ভিন্ দেশে আমার স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধা

ফারজানা আকসা জহুরা:

বাবা-মা’র মৃত্যুর পর আমি যখন ফ্রান্সে আসি, তখন মৃত্যু ছাড়া আর কোনো কিছুই চিন্তা করতে পারতাম না l আমার সঙ্গী তখন বলতো, এই দেশে মা হতে গিয়ে কেউ মরে না। ওর কথা শুনে আমার খুব রাগ হতো, জন্ম-মৃত্যু তো আল্লাহ’র হাতে , তাই না ? বিধর্মীদের এই দেশে এসে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতো। এই দেশে মসজিদে আজান দেয় না,  বাড়ির পাশে গির্জার ঘন্টা শুনে বুঝতাম কয়টা বাজে, আর ঐ অনুযায়ী নামাজ পড়তাম।  সময়জনিত কারণে নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে খুব কষ্ট হতো, আর ঠাণ্ডার সমস্যা তো আছেই l

এই দেশে প্রথমেই যে ধাক্কাটা খেলাম, তা হলো হাসপাতাল। 

আব্বু-আম্মুর জন্য বাংলাদেশের হাসপাতালগুলিতে আর ডাক্তারদের পিছনে কম দৌড়াদৌড়ি করিনি! কিন্তু এখানে ডাক্তার আর নার্স আমাকে নিয়ে দৌড়াচ্ছে! আমার গোসল করানো, কাপড় পরানো .. সবই তারাই করছে ! ওকে হাতও লাগাতে দিচ্ছে না! তখন আমি একটু লজ্জা পেয়েছিলাম, কিন্তু তাতে কী? তাদের কথা হলো, ” এইগুলো তাদের কাজ, তাদেরকেই করতে হবে” l

“একজন মায়ের কিংবা একজন রুগীর জীবনের যে কত মূল্য, তা এরা খুব ভালোভাবেই দিতে জানে!” এই দেশে রুগীকে শুধু হাসপাতালে নিতে হয়, আর যদি না পারে, তাহলে ফোন দিলেই হয়, কেউ আপনার কাছে টাকা চাইবে না! টাকার জন্য চিকিৎসা বন্ধ থাকবে না! আগে আপনি, আপনার জীবন! এর পরে টাকা ও আপনার কাগজ!

” ধর্মহীন এই দেশে মানব সেবাই যে বড় ধর্ম ! “

আমি যখন একটু সুস্থ হলাম তখন দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেলাম …আমি তখন প্রথম এই দেশের পাবলিক যানবাহনে উঠলাম l সাপ্তাহিক ছুটির আর লম্বা ছুটির সময় এই দেশের বাস …ট্রেন ও ট্রামগুলিতে প্রচণ্ড ভিড় থাকেl দীর্ঘ ২০ বছর বাংলাদেশে ভিড়ের মধ্যে বাসে উঠার অভিজ্ঞতার কারণে আমি প্রথমে অনেক ভয় পেয়েছিলাম l কারণ এইদেশের পুরুষরা অনেক লম্বা, যদি তারা কোনো সম্যসা করে? আমি তো তাদের মাইর বা গালি দিতে পারবো না! আর একসাথে বের হলে, আমার সঙ্গী সবসময় পুসেত (বেবি গাড়ি) টানতো, তাই বাস ট্রাম বা ট্রেনে উঠলে সে একদিকে থাকতো, আর আমি অন্য দিকেl আমি দেখতাম অনেক মেয়ে খুবই খোলামেলা পোশাক পরে আছে l কিন্তু কোনো পুরুষ, ছেলে, এমনকি এশিয়ান পুরুষও মেয়েদের দিকে ঐভাবে তাকায় না! তাদের শরীরে ধাক্কা দেয় না, বা ধাক্কা দেয়ার চেষ্টাও করে না! তখন বুঝলাম, আসলেই আমি এদের কখনো মাইর বা গালি দিতে পারবো না!

” এদের ঈশ্বর যে মনের মন্দিরে বাসকরে “। তাই তো , আমাদের মতন এত মন্দির মসজিদ এদের দরকার হয় না ।

একদিন টিভির একটি অনুষ্ঠান দেখছিলাম, “গরমের ছুটিতে কোথায় কোথায় বেড়াতে যেতে পারেন”, তখন তিন নাম্বার ধাক্কাটা খেলাম ….

কেপ দাগদে নামের একটা শহর আছে । সমুদ্রের পাশে অবস্থিত এই শহরটিতে গ্রীষ্মকালে কেবল নগ্ন মানুষরা বসবাস করে। অবশ্য কাপড় পরা মানুষও আছে, তবে বেশিরভাগ নগ্ন মানুষই থাকে। আবার এই দেশে কিছু পার্কও আছে, যেখানে গরমের সময় মানুষ পোশাক ছাড়াও ঘুরে বেড়াতে পারে !  দেখলাম ঐ পার্কে একদল মানুষ পোশাক ছাড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, অন্যরা পোশাক পরা ..এদের মধ্যে দুই তিনটা পরিবারের মেয়েরা বোরখা পরা! এমনকি তাদের মুখও ঢাকা! এইসব দেখে মনে মনে নিজেকে খুব করে গালি দিলাম, কেন এই বিধর্মী দেশে আসলাম?

পরে চিন্তা করলাম, এটি তো এমন একটি মানবাধিকারের দেশ, যেখানে আমার মতন ধার্মিক আর নাস্তিক একত্রে বসবাস  করতে পারে! এই দেশের জনগণের পোশাক পরার, আর না পরার, এমনকি বোরখা পরার স্বাধীনতাও আছে ( নিয়ম মেনে)! এই নিয়ে সরকার খুব বেশি মাথা ঘামায় না। এরকম স্বাধীন দেশে কেউ ইচ্ছে হলেই কাউকে ধর্ষণ করতে পারে না, না বাসে, ট্রেনে, ট্রামে কোনো মেয়ের শরীরে কেউ হাত দিতে পারে না।

দিন যত যেতে লাগলো ততই আমি ধাক্কা খেতেই লাগলাম ….

বাসায় বিভিন্ন ধরনের সরকারী চিঠি  আসে…. তাও খামসহ! উত্তর পাঠান, আর সময় থাকলে অফিস যান …..এখানে অফিস গুলিতে ঘুষ ছাড়াই কাজ হয়! অনেক চিঠিতে সরকার আমাদের কৈফিয়ত দেয়/ জবাবদিহি করে! আমরা কী পানি খাই গ্যাস কোথা থেকে আসে? বিদ্যুৎ কোন কোম্পানি সরবরাহ করে? এখন কত দাম রাখে? আগে কত দাম ছিল? কোন রাস্তা কবে ঠিক হবে, কবে কোন রাস্তার কাজ শুরু হবে? আপনার এলাকায় কী কী আছে …. কী কী নাই, কোন কাজের জন্য কোথায় যাবেন ….. কাকে ফোন দিবেন, সব তথ্য বাসায় এসে ফ্রি তে দিয়ে যায়।

অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্য জানতে হলে টাকা লাগে। অনেক সময় তথ্য জানতে চাওয়ার অপরাধে জেল যেতে হয়। স্বাধীন কথা বলার অপরাধে কোপ খেতে হয়! ধর্মপ্রাণ মুসলিম দেশে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। অথচ ধর্মহীন দেশে না ঘুষ আছে , না দুর্নীতি।

এই দেশে আমি যখন বেবিকে নিয়ে একা বাহির হই .. তখন পথচারীরাই পুসেত( বেবি গাড়ি ) উঠানামার জন্য সাহায্য করে l কাউকে কোনোদিন ডাকতে হয়নি,পথচারিদের সাহায্য করা যেন এইদেশের নিয়ম। এই দেশে শিশুদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয় না। শিশুরা হলো দেশের সম্পদ, তাই শিশুদেরকে সবাই আদর করে, সম্মান করে। কী কালো, কী ফর্সা … কী বড় লোক, কী গরিব! .. . শিশু শিশুই.. তার জন্য সবখানে সুযোগ সুবিধাতে ভরা। শতকরা ৯২% মুসলিম দেশে শিশু অধিকার দূরের বিষয়, শিশু হত্যা বা ধর্ষণেরও কোনো বিচার হয় না ।

এই ইহুদি নাছারার দেশে মানুষের সেবার জন্য হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স ও অনান্য সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান সর্বদা প্রস্তুত থাকে, আর মুসলিম বাংলাদেশের সবই যেন টাকা উপার্জনের জন্য।  এখানে কোনো পাগলি রাস্তায় সন্তান জন্ম দেয় না। না কাউকে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়। যাদের খাবার কেনার ক্ষমতা নাই তাদেরকে সরকার ফ্রি খাবার দেয় । যারা রাস্তায় ঘুমায় তাদের কেউ ডাক্তার, পুলিশ এসে দেখে যায়! এখানে রাস্তা খানা-খন্দকে ভরা থাকে না, না ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা থাকে !

বলি শতকরা ৯২% মুসলিম দেশে রাস্তায় মানুষ না খেয়ে পড়ে থাকে কেনো?

এই দেশের সরকার হলো জনগণের কর্মচারি ! সকল সমস্যার জন্য সরকার নিজেকে দায়ী বলে মনে করে। আর তাই তারা যে কোনো ভুলের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায় ! গণতন্ত্র কাকে বলে? দেশপ্রেম কী জিনিস? মানবতা কী? এই দেশের সরকার আর জনগণ তা খুব ভালো মতন জানেl এই দেশে বিরোধী দলের কথাবলার সুযোগ আছে। কেউ কাউকে কথায় কথায় গালাগালি করে না। অতীত নিয়ে গর্ব করে না, বরং অতীত থেকে শিক্ষা নেয় , আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করে ।

আর আমাদের দেশে এখনো ৪৬ বছর আগের স্মৃতি নিয়েই বসে আছে ! জনগণ যতই সামনে যেতে চায়, সরকার ততই ৪৬ বছর আগের সেই গল্পটা শুরু করে! যদিও সেই গল্পের স্বপ্নটা আজও স্বপ্নই হয়ে আছে। যে স্বপ্নকে পুঁজি করে চলে ভোট বাণিজ্য, চলে অবৈধ কাজের বৈধতা। চলে ধর্মের নামে ব্যবসা। তাই ধর্মহীন এই দেশ যেন আমার কাছে খুব বেশি ধার্মিক। মানবতা হলো যেই দেশের প্রথম ও শেষ ধর্ম !

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.