অহৈতুকি ভালোবাসা

0

রুমানা মাহজাবীন:

আমার সন্তান আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো নয় সে একটু আলাদা। ভিন্ন তার আচরণ, ভিন্ন তার ব্যবহার, ভিন্ন তার পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলার ক্ষমতা। এই ক’টা সত্য বাক্যই ভীষণ ভারী আর কঠিন হয়ে যায় সেই সন্তানের বাবা- মায়ের মেনে নেবার জন্য। আমার সন্তানকে নিয়ে এতোদিনের লালিত স্বপ্ন আর সাধ যখন এক লহমায় ভেঙ্গে খান খান হয়ে পড়ে, তখন কোনো সান্ত্বনা বাক্যই প্রবোধ দেবার জন্য যথেষ্ট নয়।
আমি নিজেই যদি এখন আমার সেই জীবনের কথা ভাবতে বসি সিনেমার মতো সব একের পর এক দৃশ্য ভেসে ওঠে। কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম কিছু লেখার কথা। আজকের দিনটাই বেছে নিলাম লেখার জন্য। আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস।
অটিজম কী? অটিস্টিক শিশু কারা? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো আমাদের মোটামুটি জানা। তবু ছোট্ট করে বলি। অটিজম কোনো রোগ নয়,যে এক সময় চিকিৎসা বা দোয়া দরুদে এটি ভালো হয়ে যাবে। এটি একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা, ইংরেজিতে বলে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। মনোবিকাশগত জটিলতা। এদের প্রতিবন্ধী বলা যাবে না। কারণ এদের বিশেষ কোন অঙ্গ বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধকতায় থাকেনা। মৌখিক বা অন্য যে কোন সামাজিক যোগাযোগে এরা পিছিয়ে থাকে। সামাজিক বিকাশগত সমস্যা ,সীমাবদ্ধ ও গন্ডিবদ্ধ জীবন যাপন ও চিন্তা। নিজেদের একটা জগতে থাকতে পছন্দ করে। সংবেদনশীলতার মাত্রা বেশি থাকে। একই কাজ বা আচরণ বারবার করে। হাইপার এক্টিভিটি ,জেদী বা আক্রমণাত্মক আচরণ থাকতে পারে।
বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে কেউ কেউ অনেক এগিয়েও থাকে এবং বিশেষ কোন কাজে এঁরা পারদর্শী হতে পারে। এদের দরকার বিশেষ প্রশিক্ষণ ও একেক শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী অকুপেশনাল থেরাপি । বাবা মায়ের প্রয়োজন এদের একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী মেনেজমেন্ট এর নানা রকম বিশেষ শিক্ষার। অটিজম এর সঠিক কারণ এখনো অজানা। তবু বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষণায় যে সম্ভাব্য কারণ গুলো কে দায়ী করেন সেগুলো হলো মনেবিকাশের প্রতিবন্ধকতার কারণ হিসাবে মস্তিস্কের অস্বাভাবিক জৈব রাসায়নিক কার্যকলাপ, মস্তিস্কের অস্বাভাবিক গঠন, বংশগতির অস্বাভাবিকতা, এমন কি বিভিন্ন টিকা প্রয়োগ থেকে অটিজম হতে পারে।
কেতাবি কথা বাদ দিয়ে এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলি। বেশ কিছুদিন আগে একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম, অহৈতুকি ভালোবাসা অর্থাৎ আনকন্ডিশনাল লাভ। আমাদের ভালোবাসা গুলো নানারকম শর্তে বাঁধা থাকে সে যার সাথেই হোক না কেন। সন্তানের প্রতি, বাবা – মায়ের প্রতি, বন্ধুর প্রতি, স্ত্রীর প্রতি, স্বামীর প্রতি। সেই শর্তে টান পড়লেই ভালোবাসা তার আসল চেহারা দেখায়।
যে যেমন তাকে ঠিক তেমন ভাবেই ভালোবাসতে কি আমরা পারি? কথাটা শুনতে সহজ হলেও গভীর ভাবে যখন ভাবি ব্যপারটি আসলে তত সহজ নয়। যাকে ভালোবাসি তাকে আমার মনের মতই হতে হবে , আমার পছন্দের কাজ গুলো করলেই তাঁকে ভালোবাসা যায়। অথবা উল্টো করেও যদি ভাবি যাকে ভালোবাসি তাঁর সব কাজই আমার পছন্দনীয় হবে। নইলে কেমন করে ভালোবাসা যায়? অথবা প্রত্যাশাশূন্য ভালোবাসা? যাকে ভালোবাসি প্রত্যাশা তো তাঁর কাছেই সবচাইতে বেশি থাকে। আমি যার জন্য ভাবি বা করি সেও আমারই মতো করে আমাকে ভাববে বা করবে এই প্রত্যাশা তো খুবই স্বাভাবিক।
ঠিক এই জায়গাতেই আমার সন্তান আমাকে শেখায় ভালোবাসা কাকে বলে। অহৈতুকি ভালোবাসতে শিখেছি আমি ওর কাছেই।জীবনের নানা দুঃখ কষ্ট থেকে কীভাবে আনন্দ আর সুখ খুঁজে পাওয়া যায় তাও আমি আমার সন্তানের সাথে চলতে গিয়ে শিখেছি।প্রতিকূল পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়ে নিজেকে ভালো রাখা এবং সেখান থেকে পজিটিভিটি বের করে আনতে আমার সন্তানই আমাকে শিখিয়েছে। তাঁর ছোট্ট ছোট্ট প্রতিটি অর্জন আমার ভীষণ আনন্দের সময়।
অস্বাভাবিকতাকে কতটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব তা আমাকে আমার সন্তানই বুঝিয়েছে। ভিন্নতা বা অস্বাভাবিকতা ও যে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ সেটাও আমার সন্তান এর কাছেই শেখা। আমার ভালো থাকার, আনন্দে থাকার, আমার শক্তি অর্জনের পথগুলো আমার সন্তানই আমাকে দেখিয়েছে।এত্ত ভালো ভালো অর্জন আমি যার কারণে করতে পারলাম তাঁর প্রতি আমি ভালোবাসা তো স্বাভাবিক ভাবেই ধাবিত হবে সেটাই অহৈতুকি ভালোবাসা, প্রত্যাশাহীন ভালোবাসা।
যারা ভাবেন এই সন্তানেরা তাঁর পাপের কারণ অথবা তাঁকে শিক্ষা দিতে বা ভালো পথে আনতে ঈশ্বর তাকে এই বোঝা চাপিয়েছে বা স্বামী বা স্ত্রীর কোন ত্রুটির কারণে বা তাঁর প্রতি মনোযোগের অভাবে তাঁর এমন সন্তানের জন্ম হয়েছে। তাঁদের বলতে চাই , এগুলো শুধুমাত্র সত্য থেকে পালাবার অজুহাত।
এই মুহূর্তে পৃথিবীতে যে ভালোবাসাহীন সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে ,নিজেদের জাহির করবার যে প্রতিযোগিতা চলছে ,নেশাগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, অসহনশীল মানুষের ভীড় বাড়ছে, দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে এমনকি একই ধর্মে নানা মতানুসারীরা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক সেই সময়ে আমাদের সন্তানেরা শেখাচ্ছে শুধুমাত্র ‘ভালোবাসা’ । প্রত্যাশাহীন ভালোবাসা , শর্তহীন ভালোবাসা, অহৈতুকী ভালোবাসা। এই সময়ে এই ভালোবাসার ভীষণ প্রয়োজন।এমন অস্থির একটা পৃথিবী আমার সন্তান কে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে আমার বা আপানার অবর্তমানে??? মানুষের হৃদয় তাঁর ভাবনার থেকেও অনেক অনেক বড়। তার ধারণ ক্ষমতা অসীম।আমি আমার সন্তানের প্রতি মনোযোগ দিতে পারব তখনই যখন আমার চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি থাকবে সুশৃঙ্খল আর শান্ত। আর সেই পরিবেশ তৈরির দ্বায়িত্ব আমাদের সকলেরই।নিজের যত্ন নিন, নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের কাজের একটি ক্ষেত্র তৈরি করুন সেখান থেকেই আপনি আপনার শক্তি অর্জন করবেন, আপনার শিশুর পাশে তাঁর সাহায্যের জন্য শক্ত ভাবে দাঁড়াতে পারবেন।আমাদের বারবার হতাশা আসে, কষ্ট হয় ভীষন, হৃদয় রক্তাক্ত হয়।আমরা ভীষণ ভাবে কাঁদি কিন্তু কান্নার পরেই সকল হতাশা ঝেড়ে দ্বিগুন শক্তি নিয়ে আবার আমাদের কাজে লেগে পড়ি।
সম্প্রতি একটি আর্টিকেলে (সিনিয়র রিসার্চ সায়েন্টিসটস )একটি ভয়াবহ খবর পড়েছি , ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক শিশুই নাকি অটিজম এ আক্রান্ত হবে।আমার এক ডাক্তার বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারলাম তৃতীয় বিশ্বে শিশুদের জন্য যে টিকাগুলো পাঠায় সেগুলো সবই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। পাশের দেশ ভারতের সাথে আমাদের দেশের ভ্যক্সিনেশন শিডিউল ও নাকি আলাদা ! এসব দেখার বা বলার জায়গা কোথাও নেই।এবার সময় হল আমাদের, যারা এই অটিজম এর সাথে বসবাস করছি বিশ্বের খবরাখবর রাখার সাথে সাথে এই খবরগুলোও আমাদের রাখা প্রয়োজন। নতুন বাবা মায়েদের সচেতন করা, তাঁদের সাহায্য করা প্রয়োজন। আমরা সঙ্ঘবদ্ধ হলেই সাধারণ মানুষদের বোঝাতে সক্ষম হব।আমাদের সন্তানদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে পরিবারে ,সমাজে ।
বিবর্তনের পথ বেয়েই পৃথিবী চলে এসেছে। আমরা সেই বিবর্তনের পথেই চলেছি কী না কে বলতে পারে!!!
শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.