প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণের খুঁটিনাটি: পাঠ প্রতিক্রিয়ার ব্যাখ্যা

রাবিয়া আনজুম:

ক’দিন আগে Womenchaper-এ “দাম্পত্য যৌনতায় পুরুষের আধিপত্য, জন্মনিয়ন্ত্রণ নারীর কেন” শিরোনামে যে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল তাতে পাঠক/ পাঠিকার মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে আজকের লেখাটি না লিখলে কিছুটা দায় থেকে যাবে। কারণ, কেউ কেউ অভিযোগ এনেছেন এসব লিখে অনৈতিক যৌনতাকে প্রমোট করা হচ্ছে, কেউ বা বলেছেন প্রাকৃতিক পন্থা অর্থাৎ ক্যালেন্ডার মেথডে ঝুঁকিও রয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে ক্যালেন্ডার মেথডের বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ করেছেন।

আজ শুরুতেই আমি দুটি ডিসক্লেইমার দিয়ে লিখতে শুরু করবো।

প্রথমত, আমি আমার পূর্বের লেখাটির শিরোনামেই বলে দিয়েছি ইটস এ্যাবাউট “দাম্পত্য যৌনতা”, সুতরাং আমি কোনভাবেই বিবাহ বহির্ভূত অখবা অনৈতিক কোন যৌনতাকে প্রমোট করার চেষ্টা করছি না। খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার মতই পরিণত বয়সে এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত ব্যবস্থায় সুস্থ স্বাভাবিক যৌনতা সকল নর-নারীর স্বাভাবিক আচরণ। বরং না জানার কারণে অপরিকল্পিত গর্ভধারণ করে পরে বৌ (বা অন্য কাউকে) নিয়ে “কুসুম ম্যাটার্নিটি”-তে দৌড়াদৌড়ি করাই অসভ্যতা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।

সুতরাং জানুন, উপলব্ধি করুন, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিন। আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে যেয়ে নারীদের স্বাস্থ্যহানির যেন না হয়, সে বিষয়ে সচেতন করা। দ্বিতীয় ডিসক্লেইমার, আমি চিকিৎসক বা গবেষক নই, এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পড়াশোনাও নেই। তবে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজ থেকে কিছু পড়াশোনার চেষ্টা করি, যেন ডাক্তারের কাছে যাওয়া কম লাগে, আর ঔষধ পথ্য-ও আমি একেবারে ঠেকে না গেলে খাই না।

চল্লিশের কাছাকাছি এসে এখনো চলছি, খারাপ না। সুতরাং আমার লেখা অন্ধ বিশ্বাসে গ্রহণ না করে বরং তা রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করে নিজেরা খানিকটা কষ্ট করে অন্য কোনো রিলায়েবল সোর্স থেকে ক্রসচেক করে নিবেন। হুম, তাহলে প্রশ্ন এসে যায় আমি কোন দায়িত্বে এতো কিছু লিখছি, সেটা হলো এক যুগের স্বীয় বৈবাহিক অভিজ্ঞতার আলোকে লিখছি।

এবারে আসি মূল প্রসঙ্গে, আর তা হলো প্রাকৃতিক উপায়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত থেকে গর্ভনিরোধ। গুগলে Calendar Method, Rhythm Method বা Fertility Awareness Metod লিখে সার্চ দিলেই হাজারটা পেজের লিংক চলে আসবে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে আপাত জটিল এ পদ্ধতি পড়ে সামারাইজ করা আমার মতই অনেকের জন্যই সহজ হবে না। তবে অনেকদিনের স্টাডি আর এ্যাপ্লিকেশনের পর এখন কিছুটা গুছিয়ে লিখতে পারবো বলেই আমার বিশ্বাস।

ক্যালেন্ডার মেথডে কিছু গাণিতিক ক্যালকুলেশন আছে, তবে তা উপলব্ধি করতে হলে ব্যাসিক কিছু কনসেপ্ট থাকতে হবে। তাই প্রথমেই কনসেপচুয়াল আলোচনা করতে চাই। গর্ভধারণের খুবই প্রাথমিক কনসেপ্ট হলো নারীর ডিম্বাণুর সাথে পুরুষের শুক্রাণুর উপযুক্ত পরিবেশে মিলন এবং নিষিক্তকরণ। সহবাসের সময় যোনিপথে নারীদেহের অভ্যন্তরে শুক্রাণু প্রবেশ না করানো নিশ্চিত করাতে পারলেই তা হবে বহুল প্রচলিত প্রাকৃতিক জন্মনিয়ন্ত্রণ। তবে এজন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিজ নিজ দেহ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অতি আবশ্যক। কারণ শুনেছি এবং পড়েছি, অনেক পুরুষই তার ইজাকুলেশনের সঠিক মুহূর্ত ডিটেক্ট করতে পারেন না।

প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণের অপর পন্থা ক্যালেন্ডার মেথড যেটা অপেক্ষাকৃত জটিল, কিন্তু বুঝে প্রয়োগ করতে পারলে অধিকতর উপভোগ্য। সেটার উপর কিছুটা আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। সন্তান ধারণে সক্ষম কোনো নারীই তার মাসিক ঋতুচক্রের (গড়ে ২৮ দিন) প্রতিটা দিনেই গর্ভধারণের জন্য উপযুক্ত (বা ঝুঁকিতে) থাকেন না। মাসিক ঋতুচক্রের কোন কোন দিনে গর্ভধারণের ঝুঁকি (অথবা সুযোগ) থাকে, আর কোন কোন দিন স্বাভাবিক প্রতিবন্ধকতাবিহীন মিলনের জন্য ঝুঁকিহীন, তা হিসাব কষে বের করতে পারাটাই ক্যালেন্ডার মেথডের রহস্য।

ইউজুয়ালি ঋতুবতী সকল নারীর দেহেই প্রতি মাসিকচক্রে একটি করে ডিম্বাণু ডিম্বাশয় থেকে রিলিজ হয়ে থাকে, যা শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত না হলে তা মাসিক আকারে কিছুটা রক্তপাতের মাধ্যমে দেহ থেকে বেরিয়ে যেয়ে ঐ মাসিকচক্রের সমাপ্তি ঘটায়। আদর্শ প্রেক্ষিত বিবেচনায় ধরে নেই একজন সুস্থ নারীর ঋতুচক্র ২৮ দিনেই নির্ধারিত, অর্থাৎ তার যে কোনো মাসের মাসিক শুরু হওয়ার দিনটিকে প্রথম দিন ধরলে চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে মাসিক প্রবাহ সমাপ্ত হয় এবং পুনরায় ২৯তম দিন থেকে (যা পরবর্তী মাসিক চক্রের প্রথম দিন) পরবর্তী মাসিকের ব্লিডিং শুরু হয়। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণুর রিলিজ প্রক্রিয়া (যাকে ওভুলেশন বলা হয়) শুরু হয় সাধারণত মাসিক চক্রের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ ১৪তম দিনে (মনে রাখতে হবে এই আলোচনায় মাসিকের প্রথম দিন সবসময়ই ব্লিডিং শুরুর দিনটি)।

ডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার পর তা ২৪ থেকে সর্বাধিক ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত নিষিক্তকরণের জন্য (fertilization) উপযুক্ত থাকে, এরপর তা অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং অনুপোযুক্ত এই ডিম্বাণুর চারপাশে একটা আস্তরণ সৃষ্টি হ’তে থাকে। অনুপযোগী হয়ে পড়া ডিম্বাণু শুক্রাণুর সংস্পর্শে এলেও তা নিষিক্ত হতে পারে না অর্থাৎ গর্ভধারণ সম্ভব হয় না। সুতরাং গর্ভধারণের প্রয়োজনে ডিম্বাণু রিলিজ হওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই তা শুক্রাণুর সংস্পর্শে আসতে হবে।

এর পরের তথ্যটি আরো গুরুত্বপূর্ণ, আর তা হলো তবে কি এই ৪৮ ঘন্টা মিলন থেকে বিরত থাকলেই গর্ভনিরোধ সম্ভব? মোটেও তা নয়। কারণ পুরুষের শুক্রাণু নারী দেহের অভ্যন্তরে ৫/৬ দিন পর্যন্ত জীবিত (এ্যাকটিভ) থাকতে পারে। সুতরাং ওভুলেশনের ৪/৫ দিন আগেও যদি প্রতিবন্ধকতাবিহীন মিলন ঘটে থাকে তবে সেই ‍স্পার্ম কিন্তু নারীদেহ অভ্যন্তরে রিলিজ হওয়া ডিম্বাণুর অপেক্ষায় এ্যাকটিভ আছে। তাহলে টু বি সেফ সাইড, ওভালুয়েশনের ছয় দিন আগ থেকে ওভালুয়েশনের পরের ২ দিন পর্যন্ত দেহ অভ্যন্তরে স্পার্ম প্রবেশ না করলেই গর্ভনিরোধ সম্ভব (বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে)।

এখন বড় প্রশ্ন, কীভাবে ওভালুয়েশনের দিনক্ষণ ডিটেক্ট করতে পারা যাবে! ওই যে আগেই বলেছি আলোচনা শুরু হয়েছে মাসিক চক্রকে ২৮ দিনে নির্দিষ্ট করে দিয়ে। ২৮ দিনের চক্রে সাধারণরত ওভালুয়েশনটা হয় ১৪তম ‍দিনে, কারণ রিলিজ হওয়া ডিম্বাণু একটি মোটামুটি ১৪ দিনব্যাপি (Luteal Phase) একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে মাসিক আকারে দেহের বাইরে নিষ্ক্রান্ত হওয়া শুরু করে, সব মিলিয়ে ২৮ দিন।

এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপ, সেটা হলো বাস্তবিকে পৃথিবীর কোন নারীর-ই মাসিক ঋতুচক্রের মেয়াদ ২৮ দিনে নির্ধারিত থাকে না। সুস্থ স্বাভাবিক নারীদেহে তা পরিবর্তন হয়, কোনো মাসে ২৮, তো পরের মাসে ৩১, বা ২৭ বা ৩৩ ও হতে পারে। সেক্ষেত্রে ক্যালেন্ডার মেথডের সঠিক প্রয়োগের জন্য আপনাকে পূর্ববর্তী ছয় মাস বা আরো বেশী সময়ের ঋতুচক্রের পরিসংখ্যানটা জানতে হবে।

মনে করেন গত এক বছর সময়ে কোন নারীর ঋতুচক্রের দৈর্ঘ্য সর্বনিম্ন ২৬ দিন থেকে সর্বোচ্চ ৩৪ দিন পর্যন্ত ছিল। এখন ঝুঁকিপূর্ণ দিনগুলোর হিসাবটা হবে (সর্বোচ্চ – ১১)= ৩৪-১১=২৩তম দিবস এবং (সর্বনিম্ন – ১৮) = ৮ম দিবস আর তার মাঝের দিনগুলো। এখানে ১১ এবং ১৮ সংখ্যাটি ফিক্সড থাকবে সব ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ এই উদাহরণের নারী তার যে কোনো মাসিক চক্রের ৮ম দিবস থেকে ২৩তম দিবস পর্যন্ত গর্ভধারণের উপযুক্ত থাকবেন, এবং গর্ভনিরোধ করতে চাইলে এ সময়ের যৌনক্রিয়ায় স্পার্ম যোনিপথে দেহ অভ্যন্তরে প্রবেশ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সুতরাং এই ক্ষেত্রে এই নারীর জন্য তার প্রথম অনিরাপদ দিবস (First Fertile Day) হলো ঋতুচক্রের ৮ম দিন এবং শেষ অনিরাপদ দিবস হলো ২৩তম দিন।

পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাবার স্বার্থে প্রাসঙ্গিক আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া উচিৎ বলে মনে করছি। সেগুলো হলো মেয়েরা শুধু মানসিক দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বেশী ইমোশনাল নয়, তাদের দৈহিক নানা ফাংশনাল বিষয়গুলোও পারিপার্শ্বিক নানা ফ্যাক্টর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়। যেমন ঋতুচক্রের ক্ষেত্রেও যে মাসে আপনার স্ট্রেসটা বেশী হলো, হয়তো স্বামীর সাথে একটু ঝগড়া হলো, বা নিকট আত্মীয় কেউ মারা গেলে তীব্র মানসিক আঘাত পেলে, হেকটিক কোন জার্নি করলে, পাহাড়ে উঠলে, খাদ্যাভ্যাস বা ঘুমের রুটিনে হঠাৎ পরিবর্তন, এমনকি সন্তানের পরীক্ষার চিন্তাতেও সাইকেল ডিউরেশন কম বেশি হয়ে আপনার হিসাবে ঝামেলা লেগে যেতে পারে। এছাড়া যে কোনো ঔষধ সেবনের ফলে যা নারীদেহ অভ্যন্তরে হরমোনাল ফাংশনে প্রভাব ফেলতে পারে সেক্ষেত্রেও ক্যালেন্ডার মেথড কখনো কখনো ফেইল করতে পারে। আর যাদের সাইকেল ডিউরেশনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন মেয়াদের পার্থক্য ৮ দিনের বেশী তাদের ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতির প্রয়োগ সফল নাও হতে পারে।

আর হ্যাঁ নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূতভাবে কোন অনাকাংখিত পরিস্থিতি চলে আসলে তা সামাল দেয়ার জন্য বাজারে এখন প্রচুর ইমার্জেন্সি কন্ট্রাসেপটিভ পিল পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সেগুলোর হুটহাট নিয়মিত ব্যবহার আপনাকে বন্ধাত্ম্যসহ অন্যান্য মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকির ভেতর ফেলে দিতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, বিয়ের পূর্বে এসব নিয়ে আমার নূন্যতম ধারণাও ছিল না। স্বামীর সহযোগিতায় এসব জানতে পেরেছি। নিজেদের ভেতরকার বোঝাপড়াটাই আসল, সবক্ষেত্রেই। আশা করছি এই লেখা শুধু নিয়ন্ত্রণ নয়, যারা সন্তানধারণ করতে চাচ্ছেন, তাদের জন্যও কাজে আসবে। সময় নিয়ে পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

পাঠক মতামত ও আগ্রহের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে আরো কিছু নিয়ে লেখার আশা থাকলো।ধন্যবাদ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.