আন্তর্জাতিক তৎপরতাই সফল হলো, রায়ে প্রশ্নবিদ্ধ সরকারও!

আঙ্গুর নাহার মন্টি : গোলাম আযমসহ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের পক্ষে গোড়া থেকে আন্তর্জাতিক লবিং ও তৎপরতা চালাচ্ছিল জামায়াতে ইসলাম। ১৮ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপিও বরাবরই তাদের সমর্থন দিয়ে আসছে। জনগণের প্রত্যাশায় গুঁড়েবালি দিয়ে গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে গোলাম আযমের ফাঁসি না হয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এ কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সরকারও। অভিযোগ রয়েছে, গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি না দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিকের বাসায় জামাত নেতাদের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। এ রায়ের পর সকলের মনে প্রশ্ন জেগেছে, গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তি ঠেকাতে কি শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তৎপরতাই সফল হলো?
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের প্রধান ষড়যন্ত্রকারী, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা জামাতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে বয়স ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা বিবেচনা করে আদালত সর্বোচ্চ শাস্তির রায় দেননি। দিয়েছেন ৯০ বছরের কারাদণ্ড। অথচ এদেশের জনগণ কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির রায় শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে প্রতীক্ষা করছিল। গোটা জাতির প্রত্যাশা ছিল এ রায় হবে মৃত্যুদণ্ড। আদালতের রায়েও বিচারক বলেছেন, গোলাম আযম যে অপরাধ করেছেন তার সবকটিতে সর্বোচ্চ শাস্তি তার প্রাপ্য। কিন্তু এই রায়ে বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে দেয়া এ রায়ের পর গোটা বাংলাদেশে হতাশা ক্ষোভ ও অসন্তোষ নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধাপরাধের সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও জামাতের সাবেক আমির গোলাম আযমের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক এম কে রহমান বলেন, উই আর নট হ্যাপি। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়াই শ্রেয়। কিন্তু বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পরেই এ বিষয়ে আপিলের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করবো। চল্লিশ বছর অপেক্ষার পর আংশিক ন্যায়বিচার পেয়েছেন বলেও জানান সমন্বয়কারী।
অন্যদিকে গোলাম আযমের ৯০ বছরের সাজায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে যুদ্ধাপরাধের বিচারের অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ। রায় ঘোষণার পর পরই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ।
এ রায়ে দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও সচিবালয়ে এক সাংবাদিকদের বলেছেন, দীর্ঘ শুনানির পর স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অভিযুক্ত গোলাম আযমকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সম্পূর্ণ সুযোগ দিয়ে বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল বিচারের রায় দিয়েছেন। বয়স বিবেচনায় সর্বোচ্চ শাস্তি দেননি। এটা আন্তর্জাতিক আইনের রীতি। এই বিচার, বিচারের স্বচ্ছতা, মান নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগ নেই।
সরকারি দলের এমন বক্তব্যে গোলাম আযমের রায়কে কেন্দ্র করে একদিকে সরকারের দ্বান্দ্বিক অবস্থান, অন্যদিকে সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। অন্যদিকে গোলাম আযমের রায়ে কোথাও সন্তুষ্টি নেই। ক্ষোভে ফুঁসছে মানুষ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক তৎপরতা শুরু করে। দেশে-বিদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং বিচারের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে এ অঞ্চলের প্রভাবশালী রাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে লবিং শুরু করে। তখনই বিভিন্ন মহলে যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের পাঁয়তারা নিয়ে শঙ্কা জাগে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারকে সাবধান করে ব্যাপক লেখালেখিও হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের যৌক্তিকতা সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়। পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে সরাসরি ও প্রত্যক্ষ কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। যদিও যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার বারবার অস্থির করার ইন্ধনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যক্ষ সহায়তা না পেয়ে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ শক্তি তুরস্ক সরকারের সঙ্গে লবিং করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ডিসেম্বরে তুরস্কের কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা নিয়ে ঢাকায় এসে সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। ওইসময় দলটি পৃথক বৈঠক করে যুদ্ধাপরাধের বিচারাধীন জামাত নেতাদের ১৫ জন আইনজীবী, জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক এবং বিএনপির সঙ্গে। তারা অবশ্য আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন। ওই মাসেই প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানকে লেখা এক চিঠিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল গোলাম আযমসহ অন্য জামাত নেতাদের ফাঁসি না দেয়ার আবদার জানিয়েছিল। এর জবাবে গত জানুয়ারিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে লেখা জবাবি চিঠিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কোনো গোপন বিচার নয়। অপরাধের দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিচারের মধ্য দিয়ে গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার লাখ লাখ মানুষের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তির পাশাপাশি দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। জিল্লুর রহমান চিঠির শেষ দিকে লেখেন, বাংলাদেশের জনগণ এই বিচারের পক্ষে আছে। তাই এ বিচার নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
এদিকে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে এ রায়কে ভোট রাজনীতির জন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অতিগোপনে অভিযুক্ত জামাতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সমঝোতায় সরকারি দল বিদেশীদের সহায়তা নিচ্ছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর প্রতি অভিযোগ উঠেছে, তিনি এ ব্যাপারে জামাতের সঙ্গে সমঝোতা করছেন। গত ৭ জুলাই তিনি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জন ডেনিলোয়েজের গুলশানের বাসভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে নিয়ে জামাতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের তিন নেতা ট্রাইব্যুনালে জামাতের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী এই অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছে, ওইদিন ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে সকল রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের চায়ের নিমন্ত্রণ ছিল। কোনোক্রমেই তা আওয়ামী লীগ ও জামাতের আঁতাতের বৈঠক বলা যায় না। আর ওই বৈঠককে গোলাম আযমের রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও ঠিক হবে না।
(দৈনিক ভোরের কাগজ থেকে সংগৃহীত)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.