আত্মসম্মানের লড়াই

0

নন্দিতা (ছদ্মনাম):

নিজেকে প্রশ্ন করি, আসলে নারী হিসেবে সব মেনে নেয়াটাই কি আমার ধর্ম? মেনে নিলেই ভাল হয়ে গেলাম আমি, আর যদি মেনে না নেই তবে হাজারো কথা শুনতে হবে আমাকে? আমাকে যারা বড় করেছেন, দায় তাদের উপরও পড়ে। সমাজের গঠনটাই কি এমন যে, সংসারে সব দায়িত্ব কেবল নারীর?

নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই লিখছি। আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ঠিক যেমন, আমি বলছি না সবার ক্ষেত্রে তাই হবে। বিয়ের সময় আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা, আপনার পারিবারিক পরিচয়, আপনার পেশা, মা-বাবা কিংবা আত্মীয় স্বজনের পরিচয়টা কেন দেখা হয় বলতে পারেন? কেননা আমরা নিশ্চিত হতে চাই যাকে বাড়িতে আনতে যাচ্ছি, সে নতুন পরিবারে খাপ খাওয়ানোর যোগ্য কি না। অথবা মানুষের কাছে আমরা বড়াই করে বলতে চাই যে, দেখ! এমন একটা পরিবার থেকে মেয়ে এনেছি। এরপর যথারীতি শুরু হয় বিয়ের আয়োজন। একটি মেয়ে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে নতুন বউ হয়ে ঘরে আসে। মেয়েটিকে খুব সাজিয়ে ঘরে তোলা হয়। কিন্তু ঠিক তার পরদিন থেকে নিক্তি নিয়ে মাপতে বসা হয় তার সব দিক নিয়ে। হাজারো আশা থাকে নতুন বউটিকে ঘিরে। কিন্তু নতুন বউটির আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো এইসবের মাঝে কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

হ্যাঁ, এতোক্ষণ যে পটভূমিটি তুলে ধরলাম সেখানের সেই নতুন বউটি আমি। মা-বাবা অনেক স্বপ্ন নিয়ে অনেক আদরে বড় করেছেন আমাকে। লেখাপড়া শিখিয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। এমনভাবে মানুষ করেছেন যাতে সমাজে চলতে আমার অসুবিধা না হয়। বলছি না আমি সর্বগুণে গুণান্বিতা, কিন্তু খুব ভালো ভাবে নিজের মত করে বেচে থাকবার শিক্ষাটা তাঁরা আমাকে দিয়েছেন। আজ সেই কারণে আমি সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ।

বিয়ের আগে থেকেই আমি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে আসছি এবং আমার নিজের একটা পরিচয় আছে। খুব ভাল লাগতো যখন আমার মা বাবাকে দেখতাম আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করতেন। কিন্তু নতুন পরিবারে আসবার পর থেকে দেখলাম আমার এসব যোগ্যতা গৌণ হয়ে পড়লো, আর মুখ্য হয়ে উঠলো আমি সংসারের খুঁটিনাটি কী পারি আর কী পারি না। এরপর আমার মা-বাবাকে শুনতে হলো নানান কথা। তারা আমাকে কিছুই শিখায়নি ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই সবকিছুতে আমার জীবনসঙ্গীর নির্লিপ্ত ভূমিকা আমাকে আরও আহত করেছে। সবকিছু বোঝা সত্ত্বেও আমার আত্মসম্মানের অবমাননা সে উপলদ্ধি করেও আমাকে রক্ষা করতে পারছে না। কেননা সে কিছুই বলতে পারবে না। এমন হাজারো জটিলতা আমাকে মানসিকভাবে অত্যন্ত আহত করে যাচ্ছে। জানি যতদিন এখানে থাকবো, আমাকে লড়াই করে যেতেই হবে।

এই প্লাটফর্মে কথাগুলো বলছি এই কারণে যে, আমার মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যারা যাচ্ছেন তারা যেন ভাবতে পারি যে, হ্যাঁ, নানান প্রতিকূলতা থাকলেও আমরা হার মানবো না। আত্মসম্মানের লড়াইটা চালিয়ে যেতেই হবে। হয়তো কিছু মানুষের কাছে আমরা অপ্রিয় থেকেই যাবো, কিন্তু সমাজে নিজের পরিচয়টাকে আরও দৃঢ় করতে হবে। কেননা আমি দেখেছি, অভিমান করে লাভ হয় না। যারা আপনাকে কিংবা আমাকে মানসিক দিক দিয়ে আহত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, জয় তাদেরই হবে। আমি যখন অভিমানে চোখের পানি ফেলছি, কিছু মানুষ মজা পাচ্ছে। কেননা, আপনি তাদের জন্য আপনার জীবন দিয়ে দিলেও কিছু মানুষকে আপনি কখনোই সন্তুষ্ট করতে পারবেন না। কেননা, আমার মত অনেকেই এইরকম পরিস্থিতিতে থেকে চট করে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। কেননা আমাদের সিস্টেমটাই এমন।

সমাজে যখন বলা হচ্ছে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার, তখন সেই কথাটাকে কেবল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখে চর্চা করা হচ্ছে। কিন্তু পারিবারিক জীবনে তার প্রতিফলন কি আদৌ দেখা যাচ্ছে? একই পরিবারে মেয়ে ও পুত্রবধুকে  কি এক দৃষ্টিতে দেখতে পারছি আমরা? কাজেই সেখানে সমান অধিকারের চর্চা করার বিষয়টি এখনও সুদূরপ্রসারী।

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.