নারীবাদ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং কিছু ভাবনা

0

লীনা পারভীন:

নারীবাদ কী

নারীবাদ কাকে বলে বা নারীবাদ আসলে কি, এ নিয়ে আমাদের সমাজে এখনো রয়েছে নানারকম বিভ্রান্তি। আমরা যারা নারীমুক্তি আন্দোলনের কথা বলি তাদের মধ্যেও রয়েছে এ নিয়ে বোধের ঘাটতি।

খুব বেশী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় না গিয়েও আমরা নারীবাদকে যদি খুব সহজ ভাষায় প্রকাশ করি তবে সেটা হচ্ছে মানুষ হিসাবে নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার মতবাদই হচ্ছে নারীবাদ। আরেকটু ব্যাখ্যা করলে,”নারীবাদ হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দর্শন বা মতবাদ যা নারী্র লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য থেকে মুক্ত হবার পথ দেখায়। এবং যে মতবাদ নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে প্রতিষ্ঠার কথা বলে”

অনেকে বলে থাকেন নারীবাদীরা কেন পুরুষদেরকেই কেবল আক্রমণ করে? তার মানে কি তারা পুরুষবিদ্বেষী?

ধারণাটা একদমই ভুল। কারণ নারীবাদ কখনই কোন বিশেষ গোষ্ঠীকে টার্গেট করে আন্দোলন চালাতে বলে না। নারীবাদ কথা বলে পুরুষতান্ত্রিক যে সমাজকাঠামো গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে, তাকে ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে। সেখানে যারাই এই কাঠামোর ধারক বাহক তারাই নারীবাদের প্রতপক্ষ। সে নারীও হতে পারে বা পুরুষ। বস্তুতঃ আমাদের সমাজ যেহেতু পুরুষশাসিত সমাজ যেখানে পুরুষদের হাতেই থাকে বেশীরভাগ ক্ষমতা তাই এর প্রকাশটা হয়ে যায় পুরুষদেরকে কেন্দ্র করে।

তাই নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্বেষী কখনই নয়। এটি একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে লড়াই যেখানে পুরুষ এবং নারী উভয়েই অংশীদার। নারীর মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে পুরুষ নারী সবাইকে সমানভাবে।

একটি রাষ্ট্র এবং সামাজিক জীবনব্যবস্থার প্রতিটা জায়গায় পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নিশ্চয়তা প্রদান করাই হচ্ছে নারীবাদের মূল কথা।

বাংলাদেশে নারীবাদ

একতু ইতিহাসের দিকে মুখ ফিরালে দেখা যায় ইউরোপ বা আমেরিকায় নারীবাদী আন্দোলনের ধারা অনেক আগে শুরু হলেও আমাদের এই উপমহাদেশে এর শুরু আরো অনেক পরে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কিছু সমাজ সংস্কারকগণ নারীর বিভিন্নপ্রকার নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধের লড়াই করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরদচন্দ্র বিদ্যাসাগর অন্যতম। পরবর্তীসময়ে বেগম রোকেয়াকে ধরা হয় নারী জাগরন বা নারী মুক্তি আন্দোলনের একজন প্রাতিষ্ঠানিক প্রবক্তা। তিনি প্রথম নারীর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি বিভিন্নভাবে সামনে নিয়ে আসেন।

একাডেমিশিয়ানদের মতে বাংলাদেশে নারীবাদের এ্যাকাডেমিক আলোচনা শুরু হয় বা সাংগঠনিক আকারে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং তার প্রতিকারের বিষয়গুলো হয় মুলত ১৯৭০ এর আগে বা পরে থেকে। তখনই প্রথম বিচ্ছিন্নভাবে নারী ইস্যুতে কাজ করা নারীগণ নিজেদের মধ্যে মতৈক্যের ভিত্তিতে গড়ে তুলেন মহিলা পরিষদের মত কিছু সংগঠন। তারপর থেকে এই আন্দোলনে চলেছে বিভিন্নধারায়, বিভিন্ন ভাবে।

এর মধ্যে নারী সংগঠনগুলোর ভুমিকা অনস্বীকার্য। রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও। পাশাপাশি কাজ করেছে বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান যদিও সেগুলো হয়তো চলেছে নির্দিষ্ট এজেন্ডাভিত্তিক। তারপরো নারীর সচেতনতা বাড়াতে বা সচেতনতামূলক একটি পরিবেশ তৈরিতে এদের একটা ভূমিকা ছিলো বা আছে। সক্রিয় নারী সংগঠনগুলো কাজ করেছিলো সরকারের জন্য একটি রি-এনফোর্সমেন্ট হিসাবে।

বাংলাদেশে নারীবাদের ইতিহাস অনেকদিনের না হলেও খুব একটা কমও বলা যায় না, তবুও প্রশ্ন আসে  আজকের দিনে এসেও কেন নারীবাদ কী এবং কেন দরকার এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলে অনেক কিছুর একটা সমাধান হয়তো আমরা পেয়ে যাবো।

বিষয় হচ্ছে সবাই নারী মুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন তাহলে প্রশ্ন আসে সেসব আন্দোলন কতটা ফলপ্রসু ছিলো? সমাজে নারীবাদী ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করতে সেসব আন্দোলন কতটা ভুমিকা রেখেছে নাকি সেগুলো আদৌ কোন নারীবাদী আন্দোলন ছিলোই না?

এরকম অনেক প্রশ্ন নিয়েই ১ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে রাজধানীর অনন্যা কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিলো বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যারা নারীবাদ বা নারী অধিকার বিষয়ে সচেতন বা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই।

এ্কাডেমিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার এন্ড উইমেন স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানিয়া হক। একাডেমিক বিষয়ের পাশাপাশি উঠে আসে অনেকগুলো বাস্তব প্রশ্ন এবং প্রস্তাবনা।

উপস্থিত একজন এসেছিলেন গাইবান্ধা থেকে যিনি একটি বেসরকারী সংস্থার হয়ে সেই এলাকায় কাজ করছেন। তিনি তার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করছিলেন গ্রামাঞ্চলে কেমন করে নারীদেরকে আবার গৃহকোণে ঢুকাবার রাজনীতি চলছে। বর্তমান দেশীয় বাস্তবতায় যেখানে জঙ্গীবাদ এবং মৌলবাদী সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেসব এলাকায় নারীবাদ কেমন করে প্রতিষ্ঠা করা যায় এ নিয়ে ছিলো একটি চমৎকার আলোচনা।

আমার এই লেখাটি সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব। আমি যা বুঝেছি বা যেমন করে বুঝতে চাই বিষয়টি সেভাবেই এখানে উপস্থাপিত।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নারীমুক্তির আন্দোলন

কষ্টদায়ক হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমানে নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গীবাদী রাজনীতিতে। কথা হচ্ছে এটা কেমন করে সম্ভব হচ্ছে? যেখানে আমরা গর্ব করে বলছি বাংলাদেশ নারীর অধিকার বাস্তবায়নে, নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বের বুকে রোলমডেল হিসাবে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক সে সময়ে নারীদের জঙ্গী হয়ে উঠা আমাদেরকে কিসের ইংগিত দিচ্ছে?

প্রচলিত অর্থে নারীদেরকে ধরা হয় তারা হয় কোমলমতি, সহনশীল এবং কষ্টসহায়ক। নারীর রুপ হচ্ছে মায়ের রুপ যে সন্তানের কোনপ্রকার কষ্টই সহ্য করতে পারে না। তাহলে কেমন করে সেই কোমলমতি নারীরা এই ধবংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে? কেমন করে একজন মা তার সন্তানসহ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে? কেন সেইসব নারীরা তাদের নিজেদেরকে অন্যের ইচ্ছার কাছে সঁপে দিচ্ছে?

ভাবতে হবে নতুন করে। নারী আন্দোলনকে আর গতানুগতিকভাবে বিবেচনা করলে আগানো যাবে না। ভাবতে হবে বৈশ্বিক রাজনীতি এবং দেশীয় বাস্তবতার নিরিখে।

যে হারে নারীরা বাইরে বেরিয়ে এসেছে সেই হারে তাদের ধরে রাখার জন্য তৈরি করা হয়নি গ্রাউন্ড। তাই নারীরা বেরিয়ে এসেও প্রতিনিয়ত ধাক্কা খাচ্ছে। কেউ সামলে নিচ্ছে আবার কেউ পারছে না। এই ধাক্কায় তাকে সাহায্য করার জন্য নেই কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সরকারকে বাধ্য করার মত নেই কোন শক্তি। নারীস্বার্থ বিরোধী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে সরকারকে বিরত রাখার মত শক্তি অর্জন করতে হবে।

দেশের নারী সংগঠনগুলোও এখন প্রায় নিষ্ক্রিয়। রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যেও আছে সীমাবদ্ধতা। এহেন পরিস্থিতিতে কেবল নারীকে আলাদা করে বিবেচনা করে কাজ করার সুযোগ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। তবে এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে আমাদের দেশে নারীরা অনেক এগিয়েছে। তারা এখন অনেক বেশী সচেতন। নিজেদের অধিকারের কথা, কষ্টের কথা, চাওয়া পাওয়ার কথা তারা বলছে প্রাণ খুলে। এমনকি এসব সমস্যার সমাধানেও তারা রাখছে ভূমিকা। এই ধারাকে ধরে রাখতে হবে।

তাহলে করণীয় কী

সবশেষে আমাদের সবাইকেই একটা জায়গায় একমত হতে হবে যে, নারীমুক্তির বিষয়টা জড়িয়ে আছে সমাজের সকল প্রকার শৃঙ্খলমুক্তির মাঝে। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বৈষম্যে থেকেই যাবে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় তাই সবাই পণ্য। সেখানেও নারীও একধরনের পণ্য। এই বৈষম্যমূলক কাঠামো বজায় রেখে কেবল নারীমুক্তি কেন কোনপ্রকার মুক্তি সম্ভব নয়। আবার গোটা সমাজ না পাল্টালে নারীর অধিকার আসবে না বলে হাত পা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলেও চলবে না। একদিকে কাজ করতে হবে সমাজের মধ্যে বিদ্যমান অনাচারের বিরুদ্ধে, আরেকদিকে সোচ্চার থাকতে হবে নারীর প্রতি দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান সকল্প্রকার বৈষম্যকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে। এই যুদ্ধে সামিল করতে হবে সবাইকে। নারী কেবল একা নয়। এই বৈষম্যের শিকার কিন্তু কোন একজন দুর্বল পুরুষও হতে পারেন। তার বিরুদ্ধে লড়াই করাও নারীবাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

একদিকে যেমন নারীকে শৃঙ্খলিতে রেখে সমাজ এগোবে না, আবার অন্যদিকে দেশকে শৃঙ্খলার মাঝে রেখেও নারীকে আলাদাভাবে মুক্ত রাখা যাবে না। তাই আজকের বাস্তবতায় আমাদের সবাইকে নিজ নিজ বিভেদ ভুলে গিয়ে, নিজের স্বার্থকে ত্যাগ করে সামগ্রিক মুক্তির চেতনায় এগিয়ে আসতে হবে, রাখতে হবে সচেতন এবং সক্রিয় ভূমিকা।

নারীদের নিজেদের মাঝে ঐক্য গড়ে তোলার কোন বিকল্প নাই। নারীর অধিকার কেন্দ্রিক সাংগঠনিক কর্মকান্ডকে আরো জোরদার করতে হবে। যে যেই ক্ষত্রেই কাজ করছে সেখানেই ভুমিকা রাখার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। নারীকে গৃহে বন্দি করার যে কোন চক্রান্তকে রুখে দিতে হবে সাহসের সাথে, ঐক্যমতের সাথে।

নারীশক্তির জয় হোক। পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ছিঁড়ে ফেলে এগিয়ে যাক আজকের সাহসী নারী।

শেয়ার করুন:
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,০০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.