নিজেকে নিয়ে আমি লজ্জিত নই

0

শান্তা মারিয়া:

কোনো রাখ-ঢাক নেই। যা বলবার সরাসরিই বলবো। হ্যাঁ, এটা আমার জীবনের গল্প। এবং এটা বলতে আমি মোটেও লজ্জিত নই। গত দেড় বছর ধরে ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করছি। এবং সেই লড়াইটাতে মনে হচ্ছে আমি জিতে গেছি।

আমাদের মানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এই শ্রেণীটার সমস্যা কী জানেন? আমরা নিজের সমস্যার কথাটা মুখ ফুটে স্বীকার করতে পারি না। পাছে লোকে কিছু বলে। আমরা সুখী না হয়েও ঠোঁটে ‘সুখী হাসি’ ফুটিয়ে তুলতে খুব ভালোবাসি। তাহলে অন্যরা আমাদের সম্মান করবে, আমি অন্যদের চেয়ে ‘লাকি’ একথা মনে হবে, বান্ধবীরা, প্রতিবেশিরা ঈর্ষা করবে। অন্যের চোখে ঈর্ষণীয় হওয়ার লোভে, অন্যের করুণা পাওয়ার ভয়ে, সংকোচে, দ্বিধা-দ্বন্দ্বে, আমার দুঃখে অন্যরা গোপন সুখ ও আত্মতৃপ্তি পাবে এই ভয়ে এবং আত্মীয়-স্বজনের নিন্দার ভয়ে আমরা নিজের কথাগুলো কেবলই চেপে রাখি। মনের ভিতর রক্তক্ষরণ হলেও মুখে হাসি ধরে রাখি। কেবলি সুখী হওয়ার ভান করি।

আমিও একজন এমনি ভান করা মানুষ।

গত বেশ কয়েক বছর ধরে আমার পারিবারিক জীবনে সমস্যার শেষ নেই। নিজের ক্যারিয়ার নিয়েও চরম অসন্তোষে ভুগেছি। অনেক সহকর্মীর অহেতুক শত্রæতা আমাকে বিপর্য¯Í করে দিয়েছে এবং দিচ্ছে।

আমার মা ডিমেনশিয়ার রোগী। তিনি সারা রাত আমার শোবার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন। আর দরজা খুলে রাখলে ঘরে ঢুকে কানের কাছে চিৎকার করেন। আমি যতোক্ষণ বাড়িতে থাকি উনি কিছুতেই ঘুমান না। প্রায়ই খাবার জিনিষপত্র সব নষ্ট করে ফেলেন। সারাক্ষণ একটা না একটা ঝামেলা লেগেই আছে। ফলে বাড়িতে যতোক্ষণ আছি এক সেকেন্ডও শান্তি পাই না। বাবাও গুরুতর অসুস্থ। বাজার থেকে শুরু করে বাড়ির অধিকাংশ কাজ আমাকেই করতে হয়।

লেখালেখির কারণে জীবননাশের বেশকিছু হুমকি ও বিরোধিতার মধ্যেও আছি। আর আর্থিক টানাপোড়েন তো মধ্যবিত্তের চিরকালীন সমস্যা।  

সব মিলিয়ে গত দেড় বছর ধরে চরম ডিপ্রেশনে ভুগছিলাম। বিষন্নতা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে আমি প্রায়ই আত্মহত্যার কথা ভাবতাম। নিজের কাছ থেকে ঘুমের ওষুধ দূরে রাখতাম।  রান্না করার সময় কেবলি মনে হতো ছুরিটা দিয়ে হাতের শিরা কেটে ফেলি। স্নানের সময় মনে হতো শাওয়ারে ওড়নাটা বেঁধে ঝুলে পড়লেই সব সমস্যার সমাধান। রাস্তায় যখন চলতাম, মনে হতো ট্রাকের নিচে পড়লেই হয়। শেষ এক বছর সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

বলা যায় শেষ এক বছর আমি মৃত্যুর খুব সরু কার্নিশ দিয়ে হেঁটেছি। কারও সাহায্য পাইনি। সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুটিও সময় দিতে পারেনি। বাড়ির লোকেরা আমার দুঃখ, মন খারাপের দিকে ফিরেও চায়নি। এমনিতেই আমার বন্ধু খুব কম। অসংখ্য পরিচিত মানুষ থাকলেও এমন কোনো বন্ধু নেই যার সঙ্গে সমস্যাগুলো শেয়ার করা যায়।

আখতার জাহান জলিসহ একটার পর একটা আত্মহত্যার ঘটনা শুনেছি আর ভেবেছি এবার আমার পালা।

যাই হোক এই যখন অবস্থা তখন মাত্র তিন সপ্তাহ আগে কী করে বেঁচে গেলাম সেই গল্পটাই না হয় বলি। হয়তো আমার ঘটনা থেকে অন্যরাও উপকৃত হবেন।

বিষন্নতা থেকে বাঁচার জন্য আমি নেট ব্রাউজ করে বেশ কয়েকটি  সাইট থেকে বিভিন্ন পরামর্শ পাই। তারপর যেগুলো নিজের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে মেলে সেগুলো নিয়ে নিজেকে অটো সাজেশন দেই। আমি নিজেকে কিছু কথা বলি।

প্রথমত, সবকিছু দেখার চেষ্টা করি ইতিবাচকভাবে। যে সমস্যাগুলো আমার জীবনে রয়েছে সেগুলোর মধ্যে অধিকাংশই আমি সমাধানের ক্ষমতা রাখি না। যেহেতু ক্ষমতা রাখি না অতএব সেগুলো নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ভোগা বন্ধ করি। যা হবে তা আমি মেনে নিব এবং তখন সেটি সমাধানের পথ খুঁজব এই বলে নিজেকে বুঝাই। যারা শত্রুতা করছেন তাদের আমি থোড়াই কেয়ার করি। তারা যে আমাকে পছন্দ করে না সেটা তাদের সমস্যা, আমার নয়।

ছোটখাটো বিষয় থেকে সুখ খুঁজে নেওয়া শুরু করি। আমি একাই আজকাল ঢাকায় এখানে ওখানে বেড়াই। সঙ্গীর অভাবে আমি মোটেই কাতর নই। গুরুদেব তো বলেছেন, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ হ্যা,  একলাই চলছি। ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে আমার ছোটবেলায় দেখা টিভি সিরিজগুলো আবার দেখছি। পছন্দের বইগুলো পড়ছি।

কী পেলাম আর কী পেলাম না সে হিসেব করা বাদ দিয়েছি। সবার জীবনে সাফল্য এক রকম চেহারা নিয়ে আসে না। আমার যেটুকু আছে তাই নিয়েই আমি সন্তুষ্ট হতে চাচ্ছি। আইসক্রিম, ফুচকা, চটপটি খাচ্ছি। সাজসজ্জা করছি বেশ মন দিয়ে। এই তিন সপ্তাহ ধরে আমি বিষন্নতা থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসছি।

ছয় মাস আগে একটি সুইসাইড নোট লিখেছিলাম। গতকাল সেটি ডিলিট করেছি। না আমি কিছুতেই সুইসাইড নোট লিখবো না। আত্মহত্যাও করবো না। কারণ আমি শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে শিখেছি। নিজেকেই বলেছি, আমি হার মানার মানুষ নই। আমি গহীন শ্বাপদ সংকুল অরণ্যেও পথ খুঁজে নেব। নিজের হৃদপিণ্ড জ্বালিয়ে হলেও পথ খুঁজবো, পথ দেখাবো অন্যদের।  এই তিন সপ্তহের মধ্যে বিষণœতা আর ফিরে আসেনি।

এই কথাগুলো শেয়ার করলাম এই কারণে যাতে অন্যরাও প্রেরণা পান।

আসুন, আমরা যারা আত্মহত্যার সরু সাঁকোটি দিয়ে হাঁটছি তারা পরস্পরকে হাত ধরে সাহায্য করি। কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপিত হোক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। যাতে আমরা পেতে পারি কিছুটা সহায়তা। এবং সবচেয়ে জরুরি যেটা, আসুন আমরা কথা বলি। ব্রেক দ্য সাইলেন্স। ভুলে যান ফালতু মান সম্মানের কথা। বলুন, বলুন। নিজের ভিতরের লাভাগুলো উজার করে দিন। আগ্নেয়গিরির জ্বালাটা কমুক। নিজের ভিতরে গুমরে মরে লাশকাটা ঘরে আর যাবো না আমরা। নিজেকে ভালোবাসুন।

আমরা জয়ী হবো। হাসবো। বাঁচবো। মানুষের মতো বাঁচবো। নিজেকে ভালোবেসে বেঁচে থাকবো।

লেখাটি ১৩,৩০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.