মৃত্যুতে মহান পাপ-পুরুষেরা!

0

শামীমা জামান:

১৯৮৭ সাল। তখনকার জনপ্রিয় বিনোদন পাক্ষিক আনন্দ বিচিত্রা সুখী তারকা দম্পতিদের নিয়ে ‘পারফরমার দম্পতি’ শিরোনামে একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে। সেখানেই একটি ছবিতে প্রজ্ঞা লাবণীর পাশে দাঁড়ানো তার স্বামীকে প্রথম দেখি।

বাহ! উনিও আবৃত্তিকার! কী শান্ত, সৌম্য, নিপাট ভদ্রোচিত চেহারা। দুজনের প্রতি শ্রদ্ধায় ভালবাসায় গদ্গদ কিশোরী আঁতেল মন। তারপরে তাদের একসাথে, আলাদা কত আবৃত্তি যে শোনা হয়েছে!

কাজী আরিফের ভরাট কণ্ঠস্বর কোথায় যেন একটা মূল্যবোধ জাগানিয়া পরিমিতি বোধের সীমা টানে। মানুষকে যেন ভাল-মন্দ বুঝে চলে নিখুঁত হতে শেখায়। এই চর্চাই তো জীবন। নয়তো সীমালঙ্ঘন হলে নিজের ক্ষতি করেই ক্ষ্যান্ত হয় না মন, অন্যের ক্ষতিও করে বসে। যা কখনোই কাম্য নয়।                                                                                                              

ঘন্টাকয়েক বাদে নিউ ইয়র্ক এর ফ্লাইট। গোছগাছ শেষে নিউজ ফিডে চোখ বুলাতে বুলাতে নিজের অজান্তেই লিখতে বসে গেলাম। বলা যায় স্বনামধন্য সব মানুষের আর্তনাদ দেখেই। কাজী আরিফ আর নেই। টিভি স্ক্রলে ভেসে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর শোক। এতোবড় আবৃত্তিকার বলে কথা। শিমুল ভাইয়ের (মুস্তাফা)ও গুরু তিনি।

আর তুমি কেগো সুমনা মেহেরুন? দুটি শিশু রেখে প্রেমিক এর (তাও আবার পরকীয়া, আপনকীয়াও নয়) প্রতারণায় আত্মহত্যা না করলে আমারও জানা হতো না তুমি নামে কোন দেখতে সুন্দর নারী ঢাকা শহরে কবি হতে এসেছিলো। তোমাকে যখন মানুষ মানে সমাজ চিনলো আত্মহত্যার মতো একটি নির্মম ঘৃণা, গন্ধ ছড়ানো ঘটনা দিয়ে, তার পিছনে আবার প্রেম, প্রেমিক হিসেবে কাজী আরিফের মতো সুশীল মানুষের নাম, তো আর কী, তুমি নিশ্চয়ই খারাপ মেয়ে। স্বামী তোমাকে অত্যাচার করতো? তোমার বাড়ীতে গৃহপরিচারিকা ধর্ষিত হয়েছিল কী হয়নি, এতো প্যানপ্যানানি কে শোনে!

মিডিয়া, প্রশাসন এসব নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তোমার নেইকো মেয়ে। তুমি শুধু পারতে চিংড়ি মাছ দিয়ে কচুর লতি মাখা মাখা করে রেঁধে নিয়ে তোমার মহান প্রেমিককে পরম মমতায় খাওয়াতে। বাসায় ফিরে হয়তো একই কচুর লতি অবজ্ঞায় রাগে কোনরকম ঠেলে দিতে স্বামীকে। ওড়না পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝোলার আগে বাচ্চা দুটিকে বলে গেলে তোমার মৃত্যুর জন্য তাদের বাবা, আর ভূত আংকেল দায়ী।

পারোনি সমাজে তাদেরকে হেয় করতে। প্রশাসনে টাকা দিলে সব হয়, আর মিডিয়া সমাজ! প্রফেশনাল বন্ধুত্ব থাকলে এখানে কী না হয়! দাগী দাগী নারী নির্যাতনকারী আসামী মহান সেলিব্রেটিরা পুরস্কার এর গঙ্গাজলে স্নান সেরে নেয়। মিডিয়া পুরস্কৃত করে তাদের সব পাপ ধুয়ে নেয়। তারা তখন আবারো ঝকঝকে তকতকে হয়ে নতুন কোনো নারীর সর্বনাশে মেতে ওঠে।

মনে পড়ে আমার শৈশবের চেনা চটপটে, দূরন্ত এক অতি আধুনিক মেয়ের কথা। মঞ্চ নাটক-টাটক করতো। হঠাৎ শুনলাম সে আত্মহত্যা করেছে। ওর মতো স্মার্ট মেয়ে! কেন গো? ওমা শোনোনি ওর সাথে তো জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক অমুক এর এফেয়ার ছিল। মেয়েটি যে বাঁধ ভাঙ্গা প্রেমে এই কাণ্ডটি করে বসলো তাতে জনপ্রিয় সাহিত্যিক এর অগোচরে সামান্য বিব্রত হওয়া ছাড়া আর কী হলো? বড় জোর নিজেই নিজেকে বিড়বিড় করে হয়তো বলেছিলেন ‘কী সাংঘাতিক মেয়েরে বাবা ! এরপর থেকে মেয়ে নির্বাচনে সচেতন হতে হবে’।

একে তো মহান শিল্পী। তার উপরে মৃত্যু করে দিয়ে যায় আরো মহান। তাই তসলিমা নাসরিনকে বেপরোয়া হতে বাধ্য করে যে বানিয়াশান্তা বা টানবাজার এর পুঁতিগন্ধময় প্রতারণা, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে সেখানে কেউ খোঁজে না। তিনি থাকেন তার গান কবিতায় মানুষের অন্তরে অন্তরে। সমাজের পাটকেল নিক্ষেপ চলে তসলিমার বে আব্রু জীবনে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী কাম নতুন প্রভাবশালী কবির মৃত্যুতেও বিব্রত হয় কবির ভালবাসা এলা আর কবির অবহেলা তার স্ত্রী-কন্যা। কবি মৃত্যুতে হয়ে যান অকালপ্রয়াত মহান কবি!

আর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক মৃত্যুতে তো অমর হোনই, বেঁচে থাকতেই পেয়ে যান অসীম ক্ষমা। ঘৃণার ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হয় দ্বিতীয় স্ত্রী শাওন। সমাজকে এড়িয়ে নিজস্ব গণ্ডিতে বিব্রত হতে হতে অবশেষে মাথা সোজা করেই চলতে পারেন গুলতেকিন। হয়তো তিনি বলেই। প্রজ্ঞাও পেরেছেন। পড়ন্ত বয়সে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে ছেড়ে আসার কষ্ট সয়ে নিতে।

অতএব দুনিয়ার মিডিয়াবাজ আঁতেলেরা দলে দলে রাষ্ট্রীয় শোক যাপন কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করতে নিজের ফেসবুক ওয়ালকে সমৃদ্ধ করুন। পারলে গল্প ফেঁদে হয়ে উঠুন লেখক ‘অমুক ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম……আহারে! বড় ভালো মানুষ ছিলেন !

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 379
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    379
    Shares

লেখাটি ২,৮৯৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.