অটিজম ও বিষন্নতা সংক্রান্ত লেখা নিয়ে দুটি কথা

0

সুপ্রীতি ধর:

ভীষণ অস্থিরকাল যাচ্ছে আমার, অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না, অনেক লেখা জমা হচ্ছে, ছাপতে পারছি না। নিজেও বিষন্নতায় ভুগছি বহুকাল ধরে। প্রথম প্রথম মন খারাপ হতো, আমার মন খারাপ নিয়ে ট্রল করতো সকলেই, কেউ সিরিয়াসলি নেয়নি। উপরন্তু তারা নিয়মিতভাবে আমার সমালোচনা করে গেছে, কেন আমি ফেসবুকে এসব লিখি, কেন সবাইকে বলি, নানান কিছু! আসলে আমার বলার মতো কোনো জায়গা ছিল না বলেই লিখতাম, লিখে নিজে হালকা হওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বিধিবাম! আমার দুর্বলতাগুলোকেই মোক্ষম অস্ত্র করে নেয় সমালোচকেরা, আমার অ-শুভাকাঙ্খীরা।
আমার মন যে যে কারণে খারাপ হতো, সেই কারণগুলো চিহ্নিত করে তা উপশম করার বদলে রক্তীয়-আত্মীয়-বন্ধুরা যেন উল্লাসে মেতেছিল কী করে আমায় বিষন্নতার রোগীতে পরিণত করা যায়! তারা আজ সাকসেসফুল।
আমি আমার কথা লিখবো, বেশি করেই লিখবো এ কারণেই যেন আরেকজন এমন অবস্থায় না পড়ে জীবনে, পড়লেও যেন শত শত হাত তার দিকে বাড়ানো থাকে। আমি নিজে ভুক্তভোগী হওয়াতেই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছি। তাই হরেক রকম লেখা আসছে, তা দেয়ারও চেষ্টা করছি। কিছুটা হলেও কেউ যদি কোনো একটা লেখা থেকে একটু হলেও উপকৃত হয়, এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমার। 
গত কয়েকদিনে ছাপা হওয়া দুটো লেখা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে অনলাইনে। আলোচনা হওয়াটা অবশ্যই ভালো, যতো বেশি আলোচনা হবে, ততোই মানুষের চোখ খুলবে। মানুষ দুই পক্ষকেও বিচার করতে পারবে। তারপর তার জন্য যেটা ভালো, যেটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হবে, সেটাই নেবে। উইমেন চ্যাপ্টার তো আসলে কোনকিছুর সলিউশন দিতে পারবে না, মতামত তুলে ধরতে পারবে মাত্র। গ্রহণ করার ভার পাঠকদের হাতে। 
তারপরও দুটো কথা বলছি এখানেই। ফেসবুকেই দিতে পারতাম, তাহলে আবার উইমেন চ্যাপ্টারের পাঠকদের থেকে দূরে থাকতাম। 
বিষন্নতা অসুস্থতা কিনা – এ সংক্রান্ত একটি লেখা ছাপা হয়েছে সীমা কুণ্ডের। বিষন্নতা নিয়ে লেখাটা পাবলিশ করার আগে আমার নিজেরই মনে হয়েছিল, খুবই হালকা-পলকা একটা লেখা। সীমার সাথে পরিচয় লেখার মাধ্যমেই। প্রতিটি লেখকই আমার ভালবাসার মানুষ। তাই ভালোবেসেই বলেছি, বিষন্নতা একটা ভয়াবহ পর্যায় জীবনের, একে এতো হালকা করে দেখার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে, এবং হচ্ছেও। তবে তার লেখায় একটা ছোট দিক মাত্র উঠে এসেছে, আর সেজন্যই অস্বীকার করার প্রয়োজন তো নেই। ছোট ছোট মন খারাপ একদিন মহীরুহ আকার নেয় বা নিতে পারে, প্রতিটা মানুষের সেদিকটাই নজর দেয়া আবশ্যক বলে মনে করি। 
আবারও নিজের প্রসঙ্গ টানছি। আমার মন খারাপগুলোকে কেউ যদি একটু ভালবেসে উপশম করার চেষ্টা করতো, যখন আমি নিজে অপারগ, তখন কেউ যদি আমার হাতটা এসে ধরতো পরম মমতায়, বিশ্বস্ততায়, এই আমিই আজ তাহলে অন্য একজন মানুষ হতাম। কেউ ধরেনি, বরং সবাই দূরে ঠেলে দিয়েছে, ফিরিয়ে দিয়েছে, আরও শতগুণ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের চরম বিপর্যয়ের সময় একটা কাঁধ আমি পাইনি রাখার জন্য, ভালবাসা তো ম্যালা দূরের ব্যাপার।
তাই বলি কী, সমালোচনা না করে পাশের মানুষটিকে খেয়াল করুন, হাতটি ধরুন যদি সে চায়, যদি সে প্রয়োজন বোধ করে। নিজের হতাশা, না পাওয়ার কারণেই উইমেন চ্যাপ্টার আমি তৈরি করেছিলাম। করাই হয়েছিল এমনই একটি চিন্তা থেকে, যে এখানে আমরা একজন আরেকজনকে নিজের কাঁধটি এগিয়ে দেবো, যেন সে পরম নিশ্চিন্তে তার মাথাটি রাখতে পারে, প্রয়োজনে কাঁদতে পারে, আমরা একজন আরেকজনের চোখের জল মুছে দেবো। হাতটি ধরে বলবো, আর কেউ না থাকুন, আমরা তো আছি!
 (এ নিয়ে পরে আরও লিখবো, অটিজম নিয়ে দুটি কথা বলি এই যাত্রায়)
দ্বিতীয় যে লেখাটি নিয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে তাহলো অটিজম ও পুষ্টি সংক্রান্ত একটি লেখা। শাহমিকা আগুনের লেখা, যিনি নিজে একজন পুষ্টিবিদ এবং একটি অটিস্টিক শিশুর মা। তিনি তার জ্ঞানলব্ধ অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মিশেল থেকেই লেখাটি লিখেছেন। সমালোচকেরা বলছেন, এই লেখায় অনেকে ‘ভুল তথ্য’ আছে।
 
আমি একটু বলি?
সমালোচনাটা চোখে আসার পর আমি লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। উনি একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই দেবেন। এবং দিয়েছেনও এক জায়গায়। এখানে তা তুলে ধরলাম-
 
I am a nutritionist for 11 years who completed many other credible courses successfully and also got the training from the top most therapists in the U.K. Autism isn’t a mental health condition. I am also a mother of an autistic child. Who was desperate. The best thing I did in my life is to stop listening the bull-shit from some of the professionals and started to train myself and like so many other parents I saved my son. The nutrition and kinesiology therapy is a proven therapy and rescued so many children from autism, ADHD, learning disabilities. I wrote very clearly in my article how child’s system get affected and what part of the nerve and brain gets affected . Here I am to bring light to these children and families like so many other therapists. Don’t say that I don’t know. Infact I probably know a lot more than a lot of stereo type professionals who only go through the theory. Some body was talking about chromosome. How the DNA and chromosome structure change????? It doesn’t change for no reason. It changes because there is something is missing to build that structure. Talking about intelligent parents get autistic children. How illiterate assumption is that!!!! How dare you guys to judge us and our children !!!!! There are thousands of children got better using latest treatment.
এটা একজনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শাহমিকার পাল্টা মন্তব্য। তারপরও তাকে বলেছি, যদি তিনি প্রয়োজন মনে করেন, তবে যেন একটা উত্তর লেখেন সবার জন্য। আশা করি, তিনি লিখবেন, এবং সেটাও আমরা ছাপবো। 
কথা হচ্ছে, অটিজম বর্তমান সময়ে খুবই মারাত্মক আকার নিয়েছে। আগেও যে বিষয়টি ছিল না, তা নয়। হয়তো তখন এভাবে সামনে আসতো না বা আলোচিত হতো না বলে আমরা জানতে পারিনি। কিন্তু এই সময়ে আমার জানার মধ্যেই অসংখ্য শিশু অটিস্টিক। আমি সেই মায়েদের দেখি, তাদের লড়াইটা দেখি। কী ভয়াবহ সেই জীবন লড়াই। আমি একেবারেই কিছু জানি না এই বিষয়ে, কিচ্ছু না। কিন্তু মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানেন? মনে হয়, আমরা যারা নিজেদের ‘স্বাভাবিক’ বলে দাবি করি, তারাও কোনো না কোনো ধরনের অটিজমে আক্রান্ত, আমাদের প্রায় সবারই আচরণগত সমস্যা আছে, কে জানে সেইগুলো অটিজমভুক্ত কীনা! আবার নিজেদের এইসব আচরণকে আমি (অবিশেষজ্ঞ) স্কিৎজোফ্রেনিয়ার অংশ হিসেবেও দেখি। পৃথিবীতে কত ধরনের যে স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে, সবাই হয়তো কমবেশি তাতে আক্রান্ত। কে জানে! এসবই আমার মনের একান্ত ভাবনা। কিন্তু নিজের এবং চারপাশের সবার আচরণ যখন বিশ্লেষণ করি নিজে নিজে, তখন এই চিন্তাগুলো মাথায় আসে আজকাল। 
এগুলো কেন বলছি? বলছি এ কারণেই যে, এই যে শাহমিকার লেখাটা ‘ভুলে ভরা তথ্য’ বলে একদল প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন, সেই কারণেই। উনি একজন পুষ্টিবিদ, উনি উনার অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছেন, এরকম অন্য যারা আছেন, তারাও তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে হাজারটা লেখা লিখতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। এরকম লেখা পেলে স্বাগতম, আমি সেইগুলো প্রকাশ করবো। কারণ একজন অটিস্টিক শিশুর মায়ের লড়াই আমি জানি, দেখেছি, তাই চাই, যদি কিছুটা হলেও এতে তাদের উপশম হয়, আশার আলো যদি তারা দেখতে পান! এটা অনেকটা ‘পাশে আছি’, ‘হাতটা ধরা’ এবং ‘কাঁধটা এগিয়ে দেয়া’র মতোনই।
একজন মা হয়ে, একজন নারী হয়ে, একজন মানুষ হয়ে আমি যদি আরেকজন মা, আরেকজন নারী এবং সর্বোপরি আরেকজন মানুষের পাশেই না দাঁড়াতে পারলাম, কাজেই না লাগলাম, তাহলে আমার এই মনুষ্য জীবন কেন? 
যতো বেশি লেখা হবে এ নিয়ে, ততো বেশি মানুষ উপকৃত হবে। কাজেই কোনো লেখা বা লেখার কোনো অ্যাঙ্গেলকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন না প্লিজ। লেখা দিয়েই লেখার সমালোচনা হতে পারে, কাউকে অসম্মান করে নয়, কাউকে ‘ডাউন’ করে দেয়ার নিমিত্তে নয়। 
সমালোচনা হোক, লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা-সম আলোচনা হোক, কিন্তু উদ্দেশ্য বা সমালোচনার কেন্দ্র যদি হয় ‘উইমেন চ্যাপ্টার’ তবে তা কষ্টকর বৈকি!
লেখক: সম্পাদক, উইমেন চ্যাপ্টার
শেয়ার করুন:
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

লেখাটি ২,৪১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.