প্রতিবাদ হয়ে উঠুক পহেলা বৈশাখ

নাসরীন রহমান:

পহেলা বৈশাখ কী হিন্দুদের উৎসব না ইসলাম বিরোধী? পহেলা বৈশাখে শাড়ি পরবো বলে আড়ং থেকে একটা শাড়ি কিনেছিলাম; আমি শাড়ি তেমন পরি না; সালোয়ার-কামিজই আমার ভরসা!

ফেসবুকে তাই শখ করে পোস্ট দিয়েছিলাম; ‘শাড়ি কেনা শুধু আনন্দই নয়, মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বটে!’

ভেবেছিলাম আমার কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপয বুঝবেন সকলে, কেন পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষিতে বাঙালির সার্বজনীন উৎসবকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বললাম। ফেসবুকে নাকি বুদ্ধিদীপ্ত অনেককিছু পাওয়া যায় ,কিন্তু কমেন্টে কারো কারো কথার নমুনা দেখে আমারই আক্কেল গুড়ুম! বুদ্ধি পাওয়া তো দূরের কথা!

শাড়ি কেনার আনন্দ ততক্ষণে জলে যায় যায় অবস্থা; আসুন দেখি কিছু কমেন্টের নমুনা-একজন লিখেছেন,’ নতুন তত্ত্ব! শাড়ি কেনা প্রতিবাদ হলে, শাড়ী পরা বা পুরনো শাড়ী ফেলে দেয়া কী হবে? আর কোন মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ?
ইসলামি না হিন্দু না খৃস্ট মৌলবাদের বিরুদ্ধে?’

আরেকজন লিখেছেন, ‘তাই বুঝি? এটা একটা বাহানা মাত্র, প্রতিবাদ করার অনেক পথ আছে ৷ স্বামীর পকেট খালি করে কেন?’

অর্থাৎ তিনি ভাবছেন আমি স্বামীর অন্ন ধ্বংস করি বসে বসে, আর মনের সুখে শপিং করি!
কী মানসিকতা নারীর সম্মন্ধে, নুন্যতম সম্মানবোধ নেই কথায়!

আরেকজন বললেন। ‘বুঝলাম কিন্তু এ প্রতিবাদ একজন মুসলমান হিসাবে কি ভাবছেন? কত বড় অপরাধ ভেবে দেখেছেন কি?’

আমি ভাবছি , মুসলমান আর পহেলা বৈশাখের সাথে অপরাধের কি সম্পর্ক? পহেলা বৈশাখ পালন করা কি অপরাধ? তবে কি আপাময় বাঙালি আমরা এই যে প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে মেতে উঠছি আনন্দে, আমরা সবাই অপরাধী? এই যে নেতিবাচক প্রচারণা পহেলা বৈশাখ নিয়ে, কারা এর প্রচারক? স্পষ্টত মৌলবাদীরা; পহেলা বৈশাখকে তাঁরাই ইসলাম বিরোধী বলে প্রচারণা চালায়, প্রয়োজনে হামলা করে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে!

অথচ এই তথ্যটি এদের অজানা বা ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যাওয়া যে, সম্রাট আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়, এটা কোনও হিন্দুয়ানী উৎসবও না। মূলত খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা
সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আজ হয়তো পহেলা বৈশাখের উৎসব সার্বজনীন উৎসবে রূপ পেয়েছে, কিন্তু তাই বলে একে হিন্দুয়ানী উৎসব বা ইসলাম বিরোধী আখ্যা দেওয়া কি ঠিক? আসলে এই মৌলবাদিরা চায় বাঙ্গালির সংস্কৃতি মুখ থুবড়ে পরুক তাই তাঁরা কখনো ধর্মের অজুহাত তুলে , কখনো নিরাপত্তার নামে থামিয়ে দিতে চায় বাঙ্গালির সংস্কৃতির গতিধারা। তাঁরা সংস্কৃতির উপর আক্রমণ করে, কারণ সংস্কৃতি সভ্যতাকে গতিশীল করে ; এই গতিশীলতাই বড় অপছন্দের প্রতিক্রিয়াশীলদের; তারা চায় পশ্চাৎপদতা, জড়তা, ঘুণে ধরা সমাজ; তবেই তাঁরা তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে পারে। অন্যায় আর স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্ব কায়েম করতে পারে। তাই তারা আঘাত হানে সংস্কৃতির উপর।

পহেলা বৈশাখ আপামর বাঙালি প্রাণের উৎসব, ধর্ম , বর্ণ সব ভেদাভেদ ভুলে এই একটি উৎসবে বাঙালি একত্রিত হতে পারে প্রাণের টানে। বাংলা নববর্ষ সবসময়ই অন্ধকার দূর করে বাঙালিকে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়৷  মনের অন্ধকারে জ্বালে
আলো অথচ ইসলামি উগ্রপন্থীরা একে হিন্দুয়ানী উৎসব বল , এর বর্জনের পক্ষেই সাফাই গায়!

মৌলবাদীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই বাঙালি নববর্ষকে বরন করে নিয়েছে প্রতিবার হৃদয়ের গভীর আবেগে; কোনও বাধা , কোনও বিপত্তিই বাঙালির এই স্বত:স্ফূর্ততাকে রুখতে পারেনি , পারবেও না। এবার দোরগোড়ায় আগমনী সুর বাজছে পহেলা বৈশাখের , ইতিমধ্যে সাজ সাজ রব পরে গেলে সকলের মাঝে প্রাণের উৎসবকে বরন করে নেয়ার প্রস্তুতিতে ; এবার ও মেয়েরা সাজবে লাল , হলুদ শাড়িতে ; মাথায় দিবে ফুলের মালা; কোনও অশুভই রুখতে পারবে না আমাদের এই আনন্দ , উৎসব উদযাপন থেকে।

এবারের পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়ে উঠুক মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; সরকার ও সব শিক্ষা প্রতিষ্টানে পহেলা বৈশাখ পালন বাধ্যতামূলক করেছেন; তবে বাধ্য-বাধকতা থেকে নয়, প্রাণের তাগিয়ে বাঙালি মেতে উঠুক বর্ষবরণের উৎসবে ; আর
এভাবেই প্রতিবাদ হয়ে যাক মৌলবাদের বিরুদ্ধেও।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.