“ভালো পাত্র” কাকে বলে?

0

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

‘ভালো পাত্র কাকে বলে’ এইটা আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে। আজ এক পরিচিত তার আত্মীয়ার বিয়ের জন্য একটা বিদেশী মিশনে চাকরি করেন এমন এক পাত্রের বিষয়ে খোঁজ নেয়ার অনুরোধ করলেন। ছেলে তাদের বেশ পছন্দ, প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে গেছে, এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের খোঁজখবর চলছে। ছেলের ফ্যামিলি-ট্যামিলির খোঁজ নেওয়া হয়ে গেছে, এখন কর্মস্থলে তার সুনাম কেমন, স্যালারি যা বলেছে তা ঠিক বলেছে কিনা-আমার যেহেতু পেশাগত সূত্রে মিশনগুলোতে যেতে হয়, আমি যেন খোঁজ নিয়ে জানাই।

ছেলে কালচারালি কেমন, সৎ না অসৎ, মেয়েদের মানুষ হিসেবে, পার্টনার হিসেবে সম্মান করে কিনা-এসব নিয়ে কোন জিজ্ঞাস্য নাই। যিনি ফোন করেছেন, তাকে আমি বিশেষ সমীহ করি। কথাও বাড়াতে ইচ্ছা করলো না, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি জানাবো বলে ফোন রাখলাম।

তখনই ভাবনাটা এলো। “হাই স্যালারি ড্র” করা একটা পাত্রই কি সুপাত্র? আমার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। চোখের সামনে উজ্জ্বল মেয়েগুলোকে ভালো পাত্রের শিকার হতে দেখেছি। খুব স্পর্শকাতর, দেখতে সুন্দরী, লেখাপড়ায় ভালো এরকম মেয়েকে বাবা-মা তথাকথিত “ভালো পাত্র” দেখে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকে কেউ খারাপ বলেনি। মানে বিয়ের জন্য খোঁজখবর নেওয়াওয়ালারা কেউ খারাপ বলেনি। খারাপ বলার তো কোনো কারণ নেই। ছেলে ভালো পজিশনে চাকরি করে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, “মেয়েঘটিত” কোন সমস্যা নেই, ফ্যামিলি সিমসাম-ব্যস তাইলে আর কী সমস্যা হতে পারে?

মনের মিল? সে তো প্রেম করে বিয়ে করার পরেও না হতে পারে, তাইলে আর সেটেল ম্যারেজ এর দোষ কোথায়? আসলেই ভালো পাত্র কী করে চেনা যায়? প্যাট্রিয়ার্কির লেবেল তো কেউ গায়ে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায় না। তবে? আসলে বিয়ে প্রতিষ্ঠানটাই এমন যে এর মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়কেই অধিকাংশ সময় কিছু অবমানের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে নারীকে অন্তত আমাদের এই অঞ্চলে বেশি অবমানের শিকার হতে হয়।

আমি উজ্জ্বল মেয়েগুলোর কথা বলছিলাম।

এর মধ্যে একটা মেয়ে ছিল ডাক্তার। পাশ করে বের হয়ে ছোটখাটো একটা চাকরি করতো, ভালো চাকরির খোঁজে ছিল। বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্স ফোর্স করছিল। এমন সময় বাবা-মা ‘ভালো পাত্র’ এনে হাজির করলো। ভালো পাত্র চুপচাপ শান্ত স্বভাবের, ভালো আয় করে, নিয়মিত নামাজ রোজা করে। তো, মেয়েটার রাজী না হওয়ার কোনো কারণ বা উপায় ছিল না। ধুমধাম করে বিয়ে হলো। তারপর দেখা গেল যে মেয়েটা বৃষ্টি দেখে আপ্লুত হয়, হৈহৈ করতে ভালোবাসে, খেতে বেড়াতে ভালোবাসে-এসবের সবকিছুতে অনীহা তার স্বামীর।

প্রথমে অনীহা, তারপর মৃদু আপত্তি এবং শেষে প্রবল আপত্তি। কিন্তু সে আগের মতোই ভালো আয় করে, ধর্মভীরু। এখন স্বামী সিনেমা দেখতে নিয়ে যায় না, শখ করে শাড়ি কিনে দ্যায় না বলে তো আর ডিভোর্স করা যায় না। মেয়েটা একটা জম্বি জীবন কাটায় এখন। কিন্তু পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন কেউ তা বুঝতে পারে না। মেয়েটির বাবা-মাকে চুপচাপ শান্ত ছেলেটি মা-বাবা বলে সম্বোধেন করে না, কারণ শ্বশুর-শাশুড়ীকে বেশি সমীহ করে ব্যাকবোনলেসরা-এটাই সে মনে করে, ওদিকে মেয়েটি কিন্তু ছেলেটার বাবা-মাকে “আম্মু-আব্বু” বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে।

এ বিষয়ে কথা ওঠালে, এমনকি মেয়ের বাড়ির লোকজনও বলে, “জামাইরা কত ধরনের হয়! পুরুষ মানুষের অতো দোষ ধরলে হয় না।” আসলে মেয়েগুলো স্রেফ খুন হয়ে যায়। টেরও পায় না। অনেক বছর পর ঘোর কাটলে যখন টের পায় তখন আর ফেরার পথ থাকে না। আর খুনগুলো কারা করে? বাইরের লোক? মাস্তান বা খারাপ লোকেরা? না। এই খুনের দায় পরিবারের। কখনও সবচেয়ে পীড়িতের মায়েরাই এই খুন করে থাকেন, বুঝে না বুঝে। না কী জন্য? ভালো বিয়ে হবে। ভালো বিয়ে কারে বলে? ভালো পাত্র কারে বলে? এইটা একটা বিভ্রম।

এদিকে পুরুষতন্ত্র যে পুরুষদেরও অসম্মান করে সেটা কিন্তু এই সুপাত্র কনসেপ্ট দিয়ে বেশ বোঝা যায়। একটা ছেলে যখন রায় পেয়েই যান ভালো পাত্র’র, তখন প্রতিনিয়ত তাকে তা প্রমাণ করতে হয়। তাকে ভালো আয় করতে হয়, পুঁজিবাদের কারণে তৈরি হওয়া পরিবারের নানান “ফলস নিড” পূরণ করতে হয়, আমার এক আত্মীয়ের সুন্দরী মডেল বউ তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল এই অভিযোগে যে, কেন তার কাজিনদের নিয়মিত গুলশানের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে তার স্বামী খাওয়ায় না, কেন প্রতিমাসেই বিদেশ ঘুরতে নিয়ে যায় না! সুপাত্র হয়ে দাঁড়ায় একটা টাকা কামানোর মেশিন।

নারী-পুরুষ উভয়কেই জীবন স্বচ্ছন্দে চালানোর জন্য, সম্মানজনক ভাবে চালানোর জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, কিন্তু সেটা যদি নিজেকে বিক্রি করার জন্য হয়-যা পুরুষতন্ত্র করে থাকে-তা থেকে নারী-পুরুষ সবারই বের হয়ে আসা দরকার। আর যেসব পরিবার আর বাবা মা ভালো পাত্র’র সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়ে বর্তে যেতে চান, সেইসব পরিবার আর মা-বাবার প্রতি তীব্র ঘৃণা। সবার আগে পরিবারেরই উচিত সন্তানকে পুরুষ বা মেয়েমানুষ না ভেবে তাকে পূর্ণ মানুষ ভাবা।

শেয়ার করুন:
  • 2.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.4K
    Shares

লেখাটি ১০,৬০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.