শারমিনের বৃত্ত ভাঙার গান

0

সাবিনা শারমিন:

মা সন্তানকে ভালোবাসবে, তার মঙ্গল কামনা করবে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে স্বাভাবিক নিয়ম এবং সামাজিক অগ্রগতি, এ দু’য়ের মধ্যেকার সম্পর্ক যদি সাংঘর্ষিক এবং বিপরীতধর্মী হয়, তখন খুব দ্রুতই সেখানে দানা বাঁধে ক্ষোভ। এই ক্ষোভকে বলপ্রয়োগ, রক্ষণশীলতা বা সামাজিক অনুশাসন দিয়ে সাময়িকভাবে চেপে রাখা গেলেও স্থায়ীভাবে নির্মূল করা যায় না। একসময় তা বিদ্রোহে পরিণত হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে উঠে ঘুরে দাঁড়াবার সৎসাহস আমাদের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়।

জেগে ওঠা এই তরুণ-তরুণীদের সাথে যখন শিশু-কিশোররাও সামিল হয়, কখনো বা নেতৃত্ব দেয়, তখন আমাদের আনন্দ যেন গর্বে পরিণত হয়। সবাই যখন পুরুষতন্ত্রের বেদীমূলে অর্ঘ্য দিয়ে ধন্য হয়, তখন মর্যাদার লড়াইয়ে কোন গাঁয়ের এক কিশোরী জেগে উঠবে, তা সত্যিই অভূতপূর্ব।

নিজ দেশের নির্যাতিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত, পোড় খাওয়া নারীদের জেগে ওঠা দেখে নিজের অজান্তেই অস্ফুট শব্দে বের হয়ে আসে ‘ আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’। কিশোরী শারমিন নিজে নিজে জেগে উঠলেও মাকে সে জাগাতে পারেনি। কারণ সেই মায়ের ভেতর দানা বেঁধে আছে হাজার বছরের পুরুষতন্ত্রের কঠিন মন্ত্র । সেই পুরুষতন্ত্র মা-মেয়ের সম্পর্ককে বাদী বিবাদীর সম্পর্কে পরিণত করেছে। মাকে দাঁড় করিয়েছে সন্তানের বিপরীতে। নেপথ্যের খলনায়ক পিতৃতন্ত্র এই বিবাদের শেকড় হয়ে আছে হাজার বছর ধরে।

সেদিন সন্ধ্যায় কানাডার টরন্টোতে একটি রেঁস্তোরায় হঠাৎ চোখ পড়লো টেলিভিশনের স্ক্রিনে। কিশোরী বয়সের শাড়ী পরা বাঙালী চেহারার একটি মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের হাত থেকে অসাধারণ সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসাবে ‘উইমেন অব কারেজ’ পুরস্কার নিচ্ছেন, যার নাম শারমিন,নবম শ্রেণীর ছাত্রী। প্রথম বুঝে উঠতে পারিনি। এরপর নিউজটি ভালো করে শুনে বুঝলাম এতো আমাদের দেশের খবর!

শারমিন নামের এই কিশোরীর নাম পত্রিকায় কয়েকদিন আগেই পড়েছিলাম। ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহে বাধ্য করায়, প্রতিবাদী হয়ে ঠেকিয়েছে তাঁর নিজের বিয়ে। মেয়েটিকে তার মা মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে একটি বয়স্ক লোকের সাথে বিয়ের জন্য আটকে রেখেছিলো। শারমিন নামের নবম শ্রেণীতে পড়া মেয়েটির কাছে এই বার্তা পৌঁছে গেছে যে, জোর করে বাল্যবিবাহ আইনত দণ্ডনীয়। ফলে বাল্যবিবাহ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সে নিজেই তার পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

এখানে শারমিনের মায়ের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক দিকটি নিয়ে একটু ভাবার প্রয়োজন আছে। আমাদের মতো অনুন্নত দেশের শিক্ষাবঞ্চিত,পরনির্ভরশীল এই মায়েরা কি আসলেই কি তাদের সম্পূর্ণ মাতৃত্ব বিকশিত করতে পারে? তাঁরা কি তাঁদের সন্তানদের নিজের মতো করে ভালবাসতে পারে? নিশ্চিত করতে পারে তাদের শিক্ষা ও অধিকার? গ্রামবাংলার পরনির্ভরশীল মায়েরা সন্তান জন্ম দিলেও কখনো দ্বিধা ও সংস্কারমুক্তভাবে প্রকৃত মা হয়ে উঠতে পারে না। নির্দ্বিধায় তাদের সন্তানদের জীবনের সিদ্ধান্ত কখনোই নিতে পারে না। তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় এই মায়েরা পুরুষতন্ত্রের ইচ্ছায় নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করে।

পুরুষতন্ত্রের আদেশ পালন করতে গিয়ে গর্ভধারিণী হয়েও সন্তানের ইচ্ছের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় অবধারিতভাবে। তাই কোনভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলেই সেই মা যেন নিরাপদ বোধ করেন। হয়তো ধর্ষিতা হবার ভয়ে মেয়েকে লেখাপড়া করাতে চাননি। কারণ তাঁদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে মেয়েদের লেখাপড়াকে হয়তো ভালো চোখে দেখা হতো না। হয়তো সেই মায়ের চারপাশের রাতভর মাইকে নারীর প্রগতি নিয়ে গাওয়া হয়েছে অশ্লীল গান। নিজেদের জীবনে তারা যা পরিপালন করে এসেছে, সেটিকেই মনে করেছে স্রষ্টার বিধান।

এই ভুল ধারণার জালে এখনো অবরুদ্ধ হয়ে আছে অনেক দেশ। বিশ্বব্যাপী এর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এখনো অনেক মায়েরা, দাদীরা বিশেষ করে আফ্রিকার অনেক দেশে বলপ্রয়োগ করে কন্যা শিশুর বিশেষ প্রত্যঙ্গ কর্তন করে নেয়। এ কারণে এখনো অনেক শিশু মারা যায়, কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারায়। এ ভাবেই শারমিনের মায়েরা পরিণত হয় পুরুষতন্ত্রের ক্রীড়াণকে। জেল জরিমানা করে এতে কোন ফল হবে না, যদি প্রচলিত আইন এবং সমাজ ব্যবস্থায় নারী তার অবস্থান সমুন্নত করতে না পারে।

একজন মা সব সময়ই সন্তানের মঙ্গল কামনা করে। একজন বাবা জন্ম দিয়ে পালিয়ে গেলেও, একজন মা তা সহজে পারে না। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের মায়েরা তা পারেননি। মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের ভীত খুব গভীরে প্রোথিত। তাই শারমিনের মায়ের মাতৃত্বকে যারা কটাক্ষ করছেন, দুঃখবোধ করছেন,তাদের কে বলবো নিজেদের কন্যা শিশুদের, নিজেদের বোনদের, নিজের স্ত্রীর অধিকার আর দাবির বিষয়ে সজাগ হোন, শ্রদ্ধাশীল হোন। তাহলেই সমাজ থেকে এ ধরনের মায়ের সংখ্যা কমে আসবে, মা-মেয়ে কে দাঁড়াতে হবে না দাবি আদায়ের মুখোমুখি সংঘর্ষে।

একজন নারীকে শুধু গর্ভধারিণী হিসেবে ব্যবহার না করে তাঁকে পরিপূর্ণ মা হতে বিকশিত হতে দিন, তবেই সূচনা হবে পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়। শারমিন সাহসিকতার পুরস্কার পেয়ে পৃথিবীব্যাপী প্রশংসিত হলেও তার নিজের পরিবেশের মানুষ তাকে বলছে ‘ বেয়াদব মেয়ে , ‘বড় হলে তসলিমা নাসরীন হবে’, ‘ মাকে দোষী করে পুরস্কার ! কী বেয়াদব মেয়ে !’ কেউ বলছে বেশ্যা ‘। আবার কেউ বলছে ‘ সকল মেয়ে সচেতন হয়ে এমন করে প্রতিবাদ করলে বাল্য বিবাহ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে” ।

যে সমাজে এখনো নারী মুক্তি, নারীর সম্মানের বিষয়ে এতটা দ্বিধাবিভক্ত, সে সমাজে আরও বেশি শারমিনদের প্রয়োজন। শারমিন সতের বছর বয়সে বিয়ে করতে চায়নি, সে আইনজীবী হতে চায়। সে কারণে সে শুধু নিজেই তার পরিবার থেকে জেগে ওঠেনি, জাগিয়েছে তার নিজের মাকে, বাংলাদেশের সকল নারী ও কন্যাশিশুকে।

জাতির রোল মডেল হিসেবে কুঠারাঘাত করেছে নারীর প্রতি বৈষম্যে আর অন্যায়ের। তার এ সাহসিকতা আমাদের অনগ্রসর সমাজের আচার, প্রথা আর চিন্তা কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। শুধু নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেই প্রতিবাদমুখরই হননি শারমিন, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অন্যের অধিকার আদায়ের জন্যে।

শারমিন তার পরিবারের বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ প্রত্যয় দেখালেন তা আমাদের মতো ঘুণে ধরা সমাজের জন্য একটি সজোরে ঝাঁকুনি,সে ঝাকুনি বাবা-মায়ের গায়ে লাগুক, দেশের গায়ে লাগুক, ভাইয়ের গায়ে লাগুক, ধর্মান্ধ পোশাকের গায়ে লাগুক, নিপীড়ক স্বামীর গায়ে লাগুক, নারী বিদ্বেষী সকল ধর্মান্ধতার গায়ে লাগুক। শারমিন এর এই প্রতিবাদ আগুন হয়ে জ্বালিয়ে দিক, উন্মুক্ত করুক আমাদের আত্মপ্রত্যয়ের আর অনগ্রসরতার রুদ্ধদ্বার।

সাবিনা শারমিন

[email protected]

লেখাটি ১,১৩২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.