লড়াইটা তো ওর একার নয়, আমার, আমাদেরও

0

আঁখি সিদ্দিকা:

আর ধর্ষিতা হয়ো না, আর না
আর যেন কোনও দুঃসংবাদ কোথাও না শুনি যে তোমাকে ধর্ষণ করেছে
কোনও এক হারামজাদা বা কোনও হারামজাদার দল।
তাসলিমা নাসরিন

হ্যাঁ ! আজও সেই এক কথা! এক ঘ্যান ঘ্যান! কার ভালো লাগে? তবুও বলতে ইচ্ছে না করা, বলতে না পারা কথা যে বলতেই হচ্ছে। কেনো? কারণ আপনি। আপনারা। বার বার আপনি, আপনারা পার পেয়ে যান, কোন শক্তির বলে? পেশীর জোরে বেরিয়ে পড়েন মুক্ত হাওয়ায় আবারও কাউকে মা, বোন বলে ডেকে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্যে?

ধর্ষণ অসুখ। অসুস্থতা বলে পার পেয়ে যান, আর কত কী নানা কৌশল আপনাদের? না হয় পূজার পর আর কোনো ধর্ষণ কি ঘটতে পারে?সেই লোমহর্ষক, বেদনার্ত ঘটনা মস্তিস্কের তন্ত্রীতে বহন করে চলেছি। তারপরও রোজ ঘটে যাচ্ছে। রোজ ভিকটিম হচ্ছে তন্ত্রমন্ত্রের মহাপুরুষেদের কাছে মেয়েরা, নারীরা, মায়েরা। কেন?

আজ (মঙ্গলবার ১১ এপ্রিল) দুপুরে আমাদের কলেজের (সরকারী মহিলা কলেজ, খুলনা) সাবেক প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম সৈয়দা লৎফুন নাহার ফোন করলেন, আমি অফিস থেকে বাসায় ফিরছি কিনা, জানতে। একটা মেয়ের অসুবিধা নিয়ে কথা বলবেন বলে। আমি ধরে নিয়েছিলাম ম্যাডাম মেয়েদের ক্যারাত শেখান, সেসব কোন বিষয় নিয়ে হয়তো কথা বলবেন। সন্ধ্যায় প্রথম আলো পত্রিকাটি হাতে নিয়ে বাসায় এলেন, যেখানে গতকালের নিউজ ‘মা’ ডেকে খুলনার কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ। লোকটির বয়স ৫৫। আমার পত্রিকা পড়া হয় খুব কম। আমি পড়িনি গতকাল। ম্যাডাম প্রথমে আমাকে পড়তে দিলেন।

বারবার বলছিলেন, বিচার পাবে না হয়তো। বিচারের বাণী তো নিভৃতে কাঁদে। কিন্তু লড়তে হবে। জানিয়ে দিতে হবে মেয়েদের ধর্ষণের কৌশল পরিবর্তন করেও পার পাওয়া যাবে না। কিছু একটা কর, প্লিজ!
– কী করতে পারি?
– কী করতে হবে ওদের?

‘ধর্ষিতা হয়ো না, বরং ধর্ষণ করতে আসা পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ধরিয়ে দাও হাতে,
অথবা ঝুলিয়ে দাও গলায়,
খোকারা এখন চুষতে থাক যার যার দিগ্বিজয়ী অঙ্গ, চুষতে থাক নিরুপায় ঝুলে থাকা
অণ্ডকোষ, গিলতে থাক এসবের রস, কষ।
ধর্ষিতা হয়ো না, পারো তো পুরুষকে পদানত করো, পরাভূত করো,
পতিত করো, পয়মাল করো
পারো তো ধর্ষণ করো,
পারো তো ওদের পুরুষত্ব নষ্ট করো।
লোকে বলবে, ছি ছি, বলুক।
লোকে বলবে এমন কী নির্যাতিতা নারীরাও যে তুমি তো মন্দ পুরুষের মতই,
বলুক, বলুক যে এ তো কোনও সমাধান নয়, বলুক যে তুমি তো তবে ভালো নও
বলুক, কিছুতে কান দিও না, তোমার ভালো হওয়ার দরকার নেই,
শত সহস্র বছর তুমি ভালো ছিলে মেয়ে, এবার একটু মন্দ হও।

চলো সবাই মিলে আমরা মন্দ হই,
মন্দ হওয়ার মত ভালো আর কী আছে কোথায়!’

তাসলিমা ভালো না তো! মন্দ হওয়ার আহবান জানিয়েছে তো! কিন্তু ধর্ষকের ভালোটা তো নিশ্চিন্তে বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রত্যেকে। শাস্তি হচ্ছে কি? তাদের শাস্তি নেই। অপমান নেই। দিব্যি হেঁটে বেড়ান । হাওয়া খান। বউ নিয়ে বিছানায় যান। শুধু খুলনায় না, সারা বাংলাদেশে, সমগ্র বিশ্বে পুরুষের লকলকে শিশ্নের শিকার নারীরা।

নারী ধর্ষিত হবে। তাকে ব্লাকমেইল অথবা হত্যা করা হবে। অথবা মেয়েটি সম্মান বাঁচাতে আত্মহত্যা করবে। কেউ কেউ পিঠ টান করে মামলা করেন। শাস্তি চান। কয়েকটি সংগঠন তাকে নিয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়ান। হুমকি পান। ক্ষমতা, অর্থের চেহার দেখিয়ে শাস্তি বোরকা পড়ে আড়ালে মুখ ঢাকেন। ধর্ষক কিছুদিন সিঙ্গাপুর, ম্যালেশিয়ার আরও ফূর্তি করে আবার বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়ান।

যিনি কুৎসিত প্রবৃত্তির শিকার হলো, তার শরীর মন পরিবার, সামাজিক অবস্থান লজ্জার অপমানের ঘূণপোকারা কুড়ে খেয়েও শেষ করতে পারে না। শেষ করতে হয়, জলাঞ্জলী দেন নিজেরা নিজেদের আনন্দময়, তীব্র যাপনের। যে উদযাপনে ভরে উঠতো তাদের পরিবার সেখানে যাপনটুকু হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।

খুলনার সোনাডাঙ্গায় ঘটে যাওয়া এই ঘটনার ভিকটিম তিনমাস নিজের সাথে যুদ্ধ করে আত্মহত্যার পথ খুঁজতে খুঁজতে এক রাতে মাকে বলে দেওয়ার সাহস অর্জন করে ফেলে। অন্য দশটা মায়ের মতো মুখ বুজে মেয়েকে সব মেনে নেওয়ার ছবক দেয়নি মেয়েটির সাহসী মা। বাবাকে বুঝিয়ে অভিযোগ নিয়ে যায় সোনাডাঙ্গা মডেল থানায়। থানায় ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়তে হয় তাদের।

মামলা দূরে থাক শুরুতে ওসি ও সহকারী কমিশনারের প্রশ্নবাণে জর্জরিত মেয়ে ও মাকে শুনতে হয় টাকার লোভে মেয়েকে লেলিয়ে দেওয়ার মতো আত্মা কাঁপানো অভিযোগও। শেষ পর্যন্ত অভিযোগে অটল থাকায় এবং অন্যান্য চাপে লোকাটিকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ, মামলাও নেয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রথম দিন। আতঙ্কিত মেয়েটি ও তার পরিবার কোর্টেই হুমকি পায়। বিদেশী টাকার তেলেসমাতি প্রলোভনও ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সমঝোতার ঝাণ্ডা উড়িয়ে মাঠে নেমে পড়েছে রাজনৈতিক নেতা, ‘মামলা চালিয়ে কিচ্ছু হবে না’-টাইপ জ্ঞানবাক্য নিয়ে পুলিশের এসি, এসআই দিচ্ছেন মিটিয়ে ফেলার চাপ। চার্জশিট দিতে চলছে নানান টালবাহানা। আপোষ-রফা করতে ফোনে হুমকি ধামকি তো আছেই!

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই মেয়েটি লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়। যা আশা জাগায়। যে ও হারেনি। মরে যায়নি। কুৎসিত মানুষটির বিচার চেয়েছে।

মেয়েটির পাশে এখন কেবল খুলনা নয়, সমগ্র বাংলাদেশ দরকার। এইরকম একটা দুটো খারাপ মানুষ উপড়ে ফেলা সম্ভব। যদি সম্মিলিত চেষ্টা থাকে। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া, হায়েনাদের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই দেশের গণমানুষের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে বড় আর কোন শক্তি নেই। থাকতে পারে না।

শুনেছি ঘটনাটা পত্রিকায় আসার পর কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক, প্রথম আলোর শরিফুল হাসান, গোলাম মর্তুজা অন্তু, সমকালের শাকিল ফারুক, খুলনার সাংবাদিক শেখ আল এহসান, হিমালয় সবার কাছ থেকে ভূক্তভোগির পরিবার যে সহযোগিতা পেতে শুরু করেছে তা ভীষণ আশা জাগানিয়া।

ডিএমপির এক ডিআইজির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের সঙ্গে আজকেই ভূক্তভোগি মেয়েটি ও তার পরিবার দেখা করতে পেরেছে। বলতে পেরেছে অভিযোগ। সব শুনে কমিশনার মহোদয় সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন। পাশাপাশি দু-এক দিনের মধ্যেই মামলার চার্জশিট দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন সর্বোচ্চ সহযোগিতারও। আমাদের এখন ভয় বিদেশী টাকার জোরে মেডিকেল রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত না রাতারাতি ‘উধাও’ হয়ে যায়!

খুলনার এই মেয়েটি জীবনের একেবারে শুরুতেই যে ভয়ানক ধাক্কা খেলো তার জন্য দায়ী যে তার বিচার চাইছে। ও ওর জীবন নিভিয়ে দিতে পারতো। হারাতো নিজেকে। হেরে যেতো। কিন্তু দমেনি। হারিয়েও যায়নি। হেরে যায়নি। শুরু করেছে অদম্য এক লড়াই। এ লড়াই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠিত করার। এই লড়াই অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের টিকে থাকার।

কঠিন এ লড়াইয়ে মেয়েটি কি একা? আজ যদি ও হারে, হেরে যাবে নাকে সমগ্র বাংলাদেশ? সমগ্র মানবতা? সমগ্র ন্যায়? পরাজিত হবো মুখে মুখে বিপ্লব করা গোটা প্রজন্ম। বিশ্বাস করি, এই লড়াইটা ওর একার নয়, এই লড়াইটা আমাদের সবার। অন্ধকার দুর্গম পথ শেষে আলোর মশাল হাতে মেয়েটি আমাদের যে ন্যায়ের নতুন ভোর দেখাতে চাইছে, চলুন চেষ্টা করি দেখার। ওর কাঁধে নির্ভরতার হাতটি রাখি। বিচারের দাবি তোলা মেয়েটির ক্ষীণ আওয়াজটাকে চলুন না সবাই মিলে দুর্বার এক স্লোগানে পরিণত করি, ছড়িয়ে দেই আরো সহস্র প্রতিবাদী কন্ঠে।

বলি, লড়াইটা তোর একার নয় রে, আমারও …. আমাদেরও!

বিঃদ্র- অনেকেই মেয়েটির পাশে থাকতে চাইছেন। তাদের জন্য বলি, আগামী ১৬ এপ্রিল এ ঘটনার বিচার দাবিতে একটি মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মেয়েটির কলেজের বন্ধুরা। অন্যান্য কলেজ ও আগ্রহীরা অংশ নিতে পারেন। সময় ও স্থান পরে জানিয়ে দেয়া হবে।

লেখাটি ৯৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.