হায় চিল, সোনালী ডানার চিল

0

লীনা হাসিনা হক:

বেশ কদিন থেকেই লিখবো লিখবো করে আর লেখা হয়ে উঠছে না। বসেছি কয়েকবার ল্যাপটপের সামনে আবার ভেবেছি কীইবা লিখবো। সেই তো অতি সাধারণ মেয়েদের আরো সাধারণ জীবনের কথা। তাদের সেই আটপৌরে যাপিত জীবনের কথা জেনে এই পৃথিবীর মানুষের লাভ তো দূরের কথা, তারা কোনো ধরনের আমোদও পাবে না! আর আমি মানুষটাও নেহায়েতই ডাল-ভাত টাইপের, ধারালো ভাষায় কিছু লিখতে জানি না। লিখতে বসলেই কেমন যেনো প্যানপ্যানে ছিঁচকাঁদুনি ধরনের লেখা লিখি।

শেষে ভাবলাম, আচ্ছা, আমার মতন ডাল-ভাত মানুষ তো আরো কিছু রয়েছে, তাদের জন্যই না হয় লিখি।

দেশটাতে পা রেখে প্রথমেই অনুভব হয়েছিলো- আহা- সত্যিই যেনো মুক্তাদানা। আমি আফ্রিকার মুক্তা উগান্ডার কথা বলছি। আকাশ থেকে ঘুরে ঘুরে যেনো নীলচে সবুজ ভিক্টোরিয়া লেকের উপরেই নেমে পড়লো আমাদের বিশাল ডানার যান্ত্রিক চিল। ইমিগ্রেশন অফিসার আমার আগমনের কারণে খুশি না ব্যাজার হলেন ঠিক বুঝলাম না, তবে পাসপোর্টে সিল ছাপ্পড় ঠিকঠাকই দিয়ে দিলেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পরেই যে বিষয়টা ভালো লাগলো, নারীদের পোশাকের বৈচিত্র্য আর চলাফেরায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব। শতকরা আশিভাগ মেয়ে এবং নারীদের পরনে সো-কলড পাশ্চাত্য পোশাক, কিন্তু পোশাকের থেকেও যা আমার চোখ-মন দুটোই টানলো, তাহলো তাদের সহজাতভাব। এমনকি মুসলিম মেয়েরাও নিজের রুচি পছন্দ মতন পোশাক পরছে। পোশাক বিশেষ করে নারীদের পোশাকের ধরন তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা, নিজের রুচি শখের পরিচয় দেয়। সেই সাথে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী পোশাক পরবার স্বকীয়তা তাদের আরো অনেক ধরনের শৃঙ্খল মুক্ত করে বলে আমার মনে হয়েছিল।

ভেবেছিলাম, মনে হয় এই দেশটির মেয়েরা নিজের নারীসত্ত্বার সাথে সাথে মানুষ সত্ত্বা বজায় রাখতে পেরেছে। হায় চিল, উড়ন্ত তোমার ডানার রঙ পড়ন্ত সূর্যের আলোতে সোনালী আভাময় মনে হলেও কাছে থেকে তার কালো রঙ বোঝা যায়! উগান্ডায় জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়টা মানা তো হয়ই না, বরং নিন্দার চক্ষেই দেখা হয়। উগান্ডার নীতি হচ্ছে, প্রো লাইফ বা জীবনমুখী। আমার সহকর্মীদের কারোরই সন্তান সংখ্যা তিনের নিচে নয়। উপরের দিকে ছয় পর্যন্ত আছে কারো কারো। আমার সহকর্মীরা সবাই উচ্চশিক্ষিত, অনেকেই দেশের বাইরে ইউরোপ আমারিকা কানাডায় পড়ালেখা করেছেন।

তাতে কী, যেহেতু উগান্ডায় জমি কোনো সমস্যা নয়, কাজেই জনসংখ্যা ঈশ্বরের অভিলাষ অনুযায়ীই চলছে। সহকর্মীদের অনেকেরই আট-দশ ভাইবোন। আমি ভেবে কুল পাই না, আমার শিক্ষিত আলোকিত সহকর্মীরা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কীভাবে ছয় সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন!

পুরুষদের কাছে জানতে চাইলে উত্তরগুলো হয় বেশ বিচিত্র। প্রাথমিক উত্তর থাকে, আমাদের তো জমির সমস্যা নাই, কাজেই বেশী সন্তানে সমস্যা কোথায়! তারপরে আসে উগান্ডার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভালো নয়, ম্যালেরিয়া, যক্ষা, হেপাটাইটিস, ইয়েলো ফিভার, ম্যানেঞ্জাইটিস, এইচআইভি- কোনটির কবলে পড়ে কোন সন্তানের জীবন কখন শেষ হবে, কেউ জানে না, তাই বেশি বেশি ছেলেমেয়ে থাকলেই ভালো, হারাধনের কয়েকটি তো টিকে থাকবে!

যুক্তি শুনে আর কিছু বলতে পারি না। কেউ কেউ বললেন, এটাই রীতি, আমি চাইলেও পরিবারের রীতির বাইরে যেতে পারবো না। গত সপ্তাহে লুয়েরো জেলায় গিয়েছিলাম মিটিং করতে, সেখানে জেলার প্রধান নির্বাহীর সাথে দেখা, চা বিরতিতে এটা সেটা গপসপের মাঝে পরিবারের কথাও চলে আসে, মাত্রই দুটি সন্তানের জন্ম দেয়া এই অপোগণ্ড আমার দিকে সাত সন্তানের জনক প্রধান নির্বাহী যে দৃষ্টিতে তাকালেন, তার একটা মাত্রই অর্থ দাঁড়ায়, দুইটার বেশি প্রাণ পৃথিবীতে আনতে ব্যর্থ এই অপদার্থ কী মোক্ষলাভে উগান্ডায় হিজরত করেছে!

তিনি জানালেন, তাঁর বয়স্কা মা উঠোনে খেলে বেড়ানো কচিকাঁচার অভাবে কাতর হয়ে পড়েন, অতএব মাতৃভক্ত পুত্র মায়ের মনস্কামনা পূরণ করতে পিছপা হবেন কোন বিচারে! আমার গলায় উগান্ডার অতি সুস্বাদু কলার টুকরা আটকে যাওয়ার দশা হয়। লুয়েরোর ডিসট্রিক্ট রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর একজন নারী, এই পজিশনটি রাজনৈতিক, সরাসরি প্রেসিডেন্টের অধীনে তাঁরা কাজ করেন, আমাদের দেশের জেলা পরিষদ প্রশাসকের সমপর্যায়ের।

পরিণত বয়সের এই নারী জানালেন, তাঁর মাত্রই দুটি কন্যা। তাঁর স্বামী একজন আইনজীবী এবং আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে লন্ডন থেকে আইনশাস্ত্রের ডিগ্রীধারী তরুণ যখন তাঁর স্ত্রীকে জানালেন যে, তিনি একটি সন্তানের অধিক চান না, তখন নাকি তাঁর পরিবার ওঝার শরণাপন্ন হয়েছিলো যে পরিবারের সব থেকে উজ্জ্বল পুত্রটির মাথায় মুজুঙ্গু (সাদা) ভূত সওয়ার হয়েছে। স্ত্রীটি শেষ পর্যন্ত অনেক অনুনয় করে দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার ব্যাপারে স্বামীর সম্মতি লাভ করেন।

ভদ্রমহিলার অতি আধুনিক মানসিকতার স্বামীর দর্শন লাভের ইচ্ছা প্রকাশ করলে দুখী হয়ে শুনি যে মানুষটি কয়েক মাস আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর ম্যাডামকে জিজ্ঞ্যেস করে জানতে পারি, তাঁর কন্যারা উচ্চ শিক্ষিত, একজন পিএইচডি করেছেন। ভালো কাজ করেন তাঁরা, বিবাহিতা এবং দুজনেই চারটি করে সন্তানের জননী। আলাপ আর আগায় না।

মেটারনিটি লিভ বা মাতৃত্বকালীন ছুটি মাত্রই তিন মাস, তাও সরকারী প্রতিষ্ঠানে। বেসরকারী বিশেষ করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে একমাসের মতোন। শিশু সন্তানটি ছয় মাসও মায়ের দুধ ঠিক মতন খেতে পায় না! সব মিলিয়ে হালি দুয়েক বা ডজন খানেক সন্তান জন্মদানের কষ্টকর প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে তো নারীকেই যেতে হচ্ছে। তারপরেও কেন নারীরা বছরের পর বছর এই কষ্ট করছেন? জবাব মেলে না, বা বলা যায় জবাব সেই-ই আদ্যিকালের বদ্যি বুড়ির মতই- গর্ভ নারীর, কিন্তু সেই গর্ভ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুরুষের।

তাছাড়া, ক্যাথলিক উগান্ডার ক্যাথলিক ঈশ্বরের এই ধরায় প্রাণের আগমনে কোনো বাধা দেবার সাহস করবে কোন নাস্তিক! শতকরা ২৯% মুসলমানের এই দেশে মুসলিম পুরুষেরা বৈধভাবেই চারটি নিকাহ করছেন এবং মুমিনের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছেন। আর এথনিক ট্রাইবদের সন্তান সংখ্যার হিসাবনিকাশের কোন সুলুক সন্ধান পাওয়া আকাশের তারা গণনার চেয়ে কোনদিক থেকে কম নয়।

আমার এক সহকর্মী, বয়সে নবীন, আলাপে জানলাম, তার তিনটি সন্তান, চতুর্থটি পৃথিবীর আলো দেখবে মাস কয়েকের মধ্যেই। স্ত্রীটি একটি ব্যাংকে কাজ করেন, সন্তান প্রসবের সময় এক মাসের সবেতন ছুটি পাবেন, আর একমাস বিনা বেতনে ছুটি নিবেন।

কেন চারটি সন্তান? সেই ফিউডাল মানসিকতার চিরকালীন সত্য আমার ক্ষীণদৃষ্টিকে আরেকবার ধাঁধিয়ে দিলো- প্রথম তিনটি সন্তানই কন্যা। অতএব বংশ পিদিম জ্বালানোর জন্য এই চতুর্থ প্রচেষ্টা, ঈশ্বর অকরুণ হলে, পঞ্চমবার, ষষ্ঠ, সপ্তম! পুত্রার্থে ভার্যা! কন্যা কেনো বংশরক্ষা করতে পারবে না, জিজ্ঞ্যেস করে বংশগতি, এর রক্তের শুদ্ধতা ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক জ্ঞানলাভ করলাম। কন্যার বিয়ে হয়ে যাবে, অর্থাৎ সে গোত্রান্তরিত হবে, কন্যার গর্ভের সন্তানের শরীরে আরেক গোত্রের রক্ত বইবে! সেই সন্তান তো আর এই গোত্রের ধারা বহন করবে না!

যুক্তি শুনে আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো! ঘুরতে থাকা মুণ্ডু কোনরকমে সোজা রেখে জানতে চাইলাম, তার স্ত্রীর কী মত এই বিষয়ে? উল্লেখ করা যায়, স্ত্রী এবং স্বামী দুজনেই ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চ ডিগ্রীধারী। শুনলাম স্ত্রীও একই মত রাখেন, আর তা ছাড়া বিষয়টিতো স্বামীর বংশ রক্ষার কাজেই স্ত্রীর পক্ষে ভিন্ন মতামতের তো কোন বিষয় এখানে নাই। সহকারীকে এক গ্লাস বরফ ঠাণ্ডা জল আনতে বলে আলোচনায় ইতি টানলাম। মাথা আর নিতে পারছিলো না।

জেন্ডার মন্ত্রণালয়ে মিটিঙে যাওয়ার পথে ট্রাফিকে আটকে আছি, সঙ্গী নারী সহকর্মীর সাথে টুকটাক গল্প জুড়ি। আমাদের সংস্থা পরিচালিত নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর প্রধান সমন্নয়ক আমার এই সহকর্মী। তার সাথে কথা বলে বুঝতে চাই, উগান্ডার সামাজিক প্রতিবেশে এই অধিক সন্তান ধারণের বিষয়টি নারীরা আসলেই কীভাবে দেখেন! এই খুচরা আলাপে মোটামুটি যে বিষয়গুলো খানিক স্পষ্ট হয়, তা হলো, পরিবারের সিদ্ধান্ত এখনো পুরোপুরি পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় নারীকে বছরের পর বছর গর্ভ ধারণ করে যেতে হয়।

আমার এই সহকর্মীটির মা তাঁর এগারতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। সহকর্মীর বাবা আরেকটি বিয়ে করেন এবং সেই সৎ মা বেচারাও পাঁচটি সন্তান জন্ম দেন। এখন আমার সহকর্মীর ভাইবোনের সংখ্যা ষোলো, জনা সাতেক ভাইবোন অকালে ঝরে গিয়ে এখন আছেন নয়জন। সহকর্মীর নিজের আছে তিনটি এবং তাঁর সন্তান সংখ্যাই নাকি পরিবারে সব থেকে কম।

কেন তাঁরা স্বামী এবং পরিবারের সাথে আলোচনা করে সন্তান ধারণের সংখ্যাটা সীমিত পর্যায়ে রাখতে চেষ্টা করেন না, কষ্ট তো তাঁদেরই করতে হয়, ইত্যাদির উত্তরে তিনি বলেন, তাঁর তিনটি সন্তানের মধ্যে দুই বার মিস ক্যারেজ হয়েছে, অসম্ভব শারীরিক মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে, কিন্তু স্বামীর ইচ্ছা বা নির্দেশ আর পরিবারের প্রথার বাইরে যেতে পারেন না!

চমৎকার পোশাকে, বাহারী কিন্তলী ব্রেইড করা চুলে আধুনিক সজ্জার আমার সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বুক ঠেলে কান্না আসে! কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীধারী নারী সহকর্মী আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে চিলের ডানার ঘা গুলি দেখিয়ে দেন। হায় সোনালী ডানার চিল!

(চলবে)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 234
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    234
    Shares

লেখাটি ১,০৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.