকোলজিক্যাল গবেষণা থেকে জানা যায় যে একটি বক্তব্য, আইডিয়া জনপ্রিয় ও টিকে যাওয়ার পেছনে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন- সেই আইডিয়াটি সরল-সহজ, অপ্রত্যাশিত, ও আবেগপ্রবণ হতে হবে। আমার মনে হয় এই ব্যাপারগুলো কাসেমের লেখার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বোঝা যায় তার লেখনী জনপ্রিয় কেনো।

তার অধিকাংশ লেখা সরল-সহজ, সেইসবে জীবনের রহস্য ও দর্শন নাই; যেকোনো শ্রেণির পাঠক (তার পাঠকশ্রেণির পড়াশোনা ও আর্থসামাজিক অবস্থার কথা মাথায় রাখেন) পড়ে “বুঝতে” পারে, উপভোগ করতে পারে। আমরা যারা ইলিয়াস, আজাদ, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির ইত্যাদি জনের লেখা নিয়ে উচ্চমার্গীয় কথা বলি, কীভাবে তাদের লেখা কালজয়ী- এইসব লেখা কিন্তু কাসেমের পাঠকশ্রেণির মনে আবেদন সৃষ্টি করে না। একজন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, যে বাঙলার চেয়ে আরবিতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করে, কিংবা সামাজিকভাবে অবহেলিত তার কাছে কাসেমের লেখা উপভোগ্য, কারণ সহজ-সরলতার কারণে (নায়িকা নায়কের প্রেমে পড়ে, তাদের মাঝে প্রেম হয়, তারা সুখী হয়; কিংবা নায়ক ব্যথা পেয়ে অন্য আরেকজনকে খুঁজে নেয়; সহজ ও সরল)। যেহেতু একটি সমাজে এই ধরনের পাঠকের সংখ্যা বেশি তাই তার লেখার পাঠ-ও বেশি।

তার লেখায় কিছু অপ্রত্যাশিত উপাদান আছে। যেমন- গরিব ছেলে বড়লোক মেয়ের সাথে সিঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে প্রেমে পড়ে, তাদের মাঝে প্রেম হয়, “সমাজ ও বাস্তবতার” বিরুদ্ধে তাদের প্রেম জয়ী হয়; কিংবা রক্তে লেখা চিঠি। আমরা যখন কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা কিংবা উপাদানের সম্মুখীন হই তখন সেটি আমাদের মনে থাকে বেশি; অপ্রত্যাশিত তথ্য ও ঘটনা থেকে আমরা বেশি শিখি। কাসেমের লেখার এইসব অপ্রত্যাশিত (তার পাঠকের কাছে) উপাদান তার পাঠকের মনে দাগ কাটে, সে বিনোদন পায়।

কোনো ঘটনা কিংবা বক্তব্য যদি আপনার মাঝে আবেগ সৃষ্টি করতে পারে (ভালো কিংবা মন্দ) এবং সেই সৃষ্ট আবেগ যদি গভীর ও তীব্র হয় তবে সেই ঘটনা কিংবা বক্তব্য বেশি মনে থাকে। আপনার জীবনের বড় বড় ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবলে দেখবেন যে এইসবের সাথে কোনো তীব্র আবেগ জড়িয়ে আছে। কাসেমের লেখায় প্রচুর আবেগ, তার লেখায় নায়িকা নায়কের জন্য উপবাসে যায়, সবকিছু ছেড়ে চলে আসতে চায় ইত্যাদি।

আর-ও কিছু কারণ আছে। ধর্ম ও যৌনতা। মানুষের লেখনী-ইতিহাস মূলত ধর্ম ও যৌনতার ইতিহাস। ধর্ম ও যৌনতার প্রভাব সর্বকালে সব সমাজে ছিলো, আছে। কাসেমের লেখায় দুটোই পাওয়া যায় এবং তাদের জগাখিচূড়ী আছে। সে জানে যে বাঙালি তরুণ মুসলমান সমাজ ধর্মে-ও আছে, আবার অদমিত যৌনতার বহিঃপ্রকাশে-ও আছে। তাই তার উপন্যাসের নায়িকা হিজাবী, আবার বোরকা পরে কিস করে। ফলে গাছেরটা-ও পাড়া হলো, ও নিচেরটা-ও কুড়ানো হলো।

তার উপন্যাস নারী-বিদ্বেষী (তার উপন্যাসের নারীরা “অবলা”, নায়কের জন্য সব ছেড়ে আসে, স্বামীর সেবা করাই ব্রত্য) ও পুরুষপ্রধান সমাজকে তুলে ধরে। তার পাঠকশ্রেণির অধিকাংশের মনোভাব তাই, এবং তার লেখা সেইসব মনোভাবকে দৃঢ় ও তীব্র করে।

এইসব কারণে তার লেখা জনপ্রিয়। জনপ্রিয় লেখার একটি খারাপ দিক হচ্ছে যে যেহেতু এটি অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছায়, সেহেতু অনেক খারাপ নেতিবাচক বক্তব্যকে ছড়িয়ে দেয়। কাসেমের লেখার পেডোফিলিয়া ও অদমিত যৌনাচারণ তার পাঠকশ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে।

পেডোফিলিয়া নিয়ে কথা বলা দরকার। বাঙলাদেশে এই ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষের যথেষ্ট ভালো ধারণা নেই। আপনার শিশু-ও পেডোফাইলের শিকার হতে পারে। অধিকাংশ ধর্ষণ যেমন “ধর্ষিতার” নিকটতম বা পরিচিত কোনো ধর্ষকের দ্বারা ঘটে তেমনি পেডোফিলিয়া-ও পরিচিত ও নিকটতম লোকের দ্বারা ঘটে (যেমন- শিক্ষক, পাশের বাসার কেউ, নিকটতম কিংবা দূরসম্পর্কের চাচা-মামা-খালা ইত্যাদি)।

যৌন-আক্রমণের আগে কিন্তু লক্ষণ পাওয়া যায়, পেডোফাইলরা একদিনেই যৌনকাজে লিপ্ত হয়ে যায় না, শিশুটিকে তারা “পরখ” করে দেখে, শিশুর মানসিক ও শারীরিক অপরিপক্কতার সুযোগ নিয়ে তাকে ধীরে ধীরে যৌনকাজে টেনে আনে (যেমন- আজকে তার সাথে খেলার ছলে “আদর” করে দিলো, পরেরদিন গায়ে হাত দেয়া, পরে…)। শিশুদের প্রতি পেডোফাইলদের অস্বাভাবিক আগ্রহ থাকে, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আপনি নিজে-ও অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাবেন।

পেডোফিলিয়ার শিকার হওয়া শিশুরা অনেক শারীরিক ও মানসিক রোগে বা সমস্যা ভুগে। অনেকে ডিপ্রেশন, উদ্বগজনিত ডিসঅর্ডার ও সমস্যা, পিটিএসডি ইত্যাদিতে ভুগে। যেহেতু শিশু যৌনকাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত নয় তার শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। অনেক শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও বুদ্ধিভিত্তিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, শিশুর স্বাভাবিক মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের নিশ্চিত করা দরকার যে সে পেডোফিলিয়ার শিকার যেনো না হয়।

আমি আশা রাখি যে একদিন বাঙলাদেশে এমন সময় আসবে যে কাসেম বিন আবুবাকারের মতো পার্ভাট ও খুব-সম্ভবত-পেডোফাইলদেরকে মিডিয়া সাহিত্যসম্রাট কিংবা জনপ্রিয়তার পুঁজি না করে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে কিংবা তাদের মানসিক চিকিৎসার জন্য লেখবে।

লেখক: মনোবিজ্ঞানী, কবি ও লেখক।

যোগাযোগ: http://fb.com/ashraf.mahmud অথবা [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.