কৈশোর যেন গুমরে না কাঁদে, না প্রকাশের যাতনায়

মোহছেনা ঝর্ণা:

কিশোরী কন্যা আমার কিংবা কিশোর পুত্রটি আমার নিজের সংগে নিজে কোনো গোপন কষ্ট চেপে বড় হচ্ছে কি না সে খবরটা কি একজন মা হয়ে, একজন বাবা হয়ে, নিদেনপক্ষে একজন অভিভাবক হয়ে আমি রাখছি কিনা সে ব্যাপারে আমি কতটুকু নিশ্চিত?

আমার একজন পরিচিত মানুষ তার ক্লাস টেনে পড়ুয়া মেয়ের পড়ালেখা নিয়ে খুব চিন্তিত। কারণ মেয়ের যাবৎকাল পড়ালেখার রেজাল্ট ভালো, এবং কন্যাটিও পড়ালেখা নিয়ে খুব সিরিয়াস। কন্যার মা চাকরি করে। বাসায় কন্যা থাকে গৃহকর্মী আর ছোট বোনের সাথে। তো একদিন তিনি জানালেন তার কন্যা কোচিং ক্লাসের পড়া নিয়ে বিরক্ত। কিছু বুঝতে পারে না। কিভাবে কি করবে সে? তো আমার সেই পরিচিত ভদ্রলোক অনেক খূঁজে কন্যার জন্য গৃহশিক্ষক রাখলেন। গৃহশিক্ষকের কথা শুনে আমি বললাম, গৃহশিক্ষক যে রাখলেন সেখানে কিন্তু সতর্ক থাকবেন।

তিনি সংগে সংগে বললেন, হ্যাঁ, আপা, আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি, এজন্য আমি ইয়ং কোনো গৃহশিক্ষক রাখিনি। কখন কি হয়ে যায়! আমি একজন বয়স্ক গৃহশিক্ষক রেখেছি।

তাকে বললাম, ইয়ং গৃহশিক্ষক রাখলে বড়জোর প্রেমজাতীয় ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু বয়স্ক গৃহশিক্ষক যদি নৈতিকতা হীন হয় এবং আপনার কন্যাটি যদি সব কথা আপনাদের সাথে নির্বিঘ্নে শেয়ার করার মতো সম্পর্ক না হয় তাহলে কিন্তু আপনি জানতেও পারবেন না আপনার মেয়েটি অন্যকোন ধরণের ভয়ের কূপের মধ্যে পড়ে গিয়ে বুকে কষ্ট নিয়ে সময় পার করছে কি না

ভদ্রলোক একটু ঘাবড়ে গেলেন। বললাম, ঘাবড়ানোর কিছু নেই, সতর্ক হওয়ার কথা বললাম। গৃহশিক্ষকের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা তো একেবারে কম না। বয়স্ক হোক, আর অল্পবয়স্ক হোক, যখন বুঝতে পারে সুযোগ নেয়া যাবে তখন তারা কেবলই পুরুষ হয়ে যায়

একবার বাসায় এক আন্টি এসেছিল আম্মার কাছে জরুরি কাজে। খুব তাড়াহুড়ো করছিল। আমি তাড়াহুড়োর কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলল, মেয়েকে টিচারের কাছে পড়তে দিয়েছি তো, তাই তাড়াহুড়ো করছি। টিচারগুলোর তো বিশ্বাস নেই, কখন গায়ে হাত দিয়ে বসে, বাচ্চা মেয়ে কি বুঝবে বলো, তাই চোখে চোখে রাখতে হয়।
ভাবছিলাম, আহা! সব বাবামা যদি এরকম চোখে চোখে রাখার কথা ভাবতো!

আবার ভাবছিলাম কি এক কষ্টকর জীবন! বিশ্বাসযোগ্য কোনো মানুষ নেই। সব কেবল পুরুষ হয়ে যায়! অথচ এই পুরুষগুলাই আবার কারো পুত্র, ভাই, কারো স্বামী, কারো বাবা। অন্যের কৈশোরে থাকা পুত্র কন্যাটির সাথে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানোর সময় তাদের কি একবার নিজের কন্যা, নিজের বোন, নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়ে না! এরাও এরকম লাঞ্ছিত হতে পারে অন্য কোনো দানবের হাতে।  

গৃহশিক্ষকের কথা বিশেষভাবে বলছি কারণে যে গৃহশিক্ষকের হাতে কিশোরী ছাত্রীটি লাঞ্ছিত হলে বাবা, মা, কিংবা অভিভাবক মহল কিন্তু দায়সারাভাবে গৃহশিক্ষকটিকে বিদায় করে নিজেদের মান সম্মান বাঁচান। কিন্তু কন্যার মনে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে সেখানে প্রলেপ দেয়ার ভাবনাটা অনেকে মাথায় আনেন না, অনেকে বদনামের ভয়ে সচেতনভাবেই বিষয়টা এড়িয়ে যান।

শিক্ষকের জন্য যে সম্মান ছাত্র ছাত্রীর মনে কিংবা সামাজিকভাবে বরাদ্দ সব শিক্ষক কিন্তু সে সম্মান ধরে রাখতে পারে না। এই ধারা শুধু এখন না, অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। কথা হচ্ছে এখন মিডিয়া কিংবা প্রচার ব্যবস্থার কারণে প্রকাশটা হচ্ছে। আমাদের শিক্ষক সমাজে ভালো শিক্ষক যেমন আছে খারাপ শিক্ষকও কম নেই। আর শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছনার খবর নেহায়েত কম নয়। পরিমলের কথা আমরা ভুলিনি। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছিত হবার খবরগুলোও খুব পুরনো হয় নি।

শুধু এক পরিমল নয়, এরকম কত পরিমল যে কোথায় কোথায় ঘাপটি মেরে আছে আমরা তার খবরই জানি না।
আমরা বুঝি কেবল জিপিএ ৫। ভালো স্কুল। ভালো কলেজ। ভালো রেজাল্ট।
বাবা, মা এবং অভিভাবক মহলের কাছে অনুরোধ কিশোরী কন্যাটির জন্য গৃহশিক্ষক রাখার ক্ষেত্রে সচেতন থাকুন।

আপনার, আমার, আমাদের কিশোরী মেয়েটি হঠাৎ ভয়ে কুঁকড়ে যায় কিনা, কাউকে দেখলে বিরক্ত হয় কিনা, কারো উপস্থিতিতে কন্যার চেহারাটা আর্দ্র কিংবা ম্লান হয়ে যায় কিনা, সে কিছু বলতে চায় কি না, তার কথার ধরন পাল্টেছে কিনা, সে কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু সংকোচে বলতে পারছে না এমন অসংখ্য বিষয় আছে যেগুলো একটু খেয়াল করলে খুব সহজেই ধরা যায়, আর সেই সমস্যাগুলোর সুন্দর সমাধান করে কিশোরী কন্যাটির বুকের ভেতরে পাথর চাপা কষ্টের অবসান করে তাকে একটি নির্মল জীবন দেয়ার প্রশান্তির সাথে অন্য কোনো তুলনাই হতে পারে না।

কিশোরী মেয়েটির কথা বলার কারণ হচ্ছে কিশোরী মেয়েটি বয়োঃসন্ধিকালীন শারীরিক এবং মানসিক পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে যখন হিমশিম খাচ্ছে তখন কিছু লোভাতুর, কামার্ত দৃষ্টি, কামার্ত স্পর্শ, চটুল বাক্যে সে কিশোরীটি অনেক বেশি মুষড়ে পড়ে। সেসময় লজ্জায়, সংকোচে বলতে চাইলেও অনেক কথা সে প্রকাশ করতে পারে না। আবার নিজের সাথে ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলোও সে মেনে নিতে পারে না। এই যে প্রতিনিয়ত একটা মানসিক দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয় সময়টা তার অনেক সম্ভাবনাকে স্তিমিত করে দেয়। ভয়, ঘৃণা, গ্লানি তাকে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে দেয়।

কিন্তু সময়টাতে যদি কিশোরী কন্যাটির মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা তার চোখের ভাষা বুঝে নিতে পারি তাহলে কিন্তু খুব সহজেই তার কষ্টের, যন্ত্রণার কারণটা চিহ্নিত করে অন্যায়কারীর কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে কিশোরী কন্যাটিকে জানিয়ে দিতে পারি তুমি একা নও, এবং কোনো অন্যায়ের সাথে আপোষ নয়। জীবন অনেক সুন্দর। এখানে নর্দমার কীট আছে সত্যি, তবে কীটকে নির্মূল করার জন্য কীটনাশকও আছে। সাহস করে কীটনাশক প্রয়োগ করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে কীট নির্মূলের আনন্দ

আরেকটা বিষয়, অনেক সময় দেখা যায় আমরা কিশোর পুত্র কিংবা কিশোরী কন্যার কথা বিশ্বাস করি না, ক্ষেত্র বিশেষে অনাকাংখিত কিছু ঘটে গেলে কিশোরী কন্যা কিংবা কিশোর পুত্রটিকে বলি, ‘চুপ, চুপ। এসব কথা কাউকে বলবে না’। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো অভিভাবক বিরক্ত হয়ে বলে, ‘তোমার সাথেই শুধু কেন এমন হয়, আর কারো সাথে তো হয় না। নিশ্চয়ই তোমারও কোনো সমস্যা আছে’।

আমরা জানিও না আমাদের এই বলা টুকুতেই কিন্তু স্তিমিত হয়ে যেতে পারে কৈশোরের সমস্ত উচ্ছ্বলতা। কৈশোরে থাকা ছেলেমেয়েগুলো ভাবতে পারে নিশ্চয়ই তাদেরই সমস্যা। আর তখন অনেক যন্ত্রণা সহ্য করা সত্ত্বেও অন্য কাউকে তাদের চেপে রাখা কষ্টের কথা প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ নাও করতে পারে। মনে হতে পারে সবাই ভাববে দোষ বোধহয় তারই। তাই আসুন আমরা আমাদের সন্তানদের সত্য বলতে শেখাই। এবং তাদের কথা বিশ্বাস করি। আমাদের আচরণে তাদের বোঝাই আমরা সবসময় তাদের সংগে আছি, যে কোনো অবস্থায়, যে কোনো পরিস্থিতে।

কৈশোরকাল জীবনের এক রহস্যময় সময়। এই রহস্যময় সময়টা যাদের জীবনে আনন্দদায়ক হয় আমার কেন জানি মনে হয় জীবনটা তাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু তেমন আনন্দদায়ক কৈশোর জন কিশোরকিশোরী তার জীবনে পায় সেটা আমি জানি না। আর তাই তো ভয়ভীতি হীন, দুর্বার আনন্দে ঘেরা একটি কৈশোরের মোহ আজও গেল না আমার। আহা! কৈশোর!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.