মৌলবাদের বাড়বাড়ন্ত আজ চরমে

পাপ্পন দাস:
নাগরিক কবি শ্রীজাত লিখেছিলেন –
‘আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে—
কন্ডোম পারানো থাকবে,তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!’
কেন লিখলেন তিনি এরকম? চলো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দি। সে কাজ করা হলো। তারপর বিতর্ক। কেউ কেউ বললেন, কী তাঁর মনোকষ্ট যে তিনি সেটা চাপতে না পেরে এমন একটি কবিতা লিখে বসলেন? তাইতো এই কবিতা নিয়ে এতো কাণ্ড!তিনি কি কল্পনায় শুধু ধর্ষণকে দেখছেন? তাঁর বিমূর্ত ভাবনা কি শুধু ত্রিশূলে কন্ডোম পরানোর ছবি আঁকছে? একী কাব্যিক প্রকাশ? ভারতের সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্র সুসভ্য এই মহানগরীর অধিবাসী এই কবি কি অন্ধ, নাকি তিনি বধির?
প্রচলিত শিক্ষা-দীক্ষার চেয়েও তো তাঁর আয়ত্তে রয়েছে অনেক অনেক জ্ঞান–কারণ তিনি কবি এবং গীতিকার। সেদিন তো একজন বলেই বসলেন—সাগরময় ঘোষ আজ আর বেঁচে নেই, না হলে কাঁধে হাত রেখে বলতেন–এই যে, এবার শারদীয় দেশে তোমাকে একখানা উপন্যাস লিখতে হবে। প্লট-টট নিয়ে চিন্তা কোরো না। এসব চিন্তায় বৃথা সময় নষ্ট না করে, যা মনে আসে তা লিখে যাও।
অনেকে আবার বলছেন, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী এই কবি কি জানেন না ধর্ষণের ইতিহাস? কারা ধর্ষণকে ধর্ম প্রচারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছেন, তা কি তিনি জানেন না, নাকি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে যোগী আদিত্যনাথের নির্বাচন তাঁর রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে?
 এরকম প্রচুর বিতর্ক চলতে লাগলো। আমিও এই বিষয়ে বেশ কয়েকটা কবিতা/নিবন্ধ লেখলাম। শ্রীজাতও বার-বার সংবাদ মাধ্যমে এসে নিজের মত প্রকাশ করতে লাগলেন। প্রায় দু-দিন তিনি ছিলেন ফেসবুকের বাইরে। তারপর যখন এলেন, বেশ বড় একটা লেখা লিখলেন। এর কিছু অংশ আমি এখানে তুলে ধরছি।
—‘ চরম দুঃসময়েও কবিতা ছেড়ে যায় না আমাকে। শিল্প-সভ্যতার আদিমতম স্রোত, সে কি সহজে স্তব্ধ হতে পারে? তাই এই ঘোর দুর্বিপাকের দিনগুলোতেও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল দুটি পঙক্তি, ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য / ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’। সেই কোন ছোটবেলায় প্রথম পড়া। এই ক’দিনে নিজের জীবন দিয়েই তা পাঠ করলাম নিবিড়ভাবে।আমি খুব ছোটখাটো মানুষ, তাই সহজে থামিয়ে দেওয়া যায় না। ঠিক একটা-না-একটা অবকাশ খুঁজে বেরিয়ে পড়ি আবার। আগেও এমন হয়েছে, এবারও হল, ভবিষ্যতেও আশা করি হবে। একজন নাগরিক হিসেবে, এই এক সপ্তাহে অনেক কিছুরই সম্মুখীন হলাম। তার অনেকটাই সংবাদমাধ্যমের দৌলতে অনেকের জানা, কিছু কিছু অজানাও বৈকি।…….’
তাঁর সেই স্ট্যাটাসে আমি একটা কমেন্ট জুড়ে দিলাম–‘ অনেক দূরে বসে, অসমের ছোট্ট একটা শহর করিমগঞ্জে বসে আপনার জন্য লিখেছি, প্রতিবাদ করেছি, ধর্মান্ধদের গালিও খেয়েছি। সে না-হয় মেনেই নিলাম। আপনি আপনার মত প্রকাশ করেছেন-তাই আপনার বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ অন্যায়- গুরুতর অন্যায়। এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই হয়। এ লড়াই আপনার একার নয়, এ লড়াই বাক-স্বাধীনতার লড়াই, আমাদের সবার লড়াই। কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়-জানি আপনি আমার লেখার এই জায়গাটার দিকে চোখ বুলিয়েই মুচকি হাসি দেবেন। কারণ সে-দিনও যখন আপনাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল–তসলিমাকে নিয়ে তোমরা কিছু বলো না কেন? আপনি বলেছিলেন–হ্যাঁ…ও মা…বলেছিলাম তো। ভুল। একবারের জন্যও আপনি মুখ খুলেননি। তিনি ডান-বাম কারোর খান না বলেই কি তাঁর হয়ে মাঠে নামা, তাঁর পক্ষে গলা ফাটানো অন্যায়?…এ তো অন্যায়। নিজের বাক-স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, কিন্তু তসলিমা নাসরিনের বাক-স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। কী বলবো একে– hypocrisy? নাকি অন্য কিছু? ভেবে দেখুন। বাক-স্বাধীনতায় যখন এতই বিশ্বাসী, তবেও তসলিমা নাসরিনের বাক-স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করুন ।আজ আপনি বাংলা সাহিত্য জগতের বিখ্যাত কবি।আপনার কথার অবশ্যই মূল্য আছে। আপনি তো আর আমাদের মত এলেবেলে নন। আজকে এবিপি আনন্দে একটা ডিবেট প্রোগ্রামে দেখলাম আপনি বলছেন—সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছিল কবিতার জন্য, আর আপনার বিরুদ্ধেও এফআইআর হয়েছে কবিতার জন্য। কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা আপনি, কাউকেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেতে হয়নি, বা হচ্ছে না। কিন্তু তসলিমা নাসরিনকে তাঁর এই স্বপ্নের রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল।এর প্রতিবাদ করতে কি ইচ্ছে করে না? এর প্রতিবাদ করা কি উচিত নয়?’
তখন আমাকেও হুমকির সম্মুখীন হতে হলো। একজন তো বলেই বসলেন–
‘করিমগঞ্জ সেটেলমেন্ট আমি থাকি, ভারতের বুকে ভগবান শ্রীরাম, কৃষ্ণ, শিবসহ নিস্পাপ দেবতাদের অবমাননা কখনো সহ্য করা হবে না। সাবধানে থাকবি, নয়তো অনেক ধৈর্য্য ধরেছি এবার খড়গ, বা 47 হাতে তুলে নিতে হবে। বুজলা সেকু? সময় থাকতে সোজা হয়ে যাও, নয়তো বুকের পাঁজর ঝাঁঝরা হতে পারে যে কোন সময়, যে কোনদিন।’
আসে, এরকম প্রচুর আসে। কিন্তু এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। যেমন সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার প্রাপ্ত কবি মন্দাক্রান্তা সেন শ্রীজাতের পক্ষে কিছু লিখেছিলেন।
কিন্তু এর জন্য তাঁকে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। কবি নিজেই এ কথা জানান। এই ঘটনায়ও নিন্দার ঝড় ওঠে নাগরিক সমাজে। শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ঘটনার নিন্দা করেন।
বোঝা যাচ্ছে যে, এই সমাজে অনেকেই আছেন যারা মুক্তমনাদের মুক্তচিন্তার উড়ানে বারবার কাঁটার আঘাত লাগাতে চাইছেন। ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছিল অভিজিৎ রায়, রাজীব হায়দার, ওয়াশিকুর বাবু এবং আরও অনেককে। তসলিমা নাসরিনকে তো তাঁর দেশ থেকে তাড়িয়েই দেওয়া হলো। অনেকে বলছেন, এবার এই দেশও দেখছে মৌলবাদের অসহিষ্ণু রক্তচক্ষু। কিন্তু তারা ভুল কথা বলছেন। এ দেশ অনেক আগেই দেখেছে মৌলবাদের অসহিষ্ণু রক্তচক্ষু। কিন্তু তখন অনেকেই চুপ ছিলেন।
চুপ ছিলেন যখন তসলিমা নাসরিনকে বামপন্থী সরকার পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। চুপ আছেন,যখন তৃণমূল সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দিচ্ছে না। কী জানি—হয়তো মুক্তচিন্তার আড়ালে তাঁরা রাজনীতি করছেন। কিন্তু সবশেষে বলতে চাই—একজন লেখক নিজের মুক্তচিন্তার প্রকাশ করতেই পারেন। এজন্য তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, যেমন গ্রহণযোগ্য নয়–তাঁকে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়া (বস্তুত এটা তো অসহিষ্ণুতার চরম একটা দৃষ্টান্ত), ঠিক সেরকম একজন লেখককে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেওয়াও উচিত নয়। এরকম প্রত্যেকটা ঘটনার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। আমাদের এর বিরুদ্ধে উচ্চস্বরে চিৎকার করা উচিত। অবশ্যই এর বিরুদ্ধে মাঠে নামা উচিত।
সরিষা,করিমগঞ্জ,অসম।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.