অত:পর কিছু ‘বাস’ সমাচার

0

সীমা কুণ্ডু:

আমার বড় হয়ে ওঠা অন্যরকম। আমাদের সময়ে গ্রামে যখন মেয়েরা ঘর-স্কুল আর স্কুল-ঘর ছাড়া ভাবতেও পারেনি তখন আমি সাইকেল, বাইক নিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করেছি গ্রামের রাস্তাঘাট, স্কুল কলেজে গিয়েছি সাইকেল, বাইক চালিয়ে। মোটামুটি কিশোর বয়সেই শিখে গিয়েছিলাম কীভাবে নিশানা ধরে ট্রিগার চাপতে হয়, কতটা দূর হতে এয়ারগানের গুলি কাঠবিড়ালির গায়ে লাগে, কীভাবে ঘুষি দিলে প্রতিপক্ষ কাবু হয়, গাছে চড়া, জাল ছোড়া, বড়শি ফেলা, পুকুরে ডুব দিয়ে মাছ ধরা, টং ঘরে বসে বাগান পাহারা দেয়া, এসবের সাথে সাথে হারমোনিয়াম আর কীবোর্ডে কিছু কিছু সারেগামাও বাদ যায়নি

এসব এমনি হয়নি, পারিবারিক ধারাটাই ছিল তেমন। বাবা কাকারা অসম্ভব স্বাধীনতা দিয়ে বড় করেছেন, মা ঠাকুমা চাইতেন এসবের পাশাপাশি টুকটাক ঘরের কাজে যুক্ত থাকি। আমার সেজো কাকা বলতেন, ও যেভাবে বড় হতে চায়, সেভাবেই হোক। ঘরের কাজ করার জন্য আজীবন পড়ে রইলো।

যখন ঘরের বাইরে এলাম তখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, বাঁধনহারা একেবারে। জল টলমল যৌবন, হল বাস, উদ্দাম মানসিকতা, নাছোড়বান্দা মনোভাব হলেও ট্র্যাকে ছিলাম, জীবনের ঘাট-উপঘাট দেখেছি, হেঁটেছি, সাঁতারও কেটেছি, কিন্তু ডুবে যাইনি। কারণ আমি জানতাম কোথায় দাঁড়াতে হয়, কীভাবে দাঁড়াতে হয়, কেন দাঁড়াতে হয়আমার পরিবার এ আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিয়েছিল পূর্ণ আস্থায়।    

বোহেমিয়ান জীবন পছন্দ করতামলাল অথবা নীল টিশার্ট, জিন্স, কেডস আর একটা ব্যাগ পিঠে বাংলার আনাচে-কানাচে মাঠে ঘাটে নদী খালে বিলে হাওরে, পাহাড় সমুদ্রতটে আমার বিচরণ হবেকাজের সুবাদে যখন রংপুর  ছিলাম মূলত সেই সময়টাই আমি নিংড়ে উপভোগ করেছি জীবনআগেই বলেছি সাইকেল আর বাইক ভালো চালাই। অফিসপিয়ন মানিক ছিল আমার চলার সাথী, তার নিজের একটা সাইকেল ছিল, আমার জন্য ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া নিয়ে শুক্র-শনিবার বেরিয়ে পড়তাম, আশেপাশের গ্রাম মাঠ খেত আল-বিল চষে চষে সন্ধ্যায় ফিরতাম।

অফিসের কাজে ঘুরে বেরিয়েছি রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, পার্বতিপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা আরও এদিক সেদিক। রংপুর শহরের প্রায় অলিগলি চষে বেরিয়েছি রিকশায়। সপ্তাহ শেষ করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাসে উঠে চট্টগ্রাম নামতাম শুক্রবার সকালে আবার শনিবার সন্ধ্যায় বাসে উঠে রবিবার সকাল গিয়ে অফিস ধরতাম। আসা যাওয়ার পথে রাস্তায় বাসে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি বরাবর বাসের সামনের আসনে বসা মানুষ, তদুপরি দুটা সিট বুক করে নিতাম নিরাপত্তার খাতিরে। হঠাৎ বাসে কেন উঠলাম? শান্তা মারিয়া’দিই আমাকে বাসে উঠালেন, কৃতজ্ঞতা আপনাকে।

তখন আমি বিয়েশাদি করে মা’ও হয়ে গেছি। পড়ালেখার সুবাদে প্রায় প্রতি মাসেই আমাকে ঢাকা চট্টগ্রাম করতে হতো, তখন আর দুটা সিট নেবার প্রয়োজন মনে করতাম না। সেবার ঢাকা হতে ফিরছি, আমার পাশের সিটে এক লোক বসলো, দেখতে ভদ্র সভ্য। নিজের একটু ছড়িয়ে বসা অভ্যাস হলেও বেশ গুছিয়ে নিয়েই বসলাম। বাস যাত্রাবাড়ী ছাড়তেই লোকটা কুশল জানতে শুরু করলো এই যেমন কোথায় যাবো, কোথায় এসেছি, কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও ভদ্রতার খাতিরে তার প্রশ্নের উত্তর দিলাম, কিছুদূর আসার পরই সে একটু একটু ঘেঁষে বসতে শুরু করলো। আমিও সরে আসি সেও আসে। তারপর সে ঘুমানোর চেষ্টায় বার বার আমার দিকে ঝুঁকে পড়তে লাগলো। আমি এবার বাসের লোককে ডেকে বললা্ম লোকটাকে সরাতেবাসের লোকজন জানতে চাইলো সমস্যা কি, আমি বললামতারা তাকে না সরিয়ে ঠিক করে বসার জন্য বলে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বাস এসে থামলো চৌদ্দগ্রামে। লোকটা হুট করে আমার হাত ধরে বললো, আসেন আমি আপনাকে নামতে সাহায্য করি, আমিও আর দেরী করিনি, হাত আমার ভালোই চলে, কষে দুটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিলাম, মুহূর্তেই দেখলাম পেছন হতে দুটা লোক উঠে দাঁড়ালো, থাপ্পর খাওয়া জন কিছু বলার আগেই উঠে দাঁড়ানো একজন বললো, দুলাভাই, আপনার বদঅভ্যাস আর গেল না।

আসলে এসব দুলাভাইদের বদ অভ্যাস যায় না, যায় শ্যালকদের মান সম্মান। ওরা দুজন আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল। আমি নিরাপদে পৌঁছালাম। বাসায় ফিরে বরকে বলতেই সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল তোমার পায়ে জুতা ছিলোনা!

আরেকটা জানা ঘটনা বলি, কদমতলি হতে বাসে উঠেছে দুই ব্যক্তি, একজনের সাথে পরহেজগার বিবি অন্যজনের সাথে ১০-১২ বছরের ছেলে। বিবি নিয়ে একজন সামনে, পিছনে ছেলে নিয়ে অপরজন কিছুদুর যেতেই পিছন দিক থেকে একটু একটু খোঁচা পেতে শুরু করলো বিবিজান, বরকে ঘটনা জানালো। কর্নেল হাটের ওখানে বাস থামলে সামনের জন ড্রাইভারকে বললো, একটু দাঁড়ান, আমি একটা ফ্লেক্সিকার্ড কিনে আনি তো সে কার্ড এনে যথারীতি বসে রইলো কিছুদুর এসে পিছনের জন নামতে গিয়ে দেখে তার পাঞ্জাবির হাতা বিবির সিটের সাথে আটকে আছে, সে টানাটানি শুরু করলো, ছাড়ে না কিছুতেই

এই ফাঁকে বিবির বর উঠে হাতে রাখা সুপার গ্লু দেখিয়ে বললো, এই দেখ মোবাইল কার্ড নয় এটা আনতে গিয়েছিলাম, পুরাটা ঢেলেছি। এখন হাত ছাড়াতে পারিস না? বাস যাত্রীদের বললো, দেখেন বউকে প্যাকেট করে এনেছি, তারপরও এই অবস্থা, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, আর কীভাবে বের করতে বলেন? অতঃপর বাসের লোকজন মিলে চপেটাঘাত চলতে লাগলো অপরজনের সাথে থাকা ছেলে লজ্জায় কেঁদে বললো, আব্বু, তুমি এইটা কি করলে?

এমন মানুষগুলোর জন্য পথ চলা তো বটেই, ঘরে থাকাও দায়!

লেখাটি ৭২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.