‘শক্তিমান’ বাবারাও পারছেন না মেয়েদের বাঁচাতে

0

ফাহরিয়া ফেরদৌস:

একদিন কোর্টে বসে আছি। একজনের সিনিয়র আইনজীবীর সাথে কথা হচ্ছে, যিনি বিচারপতিও ছিলেন। আমাকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, অনেক কথা বলার পর উনি বিয়েশাদীর কথা জিজ্ঞাসা করলেন, এক সময় উনি খুব কষ্ট নিয়ে বললেন, জানো আমার মেয়েরও বিয়েটা টিকলো না, আমার মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ায় থাকে, ওর জামাই ওকে অনেক মারতো, আমার মেয়ে চেষ্টা করেছিল বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন মেরেছে আর টিকতে পারেনি। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারপতি ছিলেন, ওনার মেয়েকে পর্যন্ত উনি রক্ষা করতে পারেননি! ওনার মেয়ের গায়ে হাত তুলতেও ভয় পায়নি।

আমার এক ক্লায়েন্ট, চেয়ারম্যান, গ্রামের মাথা, গ্রামের সালিশ করেন, ওনার মেয়ের বিষয়ে এসেছেন। ছেলে পক্ষ যৌতুক চান, টর্চার করেন, তার উপর অনেকদিন হলো মেয়ের বাচ্চা হয় না, তাই আরও সমস্যা!! মানুষের সমস্যার বিচার করতে পারলেও নিজের মেয়ের বেলায় মুখ বন্ধ। পিতা তাই চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।

আমার ফেসবুকে যত বাবা এবং যাদের কন্যা সন্তান আছে, আমি খেয়াল করে দেখলাম মায়েদের চেয়ে বাবারাই বেশি বৈশাখে মেয়ের শাড়ি পরা, মাথায় ফুল দেয়া ছবি দিয়েছে, অনেকে অনেক ক্যাপশন দিয়েছে। দেখে ভালো লাগছে, আবার মনে অজানা আতংকও কাজ করেছে, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব পুরুষের কাছে তার স্ত্রী বা বোনের অবস্থান যাই হোক, কন্যার অবস্থান রাজকুমারীর মতো; সব বাবা বুকে লালন করেন, ‘আমার মেয়ে বড় হয়ে লাল শাড়ি পরে শ্বশুরবাড়ি যাবে, নিজের ঘর হবে, স্বামী সোহাগী হবে’; কোন বাবা কোনদিন ভুলেও ভাবে না যে আমার মেয়ের জীবনে কোন অজানা ঝড় আসতে পারে, বিষয়টা না ভাবলেও জীবনের ঘটনা ঠিকই ঘটে।

নারীবাদী বলে কেউ বাহবা দেন না। নানাজন নানা ভাবে থাকান, কথার মাঝে তিরস্কারের সুর, নারীবাদী!! নারী অধিকারের কথা বলে! আসলে কি কেবলই নিজের কথা বলি? না, যে লড়াই লড়ছি, তা আপনার মেয়ের জন্য, যেনো আপনার মেয়ে স্বামীর ভালোবাসার পরিবর্তে স্বামীর বেল্টের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। নারীদের নিয়ে কাজ করতে যেয়ে কত মেয়ের জীবনের ঘটনা দেখছি, অথচ কেউ বলতেও পারবে না যে, ভেতরে কী চলছে, ঘরের কথা পরকে বলে কী লাভ!

যুগটা ভালো না, কোন কিছুর ঠিক নেই, দয়া করে মেয়েদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করান, দয়া করে গিফটের নামে যৌতুক দেয়া বন্ধ করেন, যদি দিতে হয় তবে সেই টাকা মেয়ের নামে ব্যাংকে ফিক্সড করে দিন, যদি কিছু হয় তবে তাকে কে চালাবে এই ভেবে যেন সে সারা জীবন মার খেয়ে জীবিত অবস্থায় মৃত জীবনযাপন না করে। বৈষয়িক বিষয়ের সাথে মেয়ের অর্জিত ডিগ্রিকে ও যৌতুকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বন্ধ করুন।

মুর্খ থেকে শিক্ষিত সবাই একই ভাবে দেখে একজন ডিভোর্সি নারীকে। যে কয়জন মানুষ ভিন্ন করে দেখেন তার সংখ্যা ১%। ভাবছেন সমাজ বদলে গেছে, আর শিক্ষিত সমাজ তো এমন হতেই পারে না! ভুল, সবই ভুল। শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী নামে যে সমাজ আছে তারাও একজন তালাকপ্রাপ্ত নারীকে একই চোখে দেখেন। বলার জন্য, বুলি আওড়ানোর জন্য অনেক বড় বড় কথা বলেন, বিছানায় যেতে ভালো লাগে, প্রেম করতে ভালো লাগে, কিন্তু জীবনসঙ্গী হিসেবে ভালো লাগে না। তাদের দেখলে কামনা জাগে, বাসনা জাগে, প্রেম জাগে, অনেক কিছু জাগে কিন্তু জীবনসঙ্গীর ভাব জাগে না!

কথা বলার যে শিল্প সেটা শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ আয়ত্তে থাকায় কথার এপ্রোচে ঘৃণা জন্মে না, এই হলো মুর্খ সমাজের সাথে তফাৎ।

লেখাটি ১৩,১১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.