“নারীরা পারে, নারীরাই পারে”

0

তানিয়া কামরুন নাহার:

“আরে আপু, গতবারের ম্যারাথনে আপনি আমার পাশে দৌড়েছিলেন!’’

ভালো করে তাকিয়ে দেখি, তাইতো, এই মেয়েটিই ২০১৬ এর ম্যারাথনে আমার পাশে দৌড়েছিল। তখন মেয়েটির সাথে পরিচয় হয়নি, এবার পরিচয়, বন্ধুত্ব, সেলফি তোলাতুলি সব হলো। এভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ১০ কি.মি ম্যারাথনের জন্য। ঢাকার রাস্তায় নারীদের প্রথম ম্যারাথনে অংশ নিয়ে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। গতবারের অর্জন করা সাহস আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে ২য় ম্যারাথনেও অংশ নেবার জন্য হাতিরঝিলে হাজির হয়ে গেলাম সাত সকালেই।

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘নারীর জন্য নিরাপদ নগরী’’ এই স্লোগান সামনে রেখে গত ১০ মার্চ ২০১৭ তে ২য় বারের মত ঢাকার রাস্তায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো নারীদের ১০ কি.মি ম্যারাথন দৌড়। হাতিরঝিল থেকে এ ম্যারাথন শুরু হয়ে গুলশান, বাড্ডা ঘুরে আবার হাতিরঝিল এসে শেষ হলো পুরো ১০ কিমি।

পরপর দুবার এমন ম্যারাথনে অংশ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হলো দু রকমের। প্রথমবারের ম্যারাথনে চলতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো ১০ কিমি দৌড়ে বা হেঁটে সম্পন্ন করা চাট্টিখানি কথা নয়। এজন্য শারীরিক ফিটনেসের পাশাপাশি প্রচণ্ড মানসিক ফিটনেসের প্রয়োজন। এতো শুধু দৌড় নয়, নিজেকে চেনার একটা প্রচেষ্টা। দীর্ঘপথ একটানা চলতে পারার জন্য চাই ধৈর্য, সাহস, আত্নবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তা। মনের জোর থাকলেই পুরো ১০ কিমি সম্পন্ন করা সম্ভব। চলতে গিয়ে কখনো ক্লান্ত হয়ে যাবো, হাঁপিয়ে যাবো, তবু চলা থামানো যাবে না। খুব অল্প গতিতে হলেও চলতে হবে। এটা শুধু এই ১০ কিমি ম্যারাথনের জন্যই নয়, পুরো জীবনের জন্যই সত্য। জীবনটাও তো একটা বড় ম্যারাথন দৌড়েরই মতো। আর এই ম্যারাথনের জন্য নারীর নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

দ্বিতীয় বার ম্যারাথনে অংশ নিয়ে, অভিজ্ঞতা আরেকটু বাড়লো। একজন নারী নগরের পথে চলতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা রকম বাধার সম্মুখিন হন।  অথচ কাজের প্রয়োজনে নারীকে চলতে হয়। সুস্বাস্থ্যের জন্যেও নারীর নিয়মিত হাঁটা চলা ও খেলাধুলা করা উচিত। ঈভ টিজিং, সহিংসতা ইত্যাদি নারীর চলার পথকে করে তোলে অনিরাপদ। নারীর চলার পথ হয়ে উঠে সংকীর্ণ। নারী হয়ে পড়ে দ্বিধান্বিত, সংকুচিত ও বন্দী। কিন্তু একত্রে যখন এতোজন নারী একই রকম টিশার্ট পরে ব্যস্ত রাস্তায় দৌড় শুরু করলাম, তখন নিজেকে মোটেও অনিরাপদ মনে হচ্ছিল না। আমরা একজন নারী আরেক জনকে সাহস ও উৎসাহ দিচ্ছিলাম সামনে এগিয়ে যাবার।

পুরুষতন্ত্রের শেখানো সেই পুরোনো মিথ্যা বুলি “মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু’’, তার আর বিন্দুমাত্র উপযোগিতা রইলো না এই ম্যারাথনে। আমরা জানলাম,  সামনে যে-ই এগিয়ে যাক না কেন, জয় শেষ পর্যন্ত আমারই থাকলো, জয়ী হবে নারীই। তাই নারীর চলার পথ মসৃণ করতে নারী্কেই হয়ে উঠতে হবে সাহস ও অনুপ্রেরণার উৎস।

চলতি পথে গাড়ির কালো ধোঁয়া ও শব্দ দূষণের সম্মুখিন হলাম। নগরীর প্রতিদিনের দুঃসহ যন্ত্রণা। যেকোন ধরনের দূষণে সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশুরা স্বাস্থ্য হুমকিতে পড়ে। সুতরাং শুধু ঈভ টিজিং, সহিংসতা, জংগিবাদই নয়, নারীকে নিরাপদ রাখতে হবে নগরের দূষণ থেকেও। এটা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবেই এ দিকটা ভেবে দেখতে হবে।

৯০ মিনিটের মধ্যে এ দৌড় সম্পন্ন করে অনেকেই খুশিতে ও বিস্ময়ে বলছিল, ‘“মেয়েরাও পারে।‘’ এমন কথা শুনে অবশ্য একটু মন খারাপই হলো। একজন নারী ৯০ মিনিটে ১০ কিমি দৌড় সম্পন্ন করতে পারে, এ কথাটি একজন নারী এতোদিন জানতো না, তাকে জানতে দেওয়া হয়নি। তাই কাজটি নারীদের কাছে এতোদিন অসম্ভব মনে হতো। তবে আশার কথা এই যে, এখন নারীরা নিজেকে একটু একটু করে চিনতে পারছে। যেকোনো সাফল্যে নিজেকে পুরুষের সাথে তুলনা করে ছেলেমানুষি উল্লাসে আর মেতে উঠবে না। সব কুসংস্কার ছিন্ন করে “নারীরা পারে, নারীরাই পারে’’ এ সত্য সবার কাছে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.