বিশ্বাস তুমি কোন আকাশে ওড়ো

0

পৃথা শারদী:

আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে ঠিক কী চাও চারপাশের মানুষের কাছ থেকে, আমার এক কথার উত্তর হবে,“বিশ্বাস।” কথায় আছে ,“বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।” আজকালকার ঘটনার ঘনঘটা দেখলে মনে হয়, আদৌ কি বিশ্বাসে কিছু মেলে?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,“মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।” আমিও তা মানি, তবে মানুষকে আজকাল অন্ধভাবে বিশ্বাস করা আরো বড় পাপ, কারণ এ যুগে বিশ্বাসঘাতকের নেই অভাব।

“ বিশ্বাস ,তুমি কোথায়?” এই ইন্টারনেট ইমেইল ফেসবুকের যুগে এই প্রশ্নটিই কি বড় নয় ? কারো ঢলোঢলো সুন্দর মুখের ছবি দেখে কিংবা তার প্রোফাইলে দেয়া সুন্দর কোন স্ট্যাটাস দেখে এটা মনে করে নেয়া অন্যায় যে, বাস্তবেও ব্যক্তিটি তেমনই ভালো হবেন। কথায় আছে, একজন মানুষকে ভালভাবে চিনে নিতে সারাজীবন কেটে যায় ,মাঝে মাঝে সারা জীবনের অপচয়েও আমরা মানুষ চিনতে পারি না, সেখানে এই ভার্চুয়াল দুনিয়াতে এসে আমরা এতো মানুষ পেয়ে দিশেহারা হয়ে যাই, “রাখবো কাকে, বাঁধবো কাকে এবং অবশ্যই নিজের জীবন থেকে ছাঁটাই করবো কাকে ” অবস্থায় পড়ি, জড়াতে শুরু করি হ-য-ব-র-ল সম্পর্কে।

সম্পর্কের শুরুটা ভালো হলেও শেষটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয় না। ভার্চুয়াল জগতে দুদিনে চেনা মানুষের সাথে এমন সম্পর্ক কখনো গড়ায় প্রেম পর্যন্ত, কখনো বা বিয়ে পর্যন্ত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রেম টেকে না, তিক্ত কোন ঘটনায় দুজনের মুখ দেখাদেখি শেষ হয়, একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস জন্মাতে না জন্মাতেই অবিশ্বাসের বটগাছ ডালপালা মেলে, কদাচিৎ প্রেম টিকে, বিয়ে হলেও হঠাৎ করে বিয়েটাও গড়ায় ডিভোর্সে।

যেকোনো সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, খুব অল্প সময়ে কোনো মানুষের মধ্যে এই গুণাবলীর খোঁজ পেলেও তা কতোটা সত্য, কতোটা খাঁটি, তার সত্যতা পাওয়া অসম্ভব। চেহারায় মজে, সুন্দর স্ট্যাটাসে পড়ে শুধুমাত্র দুদিনের ঘোরাফেরায়, দু’দিনের মোহে যে বন্ধুত্ব, প্রেম, বিয়ের মত ভারী সম্পর্কগুলো টেকে না, এসব ভাঙ্গনই তার প্রমাণ।

অনেকেই আজকাল সময় কাটাচ্ছেন একাধিক মানুষের সাথে। “নয় বন্ধুত্ব, নয় প্রেম, তবুও কেমন যেন প্রেম প্রেম ” নামক এমন সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত থাকে না বেশিরভাগ সময়ই। এমন “ট্রায়াল এন্ড এরোর” পদ্ধতি প্রয়োগ করে সঙ্গী খুঁজে নেয়া মানুষদের ম্যাসেঞ্জারে ঘুরে আসলে দেখা যায়, “ভালোবাসি” শব্দের কী বহুল ব্যবহার!

“আজকালকার যুগে কেন এমন ব্যাপার বেশি?” জিজ্ঞাসা করে উত্তর পাওয়া গেল, “সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতা কমে যাওয়া, সম্পর্কে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এমন “শুধুই সময় কাটানো” নামের সম্পর্কের জন্য দায়ী। আগে একটা সম্পর্কের পেছনে যতটা না কাঠখড় পোড়াতে হতো, আজকাল এই মনের সম্পর্ক হরহামেশাই করা যাচ্ছে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার ভাইবার নামের মাধ্যমগুলোর মারফতে। সম্পর্কের এই সহজলভ্যতায় তাই বাড়ছে ঠুনকো সম্পর্ক, কমছে সম্পর্কের ওজন, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ওপর অবিশ্বাস।

বিশ্বাস,ভালোবাসা,শ্রদ্ধাবোধ কোথায় থাকে এই ক্ষণস্থায়ী সম্পর্কগুলোতে তা মালুম নেই তবে এসব সম্পর্ক চলে প্রেমিক যুগলের সেলফি, রেস্তোরাতে চেক-ইন আর ফেসবুকের ওয়ালে ভালবাসাময় স্ট্যাটাস দিয়ে। সম্পর্কের তাই ছ’মাস, ন’মাস পর যখন সম্পর্ক ভেংগে যায়, যখন এই ভালোবাসায় (!)  ভরপুর ছবি স্ট্যাটাসগুলো ‘অনলি মি’ করতে করতে ছেলেমেয়েরা হিমশিম খান, তখন বিচ্ছেদের কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলা হয়, “আমরা শুধুই বন্ধু ছিলাম, চ্যাপ্টার ক্লোজড” এমন সম্পর্ক দেখে বলতেই হয়, দুটো হাত দিয়ে যদি একিসাথে চারজন মানুষকে ধরতে চাওয়া হয়, কেউ কি বিশ্বাস করে হাতটা ধরে?

বিশ্বাসের অভাব যে শুধু এই ভার্চুয়াল জগতেই হয় তা কিন্তু নয়,পারস্পরিক বিশ্বাসের চরম দুর্দশায় পড়ে অনেক বছরের গড়া সংসারও তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ব্যাভিচারিতা আজকাল এ সমাজে ডালভাত। সংসারে একজন ভালো বাবা, একজন দায়িত্বশীল স্বামীর ভূমিকা পালন করে যাওয়া পুরুষটি বাইরে এসে ব্যাভিচারী হচ্ছেন। এ তো কখনোই অস্বীকার করার নয় যে, নারী ব্যাভিচারিণী হোন না, তবে এ তো আরো অস্বীকারের বাইরে যে পুরুষ নারী অপেক্ষা অধিক ব্যাভিচারী?

খুব আশ্চর্য লাগে যখন শোনা যায়, হঠাৎ করেই এতদিন পাশে থাকা সঙ্গিনীটি তার স্বামীর সব চাহিদা পূরণ করতে পারলেও “বন্ধু” হবার চাহিদাটি পূরণ করতে পারছেন না, যখন আরো বোঝা যায় নিজের বাহুপাশে আবদ্ধ হওয়া নারী ব্যতীত বাদবাকি সব নারীই এই “বিশেষ বন্ধু” হতে সক্ষম। আজকাল বিবাহিত পুরুষদের খুব হা-হুতাশ করে বলতে শুনি, “আমার স্ত্রী আর যাই হোন না কেন, বন্ধু হতে পারেননি” অন্য নারীর কাছ থেকে সহানুভূতি পাবার জন্য এর থেকে করুণতম আর্জি আর কী ই বা হতে পারে!

এই পৃথিবীতে দুর্লভ বস্তু হলো পুরুষের চোখের জল, সেই দুর্লভ চোখের জল দেখিয়ে যদি অন্য কোন নারীর সান্নিধ্য পাওয়া যায়, মন যদি নারীর গলানো যায়, তো ক্ষতি কী? যদি জিজ্ঞাসা করা হয় ব্যাভিচারী মানুষদের, “কেন এতো ছোটাছুটি, একজনের মধ্যেই কি সব পাওয়া সম্ভব নয়!”  উত্তরে আসে, “জীবনে দরজা একটা থাকলেও দম ফেলার জন্য জানালা তো অনেকগুলো থাকতেই পারে।”

যদিও দিন শেষে ব্যাভিচারী সঙ্গী ফিরে আসেন ঘরে, সঙ্গিনী অন্ধ বিশ্বাসে ধরেন সঙ্গীর হাত, জীবন কেটে যায় পরম বিশ্বাসে।খুব খারাপ লাগে যখন দেখি কোন অবিবাহিতা নারী কোন বিবাহিত পুরুষের সান্নিধ্যে পেয়ে তুষ্ট হচ্ছেন। কেন এমন কারো সাথে জড়িয়ে যাওয়া, যেখানে অন্য কোন নারীর আগে থেকেই বসত গড়া? এতো অবিশ্বাসী হয়ে লাভ কী? সময়ের অপচয় ছাড়া তো এ আর কিছুই নয়! ব্যাভিচারী হৃদয়ের পুরুষেরা সংসার ফেলে প্রেমিকার কাছে ফেরেন না, কারণ সংসারে তিনি প্রতিশ্রুতিশীল স্বামী! এমন দোটানার সংসারে একসময় বিশ্বাসে যদি সন্দেহ ভর করে, সংসারে ফাটল ধরে, চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে হয় ছাড়াছাড়ি, ভূক্তভোগী হোন তাতে যতো না স্বামী-স্ত্রী, তার চেয়ে বেশি সন্তান-সন্ততি। সুখের সংসার ভেংগে হয় চূড়চূড়।

এমনটা চলতেই থাকে,সাজানো মন সাজানো ঘর হয় আলুথালু, শুধুমাত্র বিশ্বাসের জন্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধার জন্য,একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত না থাকার জন্য। দু-একটা ঘটনা চোখের সামনে আসে, আমরা দেখে “আহা-উহু” করি, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই, একটা সময় নিজেরাই এসব ভুলে গিয়ে অন্যের কাছে অবিশ্বাসী হই। শিখতে পারি না কিছুই, বিশ্বাসীও হতে পারি না অন্যের কাছে, কিংবা অবিশ্বাসী হবার পাপে বিশ্বাসও হয়তো ধরা দেয় না আমাদের কাছে। মনের মধ্যে তাই ঘুরে ফিরে এক কথাই আসে, “বিশ্বাস তুমি কোন আকাশে ওড়ো, সে আকাশ কি মানুষের বিবেকের চেয়েও বড়???”

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.