জাতীয় সংগীত এবং দু’খানা কথা

পৃথা শারদী:

আমি দেশকে ভালবাসি, বেশ ভালবাসি , না , না  বেশ নয়। খুব ভালবাসি। দেশের সবকিছুই আমার প্রিয়। প্রায়ই আমি ইউটিউব খুলে জাতীয় সংগীত শুনি, যখনই শুনি উঠে দাঁড়াই, দাঁড়ানোটা কর্তব্য। সম্মান জানানোটা বাধ্যতামূলক। জ্ঞান হবার পর থেকে আমাদের বাসায় এটা শেখানো হয়েছে , জাতীয় সংগীত বাজালেই দাঁড়াতে হয়,অভ্যাসটি আজো যায়নি।

সেদিন খুললাম ইউটিউব, আপনারা যারা দেখে থাকেন এসব ভিডিও, দেখে থাকবেন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এ দেশের খেলার একটি ম্যাচ শুরু হবার আগের ভিডিও দেয়া আছে।  লক্ষ্য করলাম জাতীয় সংগীত যখন গাওয়া হচ্ছে তখন এ দেশের খেলোয়াড়গণ হাত রাখছেন পেছনে, পা রাখছেন ছড়িয়ে! কারো হাত বুকের উপর জড়ো করে রাখা! মাথা এদিক-সেদিক দোলাচ্ছেন! ক্যামেরাম্যান অবস্থা বেগতিক দেখে ক্যামেরা নিলেন দর্শক সারিতে, কেউ হাত নাড়ছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ কথা বলছেন, কেউবা ক্যামেরা দেখে হাই দিচ্ছেন, টিভিতে দেখাচ্ছে কিনা! ক্যামেরা ম্যানের মাথায় কিছু বুদ্ধি ছিল , ঝট করে সরিয়ে ক্যামেরা নিলেন অন্যদিকে।

বসুন্ধরা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যাই আমরা সবাই-ই কম বেশি। প্রেমিকা নিয়ে যাই, বাবা-মায়ের সাথে যাই, মাঝেমাঝেই দেখি সিনেমা শুরু হবার আগে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় মানুষজন উঠে দাঁড়ান না! একবার সিনেমা শুরু হবার আগে এক ছেলেকে উঠতে না দেখে সরাসরি বলেছিলাম, “ভাইয়া উঠে দাঁড়ান!”  ভাইয়া আমাকে বললেন, “আপ্পি, স্যরি, আমার পায়ে ব্যথা ।” ইন্টারভ্যালে যখন লোকটি দৌড়ে দৌড়ে পপকর্ন  কিনতে গেলেন, আমি ব্যাঙ্গাত্মক হাসিতে তাঁকে বুঝিয়েছিলাম কতোটা নিচু মনের তিনি! লোকটি মুখ নিচু করে সরে গিয়েছিলেন।

একবার এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম জাতীয় সংগীতের সময় ছ বছরের ছোট বাচ্চাকে সিটে বসিয়ে নিজে দাঁড়াচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম, “কেন !” বললেন, “মেয়ে ছোটো!” আমি চোখ কপালে তুলে মেয়েকে বললাম, “ আপু দাঁড়াও। সবাই দাঁড়িয়ে আছে।” শিশুটির মাথায় কী ছিল কে জানে! সে দাঁড়িয়েছিল, ভদ্রমহিলা পরে অবশ্য আমার পাশে আর বসেননি। উঠে চলে গেছেন। মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশি কিনা! তাই!

সংবিধানের ৪ (১) এ জাতীয় সংগীতের কথা সুস্পষ্ট বলা আছে। ১৯৭৮ সালের জাতীয় সংগীত বিধিমালাতে বলা হয়েছে জাতীয় সংগীতকে যথাযত সম্মান দিতে। কীভাবে সম্মান দেবো? খুব ছোট্ট কিছু অংশ আমি তুলে ধরছি ।

জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হবার সময় যখন জাতীয় সংগীত বাজানো হবে, তখন, প্যারেডের কমান্ডিং অফিসারের কমান্ড পাওয়া ব্যতিত সকল পদমর্যাদার কর্মকর্তগণ উঠে দাঁড়াবেন। উর্দিপরা দর্শক অফিসার, জুনিয়র কমিশনড অফিসার, ওয়ারেন্ট অফিসার, নন কমিশনড অফিসারগণসহ সেনাবাহিনীর সকল সদস্য জাতীয় সংগীতের প্রথম নোট শুরু হবার সময় দাঁড়িয়ে স্যালুট করবেন এবং শেষ নোট গাওয়া পর্যন্ত স্যালুটরত অবস্থায় থাকবেন। যখন জাতীয় সংগীত গাওয়া হবে এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হবে, সকলে জাতীয় পতাকার দিকে মুখ করে দাঁড়াবেন। যখন জাতীয় সংগীত বাজানো হবে কিন্তু পতাকা উত্তোলিত হবে না, সকলে জাতীয় সংগীত গায়কের কিংবা বাদকের দিকে মুখ করে তাকাবেন। এছাড়াও কূটনীতিবিদগণ জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানাবেন, মুষ্ঠীবদ্ধ হাত অর্দ্ধমুষ্ঠী করবেন। কারো মাথায় টুপি থাকলে তা খুলে ফেলতে হবে এবং যারা বেসামরিক জনগণ আছেন, তারাও জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়াবেন।

জাতীয় সংগীত যদিও ২৫ লাইন, গাওয়া হবে সর্বদাই ১০ লাইন। শুধুমাত্র কতিপয় ক্ষেত্রে তা দু লাইন করে গাওয়া হবে, এই দু চরণ হলো ,
“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমার ভালবাসি,
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ”
জাতীয় সংগীত বিধিমালাতে যা বলা আছে তা বলার পরেও কিছু কথা যোগ করছি,

  • যারা জাতীয় সংগীত গান কিংবা জাতীয় সংগীতের সামনে দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন, তাদের হাত থাকে শরীরের দুপাশে, হাতের মুঠি থাকে অর্ধমুষ্ঠ অবস্থায় এছাড়াও সামনের দিকে দু’হাত জড়ো করেও দাঁড়ানো যায়।
  • জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় মেরুদণ্ড সোজা রেখে ঠিক সামনের দিকে যেদিকে জাতীয় সংগীত গাওয়া হচ্ছে সেদিকে তাকাতে হয়। এসময় আরামে দাঁড়ানো অর্থাৎ পা ফাঁকা করে দাঁড়ানো, হাত পিছনে নিয়ে রাখা একদমই নিষিদ্ধ।
  • জাতীয় সংগীত কানে আসা মাত্রই যে যেখানে আছেন দাঁড়িয়ে যেতে হবে, এক্ষেত্রে যদি বাদক কিংবা গায়ক সামনে না থাকেন তো যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে সেদিকে মুখ করে থাকতে হবে।  জাতীয় পতাকা জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে বলেই কোন প্রকার কথা বলা রীতিমতো অপরাধ।

যারা জানেন তারা এসব মেনে চলেন, আজকাল সরকারি বেসরকারি আধাসরকারি নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় যারা জাতীয় সংগীত গাইছেন কিংবা যারা এসেম্বলিতে দাঁড়ানো, তারা কথা বলে যাচ্ছেন, এতোটুকু লজ্জাবোধ নেই। আর থাকবেই বা কীভাবে! যারা শিক্ষক তারাই হয়তো জানেন না কিংবা জানলেও হয়তো মানেন না ! অথচ শিশুকাল থেকেই আমাদের এসেম্বলিতে জাতীয় সংগীত শুদ্ধভাবে গাওয়ার জন্যই এতো তালিম দেয়া হয়।  

কয়েক বছর আগে সংসদে রিট করা হয়েছিল জাতীয় সংগীতকে মোবাইলে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না তার জন্য, ব্যাপারটি ভালো ছিল। জাতীয় সংগীত কখনোই, কখনোই মাঝের লাইন থেকে শুরু করে শেষ করে দেয়া যায় না, মোবাইলের রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করার সময় গানটির অর্ধেক বেজেই শেষ হয়ে যেত। সম্প্রতি কিছু কিছু ব্যান্ড জাতীয় সংগীতকে মনের মাধুরী মিশিয়ে সুরের যথেচ্ছ ব্যবহার করে গাইছেন! বাহ রে বাহ! কী সুন্দর দেখা যায় জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন !

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা , আপনারা কষ্ট করে ইউটিউবে গিয়ে দুটো ভিডিও দেখবেন, একটি বাংলাদেশের সাথে অস্ট্রেলিয়ার খেলা শুরু হবার আগে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় যে ভিডিও সেটি (আপনারা আরো অনেক দেশের বিপরীতেই ভিডিওটি দেখতে পারেন, প্রত্যেকটিতেই খেলোয়াড় এবং দর্শক সকলেরই একি ভাবভঙ্গি ছিল) এবং আরেকটি আইসিসি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট ২০১১ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছায়ানটের গাওয়া জাতীয় সংগীত। দুটো ভিডিও দেখেই আপনাদের জাতীয় সংগীতের সময় কীভাবে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হয়, সে পার্থক্য চোখে পড়বে।

খেলোয়াড়দের ভিডিও চিত্রের বর্ণনা প্রথমেই দিয়েছি তবে আইসিসির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ভিডিওতে আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন প্রত্যক শিল্পীর হাত সোজা সিনা টানটন। কী? টনক নড়ছে না তো? ভাবছেন, শিল্পীরা ওভাবেই দাঁড়িয়ে গান করেন? জানি, আপনাদের চামড়া মোটা, এতো সহজে গায়ে হাওয়া লাগবে না। তাকিয়ে দেখুন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পাশে উপবিষ্ট অন্যান্য মাননীয় ব্যক্তিবর্গ সকলেই দাঁড়িয়ে আছেন, দুপাশে হাত দিয়ে, মেরুদণ্ড সোজা করে, চোখের পলক যথাসম্ভব কম ফেলে।

প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, না জানা কোন অন্যায় নয়, তবে জেনেও কোন কাজ না করা তাকে অসম্মান জানানো মহাপাপ।
আমরা সব্বাই দেশকে ভালোবাসি, বান্দরবান খাগড়াছড়ি গিয়ে একটা সেলফি দিয়ে বলি, “ জননী, তোমায় ভালোবাসি”
একটা সূতি শাড়ী গায়ে জড়িয়ে বলি, “দেশের শাড়ী”, অথচ সেই আমরাই, আমরা অনেকেই জাতীয় পতাকাকে দাঁড়িয়ে সম্মানটুকু জানাতে গাফিলতি করি!
এতোই কী ছোট হয়ে গেছে আমাদের বিবেক!

ধূলি- ধূসরিত শত ছিন্ন শাড়ী পরা বাংলাদেশ নামের কোনো ৪৬ বয়সী নারীর সাথে দেখা হয় তো তাঁর তীক্ষ্ণ ঘৃণা মেশানো চোখের সেই ঘৃণা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবেন তো? 
হায়রে আমার দেশ ! হায়রে আমার সোনার বাংলা ! হায়রে ১৭ কোটি বাংলায় কথা বলা কুলাঙ্গার অপদার্থ জনগণ!
হায়রে!
দেশ স্বাধীন হবার এতোদিন পরেও দেশকে, দেশের পতাকাকে, দেশের জাতীয় সংগীতকে সম্মান জানানোর সঠিক রীতিটুকু আমরা শিখতে পারিনি।
ছিঃ! লজ্জা! কী লজ্জা!!

নিজে শিখুন, অন্যকে শেখান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত সর্বোপরি দেশমাতৃকাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেবার চেষ্টা করুন। আপনারই সম্মান বাড়বে। 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.