আসুন, বিষন্নতা নিয়ে কথা বলি’

0

নাসরীন রহমান:

আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘ ডিপ্রেসন-লেটস-টক’ যার সহজ বাংলা করলে হয় ‘আসুন বিষণ্ণতা নিয়ে কথা বলি’। জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় একটি সময়োপযোগী বিষয়কেই প্রতিপাদ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সারা বিশ্বে এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে নিঃসন্দেহে।

এবং বিশেষত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কয়েকটি আলোচিত আত্মহত্যাজনিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখিত প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে দিবসটি পালন বা এই বিষয়টি নিয়ে আলাপ , আলোচনা আরও বেশি তাৎপয বহন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের এ সংক্রান্ত প্রচার প্রচারণায় বলছেন, আপনি যদি মনে করেন আপনি বিষণ্ণতায় ভুগছেন তবে কথা বলুন এ নিয়ে কারো সাথে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে যদি আমরা বিবেচনা করি বিষয়টি তবে প্রথম যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হবে তা হচ্ছে, একজন বিষণ্ণ বাক্তি কথা বলবেন আসলে কার সাথে?

আপনি যাকে খুব বিশ্বাস করেন, যার কাছ থেকে সাহায্য পাবার আশা করেন তাকেই তো বলবেন, আপনার কষ্টের কথা , হতাশা, বঞ্চনাবোধের কথা; নাকি?

তবে সব ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি অপ্রাপ্তি, বঞ্চনা, কষ্টবোধ থেকেই বিষণ্ণতার জন্ম নেয় তা নয়; শারীরিক অসুখ-বিসুখ থেকেও বিষণ্ণতার জন্ম নেয়; এছাড়া রয়েছে ভীতিবোধ, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি ইত্যাদি; বা যেকোনও বয়সেই একজন ব্যাক্তি বিষণ্ণতায় ভুগতে পারেন; তবে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে বা বিভিন্ন জরিপের ফলাফলকে বিবেচনায় নিয়ে এখানে নারীদের বিষণ্ণতায় ভোগার ব্যাপারটিকেই আলোচনায় আনা হলো; যাই হোক সে ভিন্ন, বিস্তারিত আলোচনা।

আপাতত মূল প্রসঙ্গে আসি, এটা ঠিক যে, বাংলাদেশে নারীরা বেশি বিষণ্ণতায় ভোগেন; সাম্প্রতিক কয়েকটি আত্মহত্যাজনিত ঘটনা এই বিষয়ে সত্যতারই সাক্ষ্য দেয়; যদিও অধিকাংশ এই বিষণ্ণতাকে কোনও চিকিৎসায় সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে ভাবেন না, বা আদৌ সমস্যাই মনে করেন না!

কিন্তু বাস্তবে বিষণ্ণতা একটি মানসিক সমস্যা; যার ক্রমপরিনতিত অনেককেই দেখা যায় বিষণ্ণতায় ভুগতে ভুগতে একসময় আত্মহননের পথ বেছে নেন।

একজন নারী যখন বিষণ্ণতায় ভোগেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মা, বোন বা নিকটাত্মীয়ের কাছেই তাঁর কষ্টের কথাগুলো বলেন। কিন্তু দেখা যায় (বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোতে) মা, বোন বা নিকটাত্মীয়রা প্রথমে যে পরামর্শ দেন তা হচ্ছে, ‘সহ্য করে যাও’, ‘সন্তানের দিকে তাকিয়ে সহ্য করো’ ‘কী করবে ভাগ্যে এই ছিল’, ইত্যাদি ইত্যাদি! অর্থাৎ অবস্থা গুরুতর না হলে প্রতিকারের চিন্তা তো তাঁরা করেনই না, উপরন্তু ‘সহ্য করে যাও’ এই উপদেশ দিয়ে নারীকে ফেলে দেন আরও দুর্বিষহ জীবনে, একে তো সমাধান নাই তদুপরি এই নেতিবাচক অবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে নারী বেছে নেন আত্মহত্যার পথ বা হয়ে পড়েন মানসিক ভারসাম্যহীন!

খুব কম সংখ্যক নারীই পারেন প্রবল দৃঢ় মনোবলের পরিচয় দিয়ে একা একা অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে।

আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয়, বিষণ্ণতায় ভোগা নারীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় নারীরা হা-হুতাশা করেন, বা ভাগ্যকে দোষারোপ করেন কিন্তু শিক্ষিত নারী পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই নিজে উদ্যোগী হয়েও মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না! এটা শুধুমাত্র অসচেতনতা বোধের কারণে এমনটা করেন তা নয়, নিজের প্রতি উদাসীনতার থেকেও করেন; বাঙালী নারী স্বামী, সন্তানের প্রতি যতোটা কেয়ারিং নিজের প্রতি ততোটা না; অথচ নারীর বিষণ্ণতার পেছনে অধিকাংশ কারণই থাকে ‘পুরুষতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতা’।

যাই হোক এই বিষয়টি নিয়ে আমি আরও লিখেছি বিস্তারিত তাই এই আলোচনা দীর্ঘ করতে চাই না, পরিশেষে বলবো, বিষণ্ণতাকে জনস্বাস্থ্যের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন, বিশেষত বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোর (পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো) পরিপ্রেক্ষিতে নারীর মানসিক অসুস্থতা বা বিষণ্ণতার দিকটি আরও বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিৎ।

এবারকার বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বিশেষত নারীর মানসিক সুস্থতার প্রতি পরিবারের সকলে নজর দিই; একজন সুস্থ মা-ই পারেন , সুস্থ সন্তান তথা সুস্থ জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে, তাই মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, স্ত্রীদের প্রতি সহনশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ হবেন সকলে এটাই প্রত্যাশা রাখি!

শেয়ার করুন:
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares

লেখাটি ১,২৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.