আমরা যারা হোস্টেলে থাকি

0

রিদওয়ান মৌ:

আমরা যেসব মেয়ে নিজেদের বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে থাকি, তাদের প্রতি সমাজের এক ধরনের অ্যালার্জি থাকে। হোস্টেলের মেয়েগুলো যেন বাড়ির খেয়ে-পড়ে সুখে থাকা মেয়েগুলোর থেকে একেবারেই আলাদা। সুশিক্ষা অর্জন করে স্বাবলম্বী হওয়াটা প্রতিটা মেয়েরই স্বপ্ন, যা দেখবার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।

আর শিক্ষিত হবার সে উদ্দেশ্য নিয়েই আমাদের হোস্টেলে বা ভার্সিটি হলে থাকতে হয়। কিন্তু সেখানেই বাধে যতো বিপত্তি।শিক্ষিত হয়ে বেরিয়ে আসার আগেই ততোদিনে হোস্টেলে থাকা এসব মেয়ের গায়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা মেয়েবিদ্বেষী ট্যাগ লেগে যায়।

এইতো কিছুদিন আগের ঘটনা, আমার এক ঘনিষ্ট হোস্টেলমেট ছোট বোনের মন খারাপ দেখে তাকে মন খারাপের কারণ জিজ্ঞেস করতেই জানতে পারি, সে সন্ধ্যা ছয়টায় যখন তার কিছু বন্ধু-বান্ধবের সাথে গল্প করছিল, তখন সে শুনতে পায় কিছু ছেলে তাকে নিয়ে আলোচনা করছিল, যার মূল বিষয় ছিল হোস্টেলের মেয়ে, বেয়াড়া হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এই ধরনের মন্তব্যের সুস্পষ্টতা এই যে পুরুষসমাজ কখনোই মেয়েদের গা মেলে স্বাধীনভাবে চলাটাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। এসব যেন পুরুষদের দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা আধিপত্যে আঘাত হেনেছে। তাই হোস্টেলের মেয়ে মানেই বেয়াড়া মেয়ে, এই মন্তব্যকে পূঁজি করে তারা মেয়েদের স্বাধীন চলাফেরাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এ প্রসঙ্গে আমার এক বান্ধবীর এ ধরনের আরো একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরবার মতো। আমরা যারা হোস্টেলে থাকি তারা সবাই কমবেশি জানি যে অধিকাংশ হোস্টেলেই রান্নার কোনোরকম ব্যবস্থা থাকে না, যার কারণে অনেককে বাইরে খেতে হয়। বছর দুয়েক আগে আমার দুই বান্ধবী ছোটো রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল। পরবর্তীতে তারা জানতে পারে, তা দেখে আমাদেরই আরেক বান্ধবীর বাবা যার মেয়ে বাসার খেয়ে-পড়ে সুখে দিন কাটাচ্ছিল, তিনি নাকি মন্তব্য করেছেন, হোস্টেলের বেয়াড়া মেয়েগুলো তো এভাবেই রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাবে। এদের কাছে আর কীইবা আশা করা যায়? অথচ ভদ্রলোক যদি এ মন্তব্য ছুঁড়বার আগে একটি বার নিজের মেয়ে বাড়ির বাইরে থাকলে কী করে দিন কাটাতে হতো তা ভাবতেন, তাহলে হয়তো এই মন্তব্যটাই করতেন না, বা হোস্টেলে থাকা মেয়েদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারতো।

এমনকি হোস্টেল ছেড়ে গেলেও এই ট্যাগ পিছু ছাড়ে না। পাত্রী দেখার সময় পাত্রীর গুণ বিচার করা হয় পাত্রী হোস্টেলে ছিল কী ছিল না সেই প্রশ্নের উত্তরের উপর ভিত্তি করে। মাঝে মাঝে নিজেকে হোস্টেলের মেয়ে ভেবে আতংকিত হই। জীবনের কোনো এক পর্যায়ে গিয়ে যখন অর্জনের ঝুলি খুলে বারান্দায় বসবো, তখন হয়তো ভাববো, বাহ! আমি কত্ত স্মার্ট ছিলাম সে সময়, আমি কত্ত সংগ্রাম করে শিক্ষিত হয়েছি।

পাশাপাশি এই ট্যাগগুলোও মনে পড়বে। এতোক্ষণ যা লিখলাম তা আমাদের অনেকেরই কাহিনী। নতুন কিছুই নয়। তাতে কি? আমাদের এই সমাজ যতই আধুনিকতার ভান করুক না কেন, মানসিকতায় হাজার বছর পিছিয়ে। আর এই হাজার বছরের পঁচে যাওয়া সমাজে সবকিছু মানিয়ে চলার দায়িত্ব শুধু মেয়েদেরই, একার।

লেখাটি ২,২০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.