‘সতীত্ব শরীরের হয় না, সতীত্ব হয় মনের’

0

শর্বাণী দত্ত:

বেশ অনেকবার কোনো মেয়ে আত্মহত্যা করলে আমি যখন তার কাছের কাউকে জিজ্ঞাসা করি, কেনো নিজেকে শেষ করে দিলো অতটুকু মেয়েটি? উত্তর সাধারণত ওই একটিই হয়- ”কী করবে, একজনকে নিজের ‘সব’ দিয়ে দিয়েছিলো। সে ঠকিয়েছে। সেই লজ্জাটা নিতে পারেনি।” আমি অবাক হই। আবার জিজ্ঞাসা করি, “এই ‘সব’টা আবার কী?” 
-‘আহা! একটা মেয়ে হয়ে বুঝতে পারছেন না? সতীত্ব।’

নাহ ভাই! আমি অত্যন্ত দু:খিত, কিন্তু সত্যিই ‘একটা মেয়ে’ হয়েও আমি বুঝতে পারছি না কী করে একজন রক্তমাংস ও বোধবুদ্ধি দিয়ে গড়া মানুষের ‘সব’ তার শরীরের একটি ‘টিস্যু’ দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে! হাইমেন নামক এই টিস্যুর আবার গালভরা নামকরণও করা হয়েছে! ‘সতীপর্দা’! তাও আবার এমন একটি টিস্যু, যেটি অনেকের জন্মগত ভাবেই থাকে না, (সুতরাং তারা জন্মগতভাবেই অসতী), কারো কারো খেলতে গিয়ে, দৌড়াতে গিয়ে, সাইকেল চালিয়ে ছিঁড়ে যায়। এগুলো সত্যি বলতে গেলে সবার জানা কথা।

আমার লেখাটি আজকে তাদের নিয়ে এবং তাদের উদ্দেশ্যে, যারা বিয়ের আগে এই ‘সতীপর্দা’ ছিঁড়ে ফেলার দু:সাহসটি করেছেন এবং তাদের জন্যও, যারা এই স্পর্ধাকারী নারীদের চরিত্র নিয়ে সকাল-বিকেল ছ্যাঃ ছ্যাঃ করেন। প্রথম কথা হলো, সতীপর্দার এই পুরো কনসেপ্টটিই প্রচণ্ড ষড়যন্ত্রমূলক। চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিক ও অমানবিকও বটে। ধরুন, আপনি পড়াশুনো শিখেছেন, পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন, তা পালন করছেন ও সেদিক থেকে দেখতে গেলে আপনি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও কাজ করছেন। আপনার যথেষ্ট বোধ-বিবেচনা আছে বলেই আপনি নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে কারো সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হলেন।

এখানেই আরেকটা কথা বলতে চাই- আমরা মেয়েরাও মানুষ। একেবারেই সাধারণ চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনায় পরিপূর্ণ মানুষ। আমরা কোনো অপার্থিব দেবীত্ব নিয়ে জন্মাই না। আমাদেরও শারীরিক মানসিক ভালোবাসা পেতে সাধ হয়, যেমনটি সকল পুরুষের হয়। এর অর্থ আবার এই নয়, আমরা সর্বক্ষণ কামতাড়িত বা দুশ্চরিত্র। যারা আশা করেন ‘ভালো মেয়ে’ মানেই ‘যৌনতা’ বিষয়ক সকল ব্যাপারে তাদের মুখে সর্বক্ষণ কুলুপ আঁটা থাকবে, তারা বোধহয় জানেন না সেই প্রতিটি ‘ভালো মেয়ে’র মনে অজস্র ‘মন্দ মেয়ে’র বসবাস।

যাই হোক, তো যা বলছিলাম- আপনি যাকে ভালোবেসেছেন, এবং সম্পর্ককে আস্থার পর্যায়ে নিয়ে গেছেন তার সঙ্গে আপনার শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, হ্যাঁ ‘বিয়ের আগে’ শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। এখানে আপনার অন্যায় কোথায়? বা আপনার সঙ্গীরই বা অন্যায় কোথায়? এরপর আপনি কোনোভাবে বুঝতে পারলেন, আপনি ভুল লোককে ভালোবেসেছেন। কিংবা ধরুন, আপনি প্রতারিত হলেন। এরপর শুধু সম্পর্কটি আর টিকলো না বলেই আপনার যদি পুরো ব্যাপারটিকে একটা অত্যন্ত ‘গর্হিত পাপ’ বলে মনে হওয়া শুরু করে, যদি আপনার মনে হওয়া শুরু হয় যে, আপনাকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে ডাস্টবিনে- তাহলে আপনি একজন প্রচণ্ড মাত্রার পুরুষতান্ত্রিক মহিলা। হ্যাঁ। ঠিক পড়লেন। পুরুষতন্ত্রের কৌশল আর ষড়যন্ত্রে আপনি কুপোকাত। যখন ভালোবেসে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন, সেই মুহূর্তগুলো কি একা আপনার সঙ্গী অনুভব করেছিলো? আপনি করেননি? পরে প্রেম ভেঙে গেলো বলে সকল ভালোলাগা, আনন্দকে ‘পাপ’ বানিয়ে দিয়ে নিজেকে ঘৃণা করা শুরু করবেন?

ভালোবেসেছিলেন সেটাকেই এবার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে করে ‘আমার সব শেষ’ সিদ্ধান্তে চলে আসারই যদি হয়, তবে শুধু বলবো আপনি এখনো কোনটা ‘আপনার সব’ সেটাই জেনে উঠতে পারেননি। হ্যাঁ, আমি জানি এমন মানুষ আশেপাশে আছে, যারা শুধু শরীরের টানে আসে এবং প্রতারণা করে সম্পর্কের ইতি ঘটায়। এরকম ছেলে যেমনি আছে, মেয়েও আছে। এজন্যই আবেগের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিকেও পাশে রেখে সঙ্গী বাছতে হয়।

তবু এমন কেউ যদি আসেই বা জীবনে, প্রতারিত হয়ে যে মুহূর্তে আপনি বলছেন, ‘আমাকে ইউজ করে ছেড়ে দিলো ও’ সে মুহূর্তে আপনি নিজেই নিজের শরীরটিকে বস্তু বানিয়ে দিচ্ছেন। এটাও Objectification of women. সেই লোকটি প্রতারক, বেশ। কিন্তু আপনার শরীর কি কোনো খেলনাপুতুল বা টিসু পেপার, যা কেউ ইউজ করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো? আর কেউ আর ওটা নিয়ে খেলতে চাইছে না? ওটায় সর্দি মুছতে চাইছে না? নয় তো? তাহলে একটু ঝেড়ে কাশুন। সঙ্গী ভুল নির্বাচন করেছেন, অতটুকুই আপনার ভুল। এবার কেনো তাকে অত বিশ্বাস করেছিলেন সে ভেবে নিজেকে যন্ত্রণা দেবেন না। এবং সে আপনার ‘সতীপর্দা’ কেড়ে নিয়েছে বলে আপনার ‘সব শেষ’ না ভেবে বুদ্ধি খাটিয়ে ভাবুন, ‘একটা টিসুপর্দা’ই আপনার সব, নাকি এ পৃথিবীকে আপনি যা যা দিতে পারেন তা আপনার সব?

তবে হ্যাঁ, যদি আপনার সঙ্গে কোনো অপরাধ হয়ে থাকে; তা হোক ইভ টিজিং, মলেস্টেশন বা অন্য যেকোনো ক্রিমিনাল অফেন্স, ভয় না পেয়ে আইনি সাহায্য নিন। সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্য নিন। কিন্তু প্রতারক প্রেমিককে কখনো কোনো সতীপর্দা নিয়ে চিন্তা করতে দেখেছেন? কিংবা যে পুরুষ প্রতারিতও হয়, তাকে বলতে দেখেছেন তার শরীর ব্যবহার করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে? তাহলে আপনি কেনো ভাবছেন আপনার সতীচ্ছদ হয়েছে বলে আপনার মূল্য শেষ হয়ে গেছে বা আপনার খুব বড় কিছু হারিয়ে গেছে? আগে আপনার দুটো চোখ, দুটো কান, দুটো হাত, দুটো পা ছিলো। এখনো আছে। আগে একটা সুন্দর মন ছিল, এখনো আছে। আগে ভুল সঙ্গী বেছেছিলেন, পরের বার আরো সাবধানে বাছবেন। ব্যাস! আপনি যা ছিলেন তাই আছেন। বিশ্বাস করুন! 

আর যারা এই সতীপর্দার সতীত্ব নামক ঐতিহ্যকে বুকে আগলে পড়ে আছেন, তাদের শুধু বলতে চাই, একটু মানবিক হোন! মগজ খাটাতে নাই বা পারলেন অন্তত হৃদয়কে জাগান। কেউ বিয়ের আগে ‘কুমারীত্ব’ (এই শব্দটাও যথেষ্ট আপত্তিকর) হারালেই তাকে পাপী-তাপীর তকমা দিয়ে জীবনভর যন্ত্রণা দেয়ার মতো অমানবিক কিছু হয় না। জীবনের প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা এনে দেবেন না।

পিতৃতন্ত্রের লুপে আমরা পড়ে গিয়েছি সে বহুকাল আগেই। সতীপর্দা নামক এই ধারণা তার মধ্যে অন্যতম একটি। মেয়েদের দেবীস্তুতি করে গ্লোরিফাই করার মধ্য দিয়েই যে সে যুগে অন্য কিছু মেয়েদের ডাইনী বানিয়ে আগুনে পোড়ানো হতো, তা ভুলে যাবেন না। আপনি পুরুষতন্ত্রকে না ছাড়লে পুরুষতন্ত্র আপনাকে ছাড়বে না। 

কেউ কেউ যখন জানতে চায়, ‘তুমি তাহলে সতীত্বে বিশ্বাসই করো না?’ আমি উত্তর দিই, করি। আমার মনে কালিমা না থাকলে, আমি আমার সম্পর্কের প্রতি আস্থাশীল থাকলেই আমি সতী। কারণ সতীত্ব শরীরের হয় না, সতীত্ব হয় মনের।

শর্বাণী দত্ত
(Sharbani Datta)
Student
Jadavpur University, Kolkata

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  • 2
  •  
  • 9
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    11
    Shares

লেখাটি ৯২,৯১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.