গণপরিবহন আইনে ‘শাস্তির বিধান’ কতোটা নারীবান্ধব!

0

মাহফুজা জেসমিন:

সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক ক’টা আইন আছে। সেই আইন আমজনতা জানুক আর নাই জানুক প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে তার ব্যবহার হয় বৈকি! আইন করার আগে আইনের ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো নীতিনির্ধারকগণ যাচাই করে নেন বলেই বিশ্বাস করি। তবে বাস্তব অবস্থা দেখে প্রশ্ন জাগে, যার বা যাঁদের জন্য আইন, তা কতোটা কাজে লাগছে তাদের?

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে নারীর প্রতি যথাযথ মর্যাদা দেয়া আছে। আমার জানা মতে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে প্রায় দুই ডজন আইন এবং নীতিমালা আছে। তা সত্বেও নারী ও শিশুরা এদেশে সমাজে ও পরিবারে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। নির্যাতিত হচ্ছে। ধর্ষিত হচ্ছে। এরপরও  নারীর জন্য কোন নতুন আইন হচ্ছে জানলেই কৌতুহলী হয়ে উঠি। আশাবাদী হয়ে উঠি। হয়তো এই আইন বা নীতিমালাটি আমাদের নতুন কোন আশার বার্তা শোনাবে।  

কিন্তু গণপরিবহনে নারীদের যাতায়াত সহজতর করতে আইন হচ্ছে; এই আইনটির কথা শোনার পর থেকে গণপরিবহনে নারীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করে শিউরে উঠলাম। মনে হলো, আর বুঝি গণপরিবহনে চেপে কোথাও যাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো!

আমি প্রতিদিন অন্তত: একবার বাসে উঠি। ধানমন্ডি থেকে পল্টন। সকাল আটটার বাস। সবারই তাড়া থাকে অফিসে যাওয়ার। কলেজে বা স্কুলে যাওয়ার। কাজেই বাসে বসার জায়গা তো দূরে থাক, দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না। আমার থাকে বাসায় ফেরার তাড়া। অনেকটা পথ। ইচ্ছে করলে রিক্সায় বা অটোরিক্সায় আসতে পারি। এমনকি হেঁটেও ফিরতে পারি। কিন্তু আমি বাসেই উঠি। সকালের বাসে নারী জীবনের দীপ্তি আমি দেখতে পাই, আজকাল মনে হয় এটি দেখতে পারাটাও একটা অভিজ্ঞতা। একটি আনন্দ। একটি সমৃদ্ধি।

নারীদের জন্য সংরক্ষিত নয়টি আসন ভরে গেলে পুরুষ সহযাত্রীরা মনে করেন আর নারী যাত্রী না নেয়াই ভালো। অনেক বাসের কন্ডাক্টর/হেলপার নারী যাত্রীদের তুলতেই চান না। গেটে পা রাখার আগেই ‘মহিলা সিট নাই। মহিলা উঠবেন না’ বলে চিৎকার করতে থাকে। আর সহযাত্রীদের একটা বড় অংশ এখনো মনে করেন যে, নারীরা অকারণেই ঘরের বের হন। তারা গাড়িতে সিট ছেড়ে তো দেবেনই না, ওঠার সময় পথ ছেড়ে দাঁড়াবেনও না। নামার সময়ও পথ ছাড়বেন না। ভাবটা এমন, ‘সমান অধিকার তো দিয়েছি। এখন পারলে ঠেলাঠেলি করে যাও দেখি।’ আবার পেছনের দিকটা ফাঁকা থাকলেও সামনের সংরক্ষিত আসনের পাশে দাঁড়ানোর ঠেলাঠেলি তো রীতিমতো হাস্যকর।

তখন আবার বিপরীত দৃশ্য। হেলপার বলছেন, ‘ভাই আপনারা পেছনে যান, পেছনে জায়গা আছে। মহিলাদের জায়গা দেন।’ তখন নারীদের জন্য সংরক্ষিত তিন/চার ফিট জায়গাও ছেড়ে দিতে সে যে কী কষ্ট! এই শহরে যারা প্রতিদিন বাসে ওঠেন তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা নিত্যকার।

কিন্তু বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলগামী মা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, অফিসগামী নারী এবং বিশেষ করে যাঁরা পোশাক শিল্পে কাজ করেন, তাদের প্রতিদিনের এই অফিস যাওয়া তো রীতিমতো নিজের অধিকারের লড়াই। স্বভাবত:ই পোশাক শিল্প শ্রমিক নারীদের দলটা বড় থাকে সকাল বেলা। ওঁদের সবার সকাল আটটার মধ্যেই অফিসে পৌঁছাতে হবে। কিন্তু বাস তখন জায়গায় জায়গায় ভিড়ে এক/দুইজন যাত্রীর জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। ভেতরে ঠাসাঠাসি যাত্রী তবুও।    

গত সপ্তাহে একেবারে উল্টো ছবি দেখলাম। মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিলগামী সিটি বাসের প্রায় অর্ধেক সিটে নারীরা বসেছেন। নারী-পুরুষ মিলিয়ে বসেছেন। মনে হলো একটি সহজ ও স্বাভাবিক সমাজের ছবি। মনটা ভরে উঠলো। আমি দাঁড়িয়েছিলাম। দাঁড়িয়েছিলেন আরো অনেক নারী-পুরুষ। হঠাৎই মনে হলো, এই ছবিটিই তো আজ আমাদের কাম্য। সমাজের শতভাগ নারী-পুরুষ একসাথে কাজে যাবেন, ঘরে ফিরবেন, পথ চলবেন। এটিই তো ২০৩০ সালের উন্নত বাংলাদেশের কাংখিত প্রতিচ্ছবি।

কিন্তুু গণপরিবহনে “নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনো যাত্রী উঠলে এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা” আদায়ের বিধান রেখে পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নতুন যে আইনের খসড়া করেছে তা শুনে শুধু চমকিতই হয়নি। রীতিমতো আঁতকে উঠেছি!

এতো নারীর জন্য রক্ষাকবচ নয়! বরং এ ধরনের বিধান নারীর প্রতি প্রতিহিংসাই বাড়াবে। এমন একটা সময় ছিলো নারী যাত্রীদের নির্ধারিত আসনের বাইরে বসতে দেয়া হতো না। যারা কোনো পুরুষ সহযাত্রীর  সঙ্গী হয়ে উঠতেন তারাই সাহস দেখিয়ে পেছনের বা মাঝখানের সারিতে বসতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে গণপরিবহনে নারীদের যাতায়াত বাড়ার সাথে সাথে নির্ধারিত আসনে আর তাদের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা অন্য পুরুষের পাশে বসে যেমন যাতায়াত করছেন, আবার দাঁড়িয়েও যাচ্ছেন। যারা অসংবেদনশীল, অসহিষ্ণু তাদের মধ্যেই প্রতিহিংসামূলক আচরণ চোখে পড়ে। তবে সহযোগিতার হাতও কম নয়।

কিন্তু এই আইন হলে তো, এক বাসে দুটি পক্ষ হয়ে উঠবে। সংরক্ষিত আসনগুলো ভরে গেলে আর নারীদের বসতেই দেয়া হবে না। তখন বলা হবে, আপনাদের সিট তো সংরক্ষিত সেখানে আমরা বসতে পারবো না। তাই আমরা কেন সিট ছেড়ে দেবো?

সংসার সমরে নারীর যে প্রতি মুহূর্তের যুদ্ধ, ঘরে এবং বাইরে নিজেকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করার সংগ্রাম এর মধ্যে নতুন এই গণপরিবহন আইনের বিশেষ বিধান তাদের জন্য আরেক যুদ্ধক্ষেত্র রচনা করবে। যেখানে তার প্রতিদিনের সকালটা হয়ে উঠবে বিভীষিকাময়। বিকেলটা হয়ে উঠবে বিষাদময়।

যারা আইন করেছেন তাঁরা অত্যন্ত বিজ্ঞজন। কিন্তু তাঁরা যদি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো বিবেচনা করে এমন একটি বিধান দিতেন যাতে আইনের প্রভাবে সহযাত্রীর প্রতি প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংবেদনশীল আচরণ জন্ম দেয়। তাতে বরং সমাজের কিছুটা লাভ হতো।

বলা হচ্ছে, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। এর ওপর রয়েছে শিশু, প্রতিবন্ধী এবং বৃদ্ধ। সব মিলিয়ে যদি ৭০ ভাগও হয়ে তাহলে এই ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত হবে বাসের ১২ টি সিট? আর ৩০ ভাগের জন্য পুরো বাসটা! তার মানে কি এই দাঁড়ায় না যে, এই সংরক্ষিত আসনের নামে নারীর সুবিধা কমানোই হচ্ছে। সুযোগ বাড়ছে না কিছুই।   

এই নতুন আইনের খসড়ায় সম্মতিও দিয়েছেন মন্ত্রিসভা! দেশের নীতি নির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ করতে চাই, এমন একটি আইন করার আগে আসলে প্রতিদিন যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন সেইসব নারী-পুরুষের সাথে আলোচনা করুন। আমার বিশ্বাস তারা এর বিপক্ষেই মত দেবেন। নারীদের গণপরিবহনে যাতায়াতের অন্তরায় কি সংরক্ষিত আসন? না দৃষ্টিভঙ্গি? বাসের চালক এবং সহকারীরা যতক্ষণ পর্যন্ত বাসের ভেতরে একজন যাত্রীও দাঁড়ানোর জায়গা থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত যাত্রী তুলতে থাকেন।

অন্যদিকে কারো ক্লাশের দেরি, কারো অফিসের দেরি, কারো বা সকাল বেলা পরীক্ষার দেরি হচ্ছে, হাজার অনুরোধ সত্বেও সে কথাটি শোনেন না তারা। আছে ভাড়া নিয়ে বাড়াবাড়ি। ভাড়া নির্ধারিত থাকলেও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে। টিকিট সিস্টেম না থাকায় একই যাত্রীর কাছে কয়েকবার ভাড়া চাইতে আসে। এছাড়া ভীড় বাসে সন্দেহবশত: যাত্রীকে ভাড়া না দেয়ার অভিযোগে চোর বলার দৃশ্য আমারই দেখা।  

এর অর্থ হলো, পর্যাপ্ত গণপরিবহন চাই। উন্নত সেবা চাই। প্রতিটি গণপরিবহনে ভাড়ার হার টানানো থাকবে। গাড়িতে কোন দাঁড়ানো যাত্রী নেয়া হবে না। গাড়ি যেখানে-সেখানে দাঁড়াতে পারবে না। এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে সচেষ্ট থাকবে। অর্থাৎ রাস্তায় যদি পর্যাপ্ত বাস থাকে, বাস ছাড়ার এবং পৌঁছানোর সময় যদি ঠিক থাকে, আর চালক আর হেলপাররা যদি দাঁড়ানো যাত্রি না নেন, তাহলে তো সংরক্ষিত আসনের কোন দরকারই থাকে না। অর্থাৎ গণপরিবহনে সেবার মান বাড়াতে হবে। এধরনের আইন কোন সমাধান নয়।

আমাদের ছেলেবেলায় বাসের এতো শ্রেণী বিভাজন ছিলো না। সব বাসেই মোটামুটি ধরনের সিট থাকতো। সিটিং বাস। গেইট লক। এসি বাস এসব ছিলো না। আমি গ্রামে বড় হওয়ার বদৌলতে শহুরে জীবনের সংকটগুলো প্রতিদিন দেখতে হয়নি। কিন্তু মায়ের স্কুলের কাজে মা যখন ঢাকায় আসতেন বা নানা বাড়ি যেতেন তখন নগরজীবন দেখার সুযোগ পেতাম। তখন বাসে মহিলা সিট ছিলো না। তারা জায়গা পেতেন ইঞ্জিন কভারের পাশে সবচেয়ে গরম ও অস্বাস্থ্যকর সিটে।

তখন থেকেই মা শিখিয়েছেন ভিড় বাসে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। শিশু বা মেয়ে হিসেবে বিশেষ সুবিধা না নিয়ে কীভাবে পথ চলতে হয়। তখনও কোন নারী যাত্রী বাসে দাঁড়িয়ে থাকলে পুরুষ সহযাত্রীরা সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন। বাচ্চাদের জায়গা করে দিতেন।     

১৯৯২ সালে যখন প্রথম ঢাকায় আসি তখন ছিলো মুড়ির টিন। তখন ঢাকার মানুষ ছিলো এখনকার অর্ধেকের কম। বাসও কম ছিলো। রিক্সাও কম ছিলো। মেয়েদের ঘর থেকে বেরুনোর প্রয়োজনও কম ছিলো। মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত আসন ছিলো মাত্র তিনটি। কিন্তু তখনও বাসে উঠতে এতোটা ভাবতে হতো না। কিন্তু এখন ভাবতে হয়। দুই কারণে। এক. জনসংখ্যার চাপ। দুই. মানুষের সহিষ্ণুতার অভাব। সহযাত্রীরা ভাবেন সম অধিকার তো দিয়েছি, আবার নারীর জন্য সিট ছেড়ে দেবো কেন? সম অধিকার যদি চাও তাহলে দাঁড়িয়েও যেতে পারবে।

আর গণপরিবহন আইনের এই ‘বিশেষ বিধান’ করা হলে নারী-পুরুষ একে-অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৪৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.