রাওদার ‘আত্মহত্যা'(!) এবং অন্যরা

জিনাত হাসিবা স্বর্ণা:

মালদ্বীপ থেকে আসা রাওদা আতিফ (মতান্তরে আদিব) নামের মেয়েটা রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেলে কলেজে পড়তো। খবর হয়ে আমার ফেসবুকের নিউজফিডে তার আগমন। তার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে ছাত্রী নিবাসের যে রুমে সে থাকতো সেখানেই। সে যে একজন আন্তর্জাতিক মডেল একথা জানতো না তার সহপাঠীরা, কিংবা তার বিশ্ববিদ্যালয়। মৃত্যুর একদিন পর এখবর জানাজানি। রাওদার মা-বাবা বাংলাদেশে এসেছেন মেয়েকে নিতে, গেছেন রাজশাহীতে।

মেয়েটাকে জানতে ইচ্ছে হলো। মালদ্বীপের মতো সুন্দর একটা দেশ থেকে এদেশে রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজে ঢোকার ভাবনা একজন আন্তর্জাতিক মডেলের কী করে এলো জানতে ইচ্ছে হলো। র‍্যাম্পে ঝড় তোলা নীল নয়না মেয়েটা ক্লাসে ওড়না মাথায় দেওয়া মেনে চলার সময় কী ভাবতো জানতে ইচ্ছে হলো। পশ্চিমা পোশাক ছাড়া চাপও নাকি ছিলো ওর ওপর, বিস্তারিত জানিনা।

ওর ভাবনাগুলি আর জানাও যাবে না আর। মরে গেছে মেয়েটা। বেঁচে থাকলেও জানতাম না। একটা সময় ছিলো যখন আমার নিজের জন্য মায়া হতো একদিন মরে যাবো ভেবে, মনে হতো কতো কী অদ্ভুত আর চমৎকার ভাবনা আসে আমার মনে- কেউ জানবেনা মরে গেলে। প্রতি মুহূর্তে লেখা সাজাতাম মনে মনে। কিচ্ছু লেখা হয়ে ওঠেনি সেসব। হারিয়ে গেছে। কলেজ থেকে টিউশনিতে আসা যাওয়ার পথে,  চিটাগং মেডিকেলের সামনে চমৎকার কোনো একটা গল্পের প্লট এসেছিলো মাথায়, বেশ কিছু সংলাপ ও দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। কী ছিলো তাতে? মনে নেই। মাঝে ১৬ বছর পেরিয়েছে। ছুটোছাটা কিছু ভাবনা হয়তো লেখা হয়েছিলো চিঠিতে পত্রে। সেই সব চিঠি কোথায়? রাওদা মেয়েটাও কি চিঠি লিখতো কাউকে? ডায়রী কি লিখতো মেয়েটা? আজকাল তো কেউ ডায়রী লিখেনা।

নিজেকে ছড়িয়ে দিতে কেন ধরে রাখি না ভাবনাগুলো সব? ধরে রাখার আলস্য? নাকি ছড়িয়ে যাবার অনীহা??

রাওদা মেয়েটার নীল চোখ। ছোটবেলা থেকেই আমার ভীষণ আগ্রহ ছিলো নীল চোখে। বিটিভিতে ‘Maharaja’s Daughter’ নামে একটা সিরিয়াল দেখাতো। মূল চরিত্রের মেয়েটার নীল চোখ দেখতাম মুগ্ধ হয়ে। ঐ চোখ দেখার জন্যই মিস করতাম না সেই সিরিয়াল। রাওদা মেয়েটার প্রতি মুগ্ধতা নিশ্চয়ই ছিলো এমন অনেকের? কতো ঝড় না জানি তুলতে পারতো, কতোই না জানি মেলতে পারতো পাখনা।

ওড়া দেখতে ভালো লাগে। পাখনা ছড়ানো স্বাধীনতা দেখতে ভালো লাগে।

রাওদাকে আমি জানতে পারবো না হয়তো। কিন্তু এটা জানলাম রাওদারা আসে বাংলাদেশে। এখনো অনেক ছেলে মেয়ে আছে যারা অন্য দেশ থেকে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে এদেশে এসেছে। আশপাশে সারাক্ষণ ‘উন্নত দেশে’ স্কলারশিপ এবং ‘উচ্চতর’ ডিগ্রীর ভীড়ে কখনো খেয়াল করিনি বাংলাদেশে অন্য দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসছে। এদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

এক সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৩৭ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৯৩ জন। ২০১৫ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০১৪ সালের তুলনায় ১৬১ জন বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক বলে দেখা হচ্ছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৫ সালে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১,৫৪৮ জন; যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রাম-এ (৯৫৫ জন, এর মধ্যে ছাত্রীসংখ্যা ৪৯৪)। সর্বাধিক বিদেশি শিক্ষার্থীর দিক থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছিল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (১৪০ জন), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম (৯১ জন)।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর হার সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ৩৬টি দেশের শিক্ষার্থীরা ২০১৫ সালে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল:

১. ভারত, ২. পাকিস্তান, ৩. শ্রীলংকা, ৪. নেপাল, ৫. ভুটান, ৬. মালদ্বীপ, ৭. চীন, ৮. জর্ডান, ৯. প্যালেস্টাইন, ১০. পোলান্ড, ১১. ক্যামেরুন, ১২. মালয়েশিয়া, ১৩. ইন্দোনেশিয়া, ১৪. কোরিয়া, ১৫. তুরস্ক, ১৬. উগান্ডা, ১৭. জার্মান ১৮. অস্ট্রেলিয়া, ১৯. যুক্তরাষ্ট্র, ২০. কানাডা, ২১. সোমালিয়া, ২২. ইথিওপিয়া, ২৩. নাইজেরিয়া, ২৪. কেনিয়া, ২৫. ইটালি ২৬. জাপান, ২৭. লাইবেরিয়া ২৮. তানজানিয়া ২৯.পাপুয়া নিউগিনি, ৩০. জিম্বাবুয়ে ৩১. মিয়ানমার ৩২.মালে, ৩৩. ফিলিপাইন, ৩৪. আরব আমিরাত, ৩৫. মিশর এবং ৩৬. নেদারল্যান্ড

তার মানে আমরা চাইছি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা আসুক এখানে। যদি আমরা তাই চাই, তাহলে ওরা যেন আসে তেমন সহায়ক পরিবেশ তো দিতে হবে।

উল্টোপথে হাঁটা আর কত? বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ‘ইসলামী’ ট্যাগ আছে যেগুলোতে, সেখানে মেয়েদের জন্য ড্রেসকোড দেওয়া আছে। ‘মেয়েদের’ জন্য জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শীত/গ্রীষ্ম নির্বিশেষে ‘মাথায় ওড়না/হিজাব’ (কোনো কোনোটাতে বোরখা/এপ্রোন) বাধ্যতামূলক (ছেলেরা বিন্দাস, তাদের অভিনন্দন!)। এটা নারীর প্রতি স্পষ্ট বৈষম্য (সমাজে প্রচলিত বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ)।

তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শিশু নয়, যে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে কিংবা সহপাঠীদের পোশাকে সচ্ছলতার তারতম্য কোমল মনে ছাপ ফেলতে পারে বলে তাদের ইউনিফর্ম পরানো হবে। আমাদের দেশ থেকে কতো মেয়ে যাচ্ছে বাইরের দেশগুলোতে পড়তে, তাদের যদি বলা হয় এখানে এলে তোমার শর্ট স্কার্ট, স্লিভলেস টপ পরতেই হবে- কেমন লাগবে এদেশের অনুভূতিপ্রবণ জনগণের? অ্থচ বাধ্যবাধকতায় পড়া এই মেয়েগুলির অনুভূতির তো কোনো পাত্তা নাই!

রাওদার কী হয়েছিল, আদৌ সেটা এখানে ‘বিদেশী’ হওয়ার সাথে সম্পর্কিত কিনা সেটা আলোচ্য নয়। যারা আসছে, যারা আসবে- তাদের সুস্থ, স্বাধীন আর সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা আমাদের আছে কিনা সেটা ভাবা উচিত। দেশের মেয়েদের স্বাধীনতার দরকার নেই কিন্তু বিদেশীদের আছে, তাও বলছিনা। বৈষম্যের ক্ষেত্রে নারীর কোনো দেশ নেই একথা যেমন ঠিক, ভিন দেশে সেই বৈষম্যের ক্ষত আর বেশি করে পোড়ায় সেটাও বোধ হয় ভুল নয়।

মেয়েদের উড়তে বলাটা কেউ কেউ শিখে নিয়েছে, কিন্তু পায়ে শেকল বেঁধে দেওয়ার চর্চা থেকে বের হয়তে বললেই মুশকিল! ওটা ভুলতেও পারছে না, শেকলটা খুলতেও পারছে না। ভাবটা এমন- “উড়বে তো উড়ুক, কিন্তু শেকল খোলার দরকার কী!”

তথ্য সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৫, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

লেখক: জিনাত হাসিবা, উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.