“সন্তান জন্মদানেই কি নারীর পূর্ণতা”

দিনা ফেরদৌস:

সন্তান জন্মদানেই নারীর পূর্ণতা কিনা ,তা বলার আগে আমার নিজের কথা বলি। আমি একজন মা। সন্তানের প্রতি আমার যেমন ভালবাসা, সন্তানের পিতারও কোন অংশে কম বলে আমি মনে করি না। সে আমাদের দু’জনের সন্তান। আমাদের সেই আদরের সন্তান যখন উল্টা-পাল্টা কিছু করে, তখন তার বাপ নিঃসন্দেহে বলেন, মা’র দোষ পেয়েছে। ঠিক একই ভাবে যখন ভালো কিছু করে, তখন বলেন, বাপের গুণ পেয়েছে।

বুঝলাম আমার মতো মায়ের পূর্ণতা কিছু হোক বা না হোক বাপের পূর্ণতা ঠেকাবার ক্ষমতা কোনো আদমের নেই। বিয়ের পর পড়াশোনা শেষ করবো যখন ভাবছি, তখন সবারই এক জিজ্ঞাসা, বাচ্চা কবে নিচ্ছি? চারপাশ থেকে লোকজন গল্প সংগ্রহ করে পাঠাতে লাগলো নিজ দায়িত্বে। কারা বিয়ের পর পরই বাচ্চা নিয়েছে, কার সংসারে বাচ্চা নেয়ার ফলেই উড়নচণ্ডি স্বামী সংসারের দিকে মনোযোগী হয়েছেন, শ্বশুরবাড়িতে কার কদর বেড়েছে!
সঙ্গে আরও যুক্ত হলো, ছেলে সন্তান জন্ম দিলে মায়ের দাপট কেমনে বেশি বাড়ে। বেশি ছেলে সন্তান জন্ম দিতে পারলে তো কথাই নেই, ইত্যাদি ইত্যাদি। সন্তান জন্মদান নিয়ে ফর্দ বড় হতেই থাকে। একটার পর আরেকটা। এতো সামজিক ফর্দের মধ্যে নারীর নিজস্ব পূর্ণতা কোথায়, তা খুঁজে বের করা মুশকিল। বাচ্চা জন্মদানে একজন নারীর সমাজে, শ্বশুর বাড়িতে কী অবস্থান হবে, স্বামীকে ঘরমুখী করা যাবে, আবার সন্তানের মধ্যেও জাত-বেজাত খুঁজতে হবে, ছেলে হলে অবস্থান কোথায় থাকবে, মেয়ে হলে কোথায়, সে এক কাহিনীই বটে।
আপাতদৃষ্টিতে নারী এখানে কী চাচ্ছে, কোথায় নিজের পূর্ণতা খুঁজছে, তার কোনো উল্লেখ নেই। সমাজ তাকে পূর্ণতা দিলে সে পূর্ণ। সমাজ অপূর্ণ বললে তাকে অপূর্ণতা মেনে নিতে হবে। এখন যদি দেখা যায় স্বামীর সমস্যার কারণে কোনো মেয়ে মা হতে পারছে না, যে তার স্বামীকে প্রচণ্ড ভালবাসে। দৃশ্যত মেয়েটি গর্ভধারণ করতে পারছে না। সেটা কি তার নারীত্বে অপূর্ণতা বলে মনে করবেন? পূর্ণতা অর্জন করতে বলবেন তাকে যে স্বামীকে ছেড়ে চলে যাও!
তা যদি নাই হয়, তবে এই পূর্ণতা কীসের ভিত্তিতে দেয়া হচ্ছে?
আচ্ছা এবার তাহলে ধরি, মেয়েটির সমস্যার কারণেই বাচ্চা হচ্ছে না, যেখানে তার কিছুই করার নেই, সে মনে-প্রাণে সন্তান কামনা করে। তার জন্য কী সমাধান? তার মানেও কিন্তু ওই একই। তার আর যতো কিছু যোগ্যতা থাক বা না থাক, এই এক কারণেই সে অপূর্ণ নারী। এবার নিশ্চয়ই তার স্বামীটিকে আরেকটি বিয়ের উপদেশ দেবেন। বুঝলাম তার স্বামীকে কোনো মন্ত্রণা দিলেন না, মেয়েটির প্রতি অসীম দয়া দেখালেন।
এখন প্রশ্ন হলো, যে নারীর কারও দয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে নেই, বাচ্চা নেবার ক্ষমতা আছে কিন্তু নেবে না, এটাকে তবে কি আপনাদের ভাষায় তার স্বেচ্ছাচারিতা বলবেন?

একটি নারীর বাচ্চা জন্ম দিলে বলা হচ্ছে নারীর পূর্ণতা, না হলে দেখানো হচ্ছে দয়া, আর সন্তান নিতে না চাইলে বলা হচ্ছে স্বেচ্ছাচারিতা, এসবকিছু সমাজের ধরিয়ে দেয়া সার্টিফিকেট। নারীটি কী পাচ্ছে না পাচ্ছে, কী চায় বা না চায়, কেউ ভাবার প্রয়োজনই বোধ করছেন না।

প্রেগনেন্ট অবস্থায় যারা কঠিন জটিলতার মধ্য দিয়ে যান, তারা জানেন সন্তান জন্ম দেয়া কী কঠিন। বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে বহু মা মারাও যান। তাই সন্তান জন্ম দেবার সিদ্ধান্তটা একান্তই মায়ের হওয়া উচিত।

কথায় বলে, “মা ভাল তার মেয়ে ভাল”। অথাৎ মেয়ের মন্দ কিছু শুনলে, সন্তান জন্ম দেয়ার পূর্ণতার জন্য কোন মাকে সম্মানে ভূষিত করা হবে না দোষ দেয়া ছাড়া। যারা বাচ্চা জন্মদানে নারীর পূর্ণতার বড় বড় গল্প দেন, তারাও তখন উল্টো সুরে কথা বলেন।

যাই হোক অবশেষে বলবো, যারা সন্তান কামনা করেন, তারা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিন। যারা সন্তান জন্ম দিতে আগ্রহী না, তারা পূর্ণ কী অপূর্ণ, তা নিয়ে টানাটানি না করে নিজেদের মতো থাকতে দিন। এতে করে যারা ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাচ্চা নিতে পারছে না, তাদের প্রতি কিছুটা মানবিকতা দেখানো হবে।

প্রতিটি সন্তান যেন পৃথিবী আসে মা-বাবার ভালবাসায়, ইচ্ছায়। কোনো নষ্ট সমাজের দায়ে কিংবা ইচ্ছাতে না।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.