করুণার শহর

0

শাফিনুর শাফিন:

সেক্স করতে করতে করুণা প্রায়শ ঘুমিয়ে পড়তো। তাই সে কখনো পূর্ণ সুখ কি তা জানতে পারেনি। শুধু স্বপ্নের গভীরে চলন্ত ট্রেনের হাওয়ায় সাদা জামা উড়ে যেতে দেখতো। স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। অভিযোগ ছিল এতো মেয়ের সাথে শুয়েছে কিন্তু এমন ঘুমকাতুরে অদ্ভুত মেয়ে সে দেখেনি কখনো। তাতে করুণার ঘুমের কোন সমস্যা হয়নি। তাঁর বলা হয়নি অমন নিবিড় মুহুর্তেও সে কোন একটা সুর ভাবতো। বেহালার সুর। অথবা চেজিং কারস!
সুর আর সঙ্গমে ডুবে যেতে যেতে একটা সময় তাঁর চোখ বন্ধ হয়ে আসতো। সে ভাবতে থাকতো একটা শহরের কথা। শহরের গায়ের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা পাড়া। পাড়ার ভিতর শৈশব। এসব সময়ে করুণার মনেই থাকতো না, তাঁর শরীর নিয়ে কেউ একজন খেলছে। কেউ একজন চাইছে সেও সাড়া দিক! এসব ঘুমের ভিতর হারিয়ে সে কী সুখ খুঁজে পেতো বলা হয়নি কখনো তাঁর স্বামীকে। বলা হয়নি আয়নায় নিজের শরীর না দেখলে, নিজেকে না দেখলে তাঁর শরীর জেগে উঠে না। তাই স্বামীপ্রবর যখন ছেড়ে যাওয়ার কথা বললো, করুণা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও ওর এক ছেলেবন্ধুর কথা মনে পড়লো আচমকা, “ফেমিনিজম সাক্স! দিয ইয হোয়াই ইউ পিপল কান্ট বি হ্যাপি উইদ এনিওয়ান!” করুণা জবাবে বলেছিল, “উঁহু! ইয়োর আইডিয়া অভ হ্যাপিনেজ এন্ড আওয়ার ওয়ান নট সেইম!” সেই বন্ধুটি হয়ত এবার ওর উদাহরণ দিয়েই এই উক্তিটি দিবে অন্য কাউকে।
ভিডিও কলে কাছের বন্ধুকে ডিভোর্স হতে চলেছে খবর দেয়ার পর বন্ধু জানতে চাইলো, কী করবে সে এখন! করুণা হাসতে হাসতে বলেছিল, “শান্তিতে ঘুমাবো!” বন্ধুর চোখে ছিল, “নিজের দুঃখ লুকাতে চাইছিস! জোর করে বোঝাতে চাইছিস ভালো আছিস!” এমন এক অবিশ্বাস। করুণা বুঝেও খিল খিল করে হাসছিল আর খবর নিচ্ছিল বন্ধুর প্রিয় কুকুর, বাড়ির সামনে রোপন করা টমেটো গাছ ইত্যাদির। করুণা কুকুর পছন্দ করে না। এই কুকুরটা সেদিন ভিডিও কলে ওকে দেখামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে স্ক্রিন চেটে দিয়েছিল। কল কেটে দেয়ার পর করুণা স্ক্রিন ক্লিনার দিয়ে স্ক্রিনটা পরিষ্কার করতে করতে মনে পড়ছিল স্বামীর কথা, সে বলেছিল, “তুমি কুকুরের মতো লয়্যাল প্রাণী পছন্দ করো না, অথচ আমার মতো ডিজলয়ালকে ভালোবাসো!”
ডিভোর্স পেপারে হাই তুলতে তুলতে সই করে ফেরার পথে রয়াল হাটে বসে এক গ্লাস লাচ্ছি আর বিফ-চপ খেয়ে বাসায় ফিরে আধোয়া নকশি কাঁথাটা জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। বহুদিন পর যেন নির্বিঘ্ন ঘুম ঘুমালো করুণা। বহুদিন পর ট্রেনের ভোঁ সেদিন ঘুমের ভিতর ডাক দিলো অন্য সুরে। যেন ট্রেনের দরজায় হাতল ধরে দুলতে দুলতে উশকু-খুশকু চুল উড়িয়ে, নীল কার্ডিগানের উলের ভিতর জমে থাকা ওম জড়িয়ে কোন এক শীতের মধ্যহ্ন ঝাঁপিয়ে সে পৌঁছে গিয়েছিল সেই ঝাঁ আলো ঝকঝকে শহরে।
সন্ধ্যে নামলেই রঙ বদলে হয়ে যায় ট্রামের ছমছমে লাইনের তারঘেরা হলুদ সোডিয়াম বাতিঘেরা শহর। তখন শহর ছাতিমের ফুরিয়ে যাওয়া ঘ্রাণ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে। কেউ দাঁড়িয়ে ছিল দাড়িভরা হাসি দাঁতে নিয়ে, কেউ ছিটকে পড়েছিল হয়তবা স্টেশনের বাইরে! গরম চা ছলকে পড়ার শব্দ চাপা পড়ে গেলো দাগের রেখায়। কোত্থেকে অলিতে গলিতে ঘুরে ঢুকে পড়েছিল সন্ধ্যায় গরুর মাংসের লোভে বাগবাজারের মুসলিম পাড়ার মানুষগুলোর সন্দিহান চোখের ভিতর। খুপড়ি ঘরগুলোর দেউড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা ঢোলা পাজামা আর লম্বা কামিজ পরা ফর্সা মেয়েগুলোর মুখের উর্দু বাত-বিতণ্ডা শুনতে শুনতে বাগবাজারের সরু গলি- করুণা আর তাঁর সখীর চোখের সামনে নিমেষে কীভাবে যেন হয়ে গেলো কদমতলীর পেটের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিহারী গলি! পাগলা একটা সাইরেনের মতো শহরটা বেজে উঠছিল যেন কর্ণকুহর ভেদ করে- যেন বা শহরের শরীরজুড়ে মাহফিল। যেন এই শহর এক পরম আরাধ্য পুরুষ!
সেদিন সেই ঘুমের ভিতরেই বেজে উঠে শৈশব। বেজে উঠে ফেলে আসা ওয়াজ আর ধূপ ধুনোর ঘ্রাণ জড়ানো একটা পাড়া। এই পাড়ার বৈশিষ্ট্য হলো, যে একবার বাসা ভাড়া নেয়, সে আর কখনো বের হতে পারেনা! শুধু পিপুলের মা মাসী ইন্ডিয়ায় ছেলেদের নিয়ে চলে যান! আর বুড়নরা। বুড়ন বাল্যসখা। একবার ওর সাইকেলে চড়তে গিয়ে সাইকেল উলটে পড়ে গিয়েছিল বলে করুণার আর সাইকেল শেখা হয়নি। বুড়নের মামাবাড়ির সবাইসুদ্ধ চলে গিয়েছিল! কিন্তু অমন আমেরিকার গ্রীন কার্ড পেলে সবাই যায়। ও আচ্ছা, পল ছিল একটা সময়। পলের বোন হিন্দু বিয়ে করেছিল এটা পাড়ার সবার মুখরোচক গল্প হয়ে ছিল বহুবছর! পলকে পলি ডাকতো সবাই। কে জানে চাটগাঁইয়াতে ফলি ডাকতে গিয়ে পলি বলতো কিনা! পল নাকি ইংরেজিতে রেকর্ড মার্ক পেয়েছিল। অতিরিক্ত ব্রিলিয়ান্ট হলে শেষমেশ পলির মতোই পাগল হয়ে যেতে হয়, এমন কথাও সবাই বলতো!
এই এক পাড়া ছিল এই শহরে। যার ভিতরে লাল পাথরের রাস্তা পেরিয়ে গেলেই নদী পাবে, যার পাশে ডক ইয়ার্ড, শ্রমিকদের পাতার বাঁশীর সুর, নারিকেল বাগান ঘেরা জমজপুকুর। আর পাড়ার বিকেল মানেই দাদুরা লাঠি হাতে বের হবেন, দিদিমারা দেউড়িতে চুল মেলে বসবেন, বাচ্চারা এলাটিং বেলাটিং সইগো, কুমির নেমেছে জলে খেলতে খেলতে প্রতিদিন গালির বন্যা আর মারামারি করেই ঘরে ফিরবে আর তার রেশ টেনে মায়েদের ঝগড়া। মুসলিম মহিলারা জানলা খুলে বাইরে দেখতেন শুধু। তারা দরজায় দাঁড়াতেন না। তাদের স্বামীরা বাবুল ডাক্তারের ফার্মেসিতে গিয়ে বিকেলবেলা কাটাতেন আর ভারতের দালালদের গুষ্টি উদ্ধার করতেন কিভাবে তারা দেশটাকে বিক্রি করে দিচ্ছে বলে। তার পাশেই সাত্তারের হোটেল, আর সেই হোটেলে গোপনে বাংলা মদ বিক্রি।
রমজান এলে কালো পরদা ঘিরে খাবার বিক্রিও চলতো। সাত্তারের ভাই আজিজ মদ খেতো সারাদিন। তবু সেই- সেই যে বাবরি মসজিদ ভাঙল- সেবার রঞ্জনদার সাথে মদ খাওয়া শেষে একটা কিরিচ হাতে সে বেড়িয়ে পড়েছিল হিন্দু মারবে বলে। হয়ত মেরেও ফেলত। কাউকে পেল না সেবার। সব হিন্দু ভয়ে বাকিসব মুসলিমদের ঘরে ঘরে- এমনকি সাত্তারের ঘরেও আশ্রয় নিয়েছিল। ভয়াবহ সেই রাতের পরদিন সব আবার স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। কেবল এক সপ্তাহের মধ্যে চারজন হিন্দুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কালা-রাজু নিখোঁজ সব বিজ্ঞপ্তি তাঁদের ঘরের বেড়ার দেয়ালে সেঁটে রাখতো। কে জানে কার খোঁজে!
কালারাজুদের ঘরের পাশেই চন্দ্রিমাদিদের ঘর ছিল। ওদের বাড়িতে প্রথম ডিশ এন্টেনা এনেছিল। সারাদিন টিভি চলত আর পাড়ার ধেড়ে বুড়ো বাচ্চা সব্বাই গিয়ে জড়ো হতো নানা উছিলায়। রঙিন সেই টিভিতে অঞ্জু ঘোষকে দেখালেই চন্দ্রিমাদির বাবাকাকু বলে উঠতেন, “এককালে আমি যাত্রা থিয়েটার করতাম। আমার নায়িকা হতো অঞ্জু!” বলার পরে সেকি গর্বের হাসি খেলে যেতো উনার গোঁফের নিচে। চন্দ্রিমাদির মা ছিল ছিপছিপে গড়নের দুধে আলতা গায়ের রঙের। গেরুয়া রঙের লাল পাড় দেয়া শাড়ি পরে সন্ধ্যা দিতেন। আর কাকু তাঁর কিছুক্ষণ বাদেই রাত বাড়লে যেতেন সাত্তারের দোকানে। সাত্তারের দোকানে হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ ক্রিশ্চান একসাথে তথাকথিত অধর্ম পালন করত। তার দোকানের আরেকটু পাশেই আনোয়ারা বুইড়জ্যার দোকান। এর পাশে বিপ্লবের বাবা নাপিত কাকুর দোকান। করুণাদের সব ভাইবোনকে বাসায় এসে মাসে একবার চুল কেটে দিতেন তিনি! সন্ধ্যার পরে লোডশেডিং হলেই বাচ্চারা সব খেলতো লুকোচুরি। বড়রা হেঁটে যেতো নদীর পাড়ে। স্তুপ করে রাখা কাঠের সারি স’মিল থেকে এনে জড়ো করে রাখা থাকতো নদীর পাড়ে। অনেকদূরে নদীর ঠিক পাড়েই ছিল দুবাইওয়ালীর বাড়ি। কত আজব আর অচেনা লোক যে নিয়মিত আসত আর যেতো। দুবাইওয়ালীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সে নামাজ পড়ে না কেন? সে বড় অদ্ভুত এক জবাব দিয়েছিল, “বিছানায় সব ধর্মের পুরুষ একই আচরন করে। এসব দেখে রুচি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই নামাজ পূজা কোনটাই করি না।“ তাঁর ঘরে যেতো কালিসাধক নির্মল সাধু প্রতি মাঝরাতে।
এসব বেপাড়া ঘুরে এসে ঘুম থামে একটা মক্তবের দোরগোড়ায়। টিনের চালায় ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ মিশে যায় একদল শিশুর জোরে জোরে সুর করে পড়া আমপারার শব্দের সাথে। বেত হাতে দাঁড়িয়ে ছিল জাফর মুলি। মানে মোল্লা। মসজিদের হুজুর। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে যিনি প্রতিদিন মেসোয়াক দিয়ে দাঁত খিলিন করতে করতে মসজিদের দরজা খুলে অজু সেরে ধূপ ধুনোর ঘ্রাণ মেখে শাঁখ বাজার ঠিক আগে মাগরিবের আজান দিতেন। করুণা আজানে ভেসে উড়ে উড়ে চলে যায় পুরনো এক পর্তুগিজ বাড়িতে। যে বাড়িটা ছিল এককালে রংমহল। যে বাড়ির দোতলায় টুলুর বাবাকে মুসলিম হবার দোষে পরিবার নিয়ে পাড়া ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। যে বাড়ির ছাঁদের একপাশে শিউলি গাছের শুকনো ডাল থেকে শরতকাল বাদেও ভেসে আসতো শিউলির ঘ্রাণ। স্বপ্নে এসব পরিচিত ফেলে আসা মুখ, ঘ্রাণ, সুর সব কিছু এলোমেলো ফিরে এলো সেইদিন।
ঘুম ভাঙার পর করুণা কেঁদেছিল বহুক্ষণ। না, স্বামী নেই বলে নয়। স্বামী গেলে স্বামী আসবে। কেঁদেছিল ঘুম কেন ভেঙে গেল ভেবে! ঘুমের ভিতর শৈশব মিশে যায় শহরের বুকে। শহর হয়ে যায় একটা প্রবল পুরুষের মতো। কাছে টেনে নিয়ে জানায় ফিসফিসিয়ে, সে আছে। পাশেই দাঁড়িয়ে। তাঁর এই প্রেমিক শহর জেনেছিল করুণার প্রথম সবকিছু। ছায়ার মতো পিছু পিছু এসে দাঁড়ায় এই ফিরিঙ্গি শহর। জানিয়ে যায় তাঁর কানে কানে, পাড়া ভেঙে যায়, মানুষ চলে যায়, স্মৃতি হারিয়ে যায়- কিন্তু এই প্রেমিক- এই শহর থেকে যায়। সে রঙ রূপ পাল্টে ফেললেও একান্ত অনুগত প্রেমিকের মতো থেকে যায়। তাঁর কাছে ফিরে আসা যায়। বার বার। কোথাও যেন ফিসফিস করে হাওয়া বইছে। করুণা জানলা খুলে চোখ মেলে দেখে অজস্র হলুদ সাদা উজ্জ্বল আলোর মধ্যে জ্বলতে থাকা নিজের শহরকে।

লেখাটি ১৬,৩৩৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.