বৈরী সংসারও যখন আটকাতে পারে না মেয়েটিকে – ৬

0
ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:
মেঘলা দিনের অলসতা পেয়ে বসেছে লাবণীকে। আজ সে কোথাও যাবে না। ঝড়ের মতো একটা সপ্তাহ পার হলো যেন! বেশ কয়েকটি  দেশি – বিদেশি সংস্থা তাঁর স্কুলের সাথে যুক্ত হতে আগ্রহী। লাবণী বরাবরই নিভৃতে নিজের কাজটুকু করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সত্যি বলতে কী এতো নাম, যশ, সম্মান, সম্মাননা কিচ্ছুটি সে আশা করেনি কোনোকালে। সৌমিকের জন্মের পর কীভাবে যেন সব পালটে যেতে থাকলো।
লাবণীর একমাত্র সন্তান সৌমিক। জন্মের শুভক্ষণে পূর্ণ চাঁদের মতো আলো ছড়িয়েছিলো ওর মুখখানা। লাবণীর জীবনে এমন স্বর্গীয় মুহূর্ত  বুঝি আর কখনো আসেনি। আনন্দে জলে টলমল করছিলো চোখ। এর আগে ডাক্তার জানিয়েছিলেন মায়ের নাড়ি বাচ্চার গলায় পেঁচিয়ে জটিল পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। লাবণীর ব্লাড প্রেশারটাও ওঠানামা করছিলো ঘন ঘন। সব কিছু দক্ষ হাতে সামলে নিয়েছিলেন ডাক্তাররা। লাবণী যখন অপারেশন থিয়েটারে, বাইরে তখন পরিবার ও বন্ধুমহলের অনেকগুলো উদ্বিগ্ন মুখ অপেক্ষামান। শুধু লাবণীর সন্তানের বাবা রাশেদকে দেখা গেল নির্বিকারভাবে মোবাইলে কী যেন এক গেইম খেলায় মগ্ন ! রাশেদের সাথে লাবণী আর সৌমিকের আজ আর কোনো যোগাযোগ নেই তবুও সেই অমানবিক দৃশ্য আজো ভুলতে পারেনা লাবণী। যদিও রাশেদের অমানবিকতার
আরো অনেক পরিচয় এর  আগে – পরে সে পেয়েছে। সে সব কিছু ছাড়িয়ে গেছে যখন সে সৌমিককে গ্রহণ করেনি সে বিশেষ শিশু বলে! এছাড়া আরো অনেক খোঁড়া যুক্তিই সে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। নিজেকে মুক্ত না করে লাবণী আর পারেনি। 
অন্ধকার মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। এতো বছরে যা মনে আসেনি আজ কেন সেইসব সময়গুলো ভাঙা আয়নার শত টুকরো কাঁচের মতো চোখের সামনে বারবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে ভেবে পায়না লাবণী। 
মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা লাবণী রাশেদের সাথে বিয়ের আগে অন্য একজনের প্রেমে পড়েছিলো। লোকটি ছিলো আর্মির এক ক্যাপ্টেন। তখনো ল্যান্ড ফোনের চল ছিলো। একটা রং নাম্বার কল থেকে পরিচয়। কলেজ পড়ুয়া লাবণীর ধ্যানে জ্ঞানে তখন ক্যাপ্টেন মারুফ। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই যে ছেলে কিনা বাড়িতে লাবণীর কথা জানাবে। পারিবারিক সম্মতিতে ঘটা করে বিয়ে হবে তাদের। বোকা মেয়ের মতো লাবণীও তখন সাজানো সংসারের স্বপ্নে বিভোর। মায়ের কাছে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে লাবণীর এক বিবাহিত বান্ধবীর বাড়িতে প্রতি সপ্তাহেই দেখা হতে লাগলো দুজনের। লাবণীদের বাড়িতেও যাতায়াত শুরু হয়। ঈদের আগে লাবণীকে শাড়ি উপহার দেয় মারুফ। সাথে গোপন উপহার  ব্রা – প্যান্টি।  লাবণীর বাবা- মা আর ছোট ভাইয়ের জন্যেও ঈদের কাপড় আনে হবু জামাইয়ের মতো। সে এক বিব্রতকর অবস্থা।  লাবণীর মায়ের হাতের রান্না খেলেই তার নাকি নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে।  লাবণী শারীরিক ও মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়ে এই সম্পর্কের জালে। গভীর রাত অব্দি ফোনালাপ চলতো। মারুফ তাকে মাঝেমধ্যে  অনুরোধ করতো যেন সে শুধুমাত্র হবু স্বামী  মারুফের জন্য একটা ” ফটোসেশন ” করে যেখানে লাবণীর গায়ে একটা সুতোও থাকবেনা! নানান বিশ্রী ভঙ্গিমাও শিখিয়ে দেয় ক্যাপ্টেন সাহেব। ছবিগুলো মারুফই তুলে দেবে এবং নিজের স্ত্রীর ছবি নিজের গোপন সম্পত্তি হিসেবেই যত্নে রাখবে।
” আফটার অল ” তারা তো মনেপ্রাণে স্বামী – স্ত্রী-ই  ভাবে নিজেদেরকে। সবকিছুতে সায় দিলেও এই প্রস্তাবে লাবণী সায় দিতে চায় না। লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। মারুফের পীড়াপীড়িও চলতেই থাকে।
একদিন হঠাৎ লাবণীর খুব শরীর খারাপ লাগে। এমন খারাপ আগে কোনোদিন লাগেনি। মাথার মধ্যে মনে হয় কে যেন একশো হাতুড়ি একসাথে পেটাচ্ছে। মাথা তুলতে পারেনা। রান্নাঘরে ভাত রান্না হলে মাড়ের গন্ধে সে নাকে ওড়না চেপে বসে থাকে। আগে তো কখনো মাড়ের গন্ধে এমন গা গুলোয়নি! এই মাসে তো পিরিয়ডও হচ্ছেনা! ওষুধের দোকান থেকে প্রেগন্যান্সি টেস্টের স্ট্রিপ কিনে দেখা গেল আশংকা সত্যি হয়েছে। মারুফকে ফোন করে লাবণী। সে নিশ্চই তাকে ফিরিয়ে দেবেনা। মারুফ সব শুনে সহসা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে কারণ সন্ধ্যায় তার পার্টি আছে। পরে কথা হবে বলে তড়িঘড়ি ফোন রেখে দেয়। পরের সাতদিন মারুফের সাথে যোগাযোগের জন্য পাগলের মতো চেষ্টা করেও কোনো খোঁজ পায়না লাবণী । 
দোকান থেকে খালাতো বোন শিলুকে সাথে নিয়ে নিরাময় হোমিওহলের ডাক্তার কাকুর কাছে ছোটে সে। ডাক্তারকাকু পিতৃতূল্য , অভিজ্ঞ মানুষ। লাবণীকে আলাদাভাবে ডেকে অভয় দেন যে কাউকে কিছু বলবেন না। এরপর চিন্তিত মুখে জানান যত দিন যাবে, দেরি হয়ে যাবে। একজন বিশ্বস্ত নার্সের সাথে আলাপ করিয়ে দেন। তার বাড়িতেই কাজ করা যাবে  বারো’শ টাকা তাকে দিতে হবে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানা যায় ক্যাপ্টেন মারুফ অন্য শহরে বদলি হয়ে চলে গেছে।
তখনো অন্ধ ভালোবাসার ঘোর কাটেনি লাবণীর। ভাবে হয়তো বাড়িতে বিয়ের কথা জানিয়ে একবারে সারপ্রাইজ দেবে তাকে। 
লাবণীর হাতে কোনো টাকা নেই। এতোটাকা চাইলে বাড়িতেও সন্দেহ করবে। বান্ধবীও ঝামেলা এড়াতে চাইছে মনে হয়।
ক্লাস নাইন পড়ুয়া শিলুকে সাথে নিয়ে কাঁচাবাজারের পেছনের স্যাঁতসেঁতে সরুগলিতে দ্রুত ঢুকে পড়ে। বস্তির মতো অনেকগুলো একতলা ঘর। সেখানেই একটি ঘরে নার্স সুজাতা’দির ঘর। মাদুর পাতা চৌকিতে তেলচিটে বালিশ, নলের মতো কী একটা যন্ত্র, বালতি, পানি, ছেঁড়া কাপড়। এসব দেখে লাবণী কান্নাকাটি শুরু করে। সুজাতা’দি প্রথমে মাথায় হাত রেখে ওপরে দেখিয়ে বলে, ” তাঁকে ডাকো দিদি, ভয় পেয়োনা। ” এতে কাজ না হলে কঠিন গলায় বলে যে, তার কান্না শুনে লোক জড়ো হলে লাবণীর জন্যই ভালো হবে না।
বাকী সময়টা শিলু পাথরের মতো শক্ত হয়ে লাবণীর হাত ধরে বসে থাকে। শিলুকে তখন মায়ের মতো লাগে,  সেই ছোট্ট মেয়েটি বলে হয়না। এই একটি ঘটনাতেই যেন অনেক বড় হয়ে যায় শিলু। 
কাজ শেষে দুই হাজার টাকা দামের সোনার চেইনটা খুলে সুজাতা’দির হাতে দিয়ে আসে লাবণী।
বেশ কিছুদিন পর লাবণীর বাড়ির ঠিকানায় এক হাজার টাকাত একটা মানি অর্ডার আসে। মারুফ পাঠিয়েছে লাবণীর বিশ্বাসের দাম!  মফস্বল শহরে ক্ষণিকের বিনোদন হবার পারিশ্রমিক।  লাবণী টাকাটা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দেয়। ডাকপিয়ন খানিকটা অবাক হয়ে ফিরে যায় নিজের কাজে, অন্য অনেক ঠিকানায় যাওয়া তখনো বাকী।
কবেকার কথা। লাবণীর আজ মনে হয় ভুল করলেও লজ্জাটা তার নয়। লজ্জা আর অপমান সেই কুৎসিত লোকটার, যে তার মুখোশের আড়ালে কুশিক্ষা, কুরুচি আর প্রতারকের পরিচয়টা দিয়ে গেছে । 
দিন থেমে থাকেনি। সব কিছু ঝেড়ে ফেলে লেখাপড়ায় লাবণী এগিয়ে যেতে থাকে।
বছর পাঁচেক পর ব্যাংকে কর্মরত রাশেদের সাথে আলাপ হয়। লাবণী এড়িয়ে চললেও রাশেদ সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আবারো কেউ একসাথে পথ চলার স্বপ্ন দেখায়, হাতে হাত রাখতে চায়। বাড়ি থেকেও চাপ আসে বিয়ের জন্য। লাবণী ঠিক করে রাশেদকে সে তার জীবনের সব কথা খুলে বলবে। যে তার জীবনসঙ্গী হবে তার কাছে সে কোনো লুকোচুরি রাখবেনা। তখনো “পুরুষ” আর “মানুষ” হওয়াতে যে কতটা তফাৎ তা বোঝেনি লাবণী। এক জীবনে ক’ জনই বা পারে পুরুষ থেকে মানুষ হয়ে উঠতে? 
রাশেদও পারেনি। সব ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পারেনি কথা রাখতে। বিয়ের পর থেকে লাবণীকে সে পুরনো কথা টেনে যন্ত্রণা দিতে শুরু করে। মদ্যপ অবস্থায়, সুস্থ অবস্থায় এমনকি তার মায়ের সামনে, ছোট ভাই -বোনদের সামনে, “আগে কার কার সাথে শুয়েছিলি মনে নাই?  কয়বার বাচ্চা ফেলাইছিস বল সবার সামনে! যে পাপ করে আসছিস তোর তো আর বাচ্চাকাচ্চা হবেনা কোনোদিন! ”  – লাবণীর আত্মহত্যার প্রয়োজন হয়নি, সে এমনিতেই জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে ছিলো। রাশেদ আবার বিয়ে করবে হুংকার দিয়ে সদর্পে এই ঘোষণাও দিয়েছে বহুবার। 
এর মাঝেই নিজের ভেতরে নতুন প্রাণের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে লাবণী। এবারে সে মনপ্রাণ দিয়ে আগলে রাখতে চায় অনাগত সন্তানকে। একজন মানুষ পৃথিবীতে আসছে যে তার বন্ধু হবে, আপন হবে।  রাশেদ তার জীবনে কোনো অর্থ বহন করেনা। একই ছাদের নীচে থেকেও যে কী নিরব প্রতিবাদ করা যায় তা দেখিয়ে দেয় লাবণী। রাশেদকে অগ্রাহ্য করা শেখে। নিজেকে ভালোবাসতে শেখে। রাশেদের অবহেলাকে অবজ্ঞা করেই জন্ম হয় সৌমিকের। সৌমিকের জন্মের কিছুদিন পর বোঝা যায় সে সাধারণ শিশু নয়, স্পেশাল চাইল্ড বা বিশেষ শিশু, গিফটেড চাইল্ড – এমন অনেক নামে যাদের ডাকা হয়। রাশেদের বদ্ধমূল ধারনা, লাবণীর অতীত জীবনের পাপই এমন সন্তান জন্মানোর জন্য দায়ী।  রাশেদ যখন সৌমিকের বাবা হতে অস্বীকৃতি জানায় রাশেদের সাথে কাগজেকলমে  বিচ্ছেদটাও হয়ে যায় লাবণীর। মনের বিচ্ছেদ তো সেই কবেই ঘটেছে। 
সৌমিককে মানুষ করতে করতেই লাবণীর সামনে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে যায়।
সৌমিক কথা বলতো না। একবার মায়ের কাছে সৌমিককে রেখে লাবণী একটা ট্রেনিং এ গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। ফিরে আসার পর অবাক হয়ে খেয়াল করলো সৌমিক তার ওড়নার কোণা ধরে থাকে সারাক্ষণ এমনকি ঘুমের মধ্যেও। সেদিন লাবণীর খুব বেশি করে মনে হয়েছিলো কথা না বলতে পারা একটি শিশু কথা বলতে পারা মানুষদের চেয়েও অনেক বেশি অনুভূতিপ্রবণ, অনেক বেশি তার ভালোবাসার ক্ষমতা। অটিজম সম্পর্কে জানা, পড়া, পরিবার কিংবা স্কুলগুলোর সীমাবদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করা,  সৌমিকের বন্ধুদের সাথে সময় দিতে দিতে কখন যে ওদেরই একজন হয়ে উঠেছিলো সে বুঝতেই পারেনি। প্রথমে সৌমিকের স্কুলের সাথে সম্পৃক্ত হয় সে, তারও অনেক পরে নিজের স্কুলটা শুরু করে। এখন তার স্কুলে চল্লিশজন বাচ্চা  জীবনের জয়গান গাইতে শিখছে।  ওদেরকে না জানলে তার জানা হতোনা ওরা সত্যিই মর্ত্যলোকে নেমে আসা এক আশ্চর্য দেবশিশুর দল।
লেখার টেবিল থেকে বিছানার দিকে চোখ যায় লাবণীর। পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে দশ বছরের সৌমিক। এই মেঘলা দিনের নিঝুম দুপুরেও লাবণীর ঘর পূর্ণ চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে ।

লেখাটি ১,৩৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.