বাসে ‘মহিলা আসন’ নয়, দরকার ‘বেতের বাড়ি’

শান্তা মারিয়া:

আইন হয়েছে যে, বাসের ‘মহিলা সিটে’ পুরুষরা বসলে জরিমানা হবে। কিন্তু যারা বাসে নিয়মিত যাতায়াত করেন তারা জানেন যে, মহিলা সিট পাওয়া না পাওয়া বাসে যাতায়াতের প্রধান সমস্যা নয়।

বাসে ওঠা, নামা, বসা, দাঁড়ানো ইত্যাদি অবস্থায় একটি নারী কতধরনের হয়রানির শিকার হন সেটি বিস্তারিত লিখলে কয়েক হাজার শব্দ লাগবে। পাশাপাশি বিস্তারিত বর্ণনা দিলে পর্নোগ্রাফির আইনে পড়তে হবে। নারী বাসযাত্রী মাত্রই জানেন তাকে ওঠানো ও নামানোর সময় কীভাবে, কোন জায়গায় স্পর্শ করা হয়, কিভাবে হয়রানি করা হয়। যদিও তাকে ‘ওঠানো’ ও ‘নামানো’র কোনো দরকারই নেই। তিনি নিজেই যথেষ্ট সক্ষম।

দরজার কাছে জটলা করে থাকা পুরুষদের হাত কোথায় কিভাবে লাগে সেই বর্ণনারও কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। ‘মহিলা সিট’ বলে যেখানে মেয়েদের বসানো হয় সেটি হলো ইঞ্জিনের উপর একটি গরম জায়গা। আমি সেখানে না বসে বাসের ভিতর দিকে যেতে চাইলে আমাকে অনেকবারই যেতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, ওদিকে পুরুষ সিট। ‘গরম’ সিটে চারজন মহিলা কোনোভাবে বসতে পারেন। অধিকাংশ বাসে ওই চারজন বা পাঁচজনের পর আর নারীদের উঠতে দেওয়া হয় না। বলা হয়, মহিলা সিট খালি নাই। যদি কখনও ভিতরের দিকে সিট পাই এবং আমি একা থাকি, তাহলে আরেক সমস্যা।

একটা ঘটনা বলি। বাংলা মোটর থেকে মহাখালি যাবো। মোড় থেকে বাসে উঠলাম। বাসটায় বেশ কয়েকটা খালি সিট ছিল। সামনের দিকের একটি সিটে আমি বসলাম। আমার পাশের সিটে এক মধ্যবয়সী রোগা লোক উঠলো। লোকটি রোগা বলে নিজের সিটই ভরতে পারছে না। তারপরও আমার সিটের দিকে চেপে বসতে চাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর এতেও মন না ভরায় সে হাত-পা নেড়ে রীতিমতো আড়মোড়া ভাঙা এবং ব্যায়াম শুরু করলো। এবার বলতে বাধ্য হলাম, ‘বাড়িতে গিয়ে ব্যায়াম করেন, এটা বাস’।  লোকটি ঝগড়া শুরু করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মহাখালি এসে যাওয়ায় আমি নেমে পড়াতে সেই সুযোগ সে পায়নি।

ভুক্তভোগী নারীমাত্রই জানেন বাসে কোনো রকম হয়রানির প্রতিবাদ করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উল্টো বিপদে পড়তে হয়। বাসের অনেকগুলো অ-মানুষ এক হয়ে মেয়েটির বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকে। প্রথম কথা হলো ‘এতোই যদি শরীরে লাগে, তাহলে মেয়ে হয়ে বাসে ওঠে কেন?’। দ্বিতীয় হলো ‘বেয়াদপ মহিলা’‘এগুলো খারাপ মেয়ে’ ইত্যাদি মন্তব্য। এসব কথা যখন চলতে থাকে তখন বাসের অন্য যাত্রীরা চুপ করে থাকে। এমনকি অন্য নারী যাত্রীরাও আক্রান্ত নারীটির পক্ষ নেয় না। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় আমি নিজের জীবন বাঁচাতে বাস থেকে নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছি।

আমি কিন্তু সিট পাওয়ার জন্য বা বসে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল নই। দাঁড়িয়ে যাওয়ার বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার শারীরিক সক্ষমতা আমার কোনো পুরুষের চেয়ে কম নেই।

বেইজিং এ ভীষণ ভিড়ের মধ্যেও আমি বাসে এবং সাবওয়েতে উঠেছি। সেখানে নারী- পুরুষ সকলের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করেই উঠতে হয়েছে, সাবওয়েতে সিট না পেলে দাঁড়িয়েও যেতে হয়েছে। কিন্তু কখনও আমাকে বা অন্য কোনো নারীকে কেউ অশালীনভাবে স্পর্শ করছে, ‘বিশেষ ঠেলা ধাক্কা’ দিচ্ছে এমনটি দেখিনি, বা অন্য কারও কাছ থেকে শুনিনি।

চীনে দেখেছি সাবওয়েতে প্রতিটি কক্ষে কয়েকটি হলুদ রঙ করা সিট থাকে। সেটিতে সবাই বসতে পারে। কিন্তু যদি সিনিয়র সিটিজেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী নারী, শিশুসহ নারী বা কোনো শিশু ওঠে, তাহলে অন্যরা তাদের সেই হলুদ সিটগুলো ছেড়ে দেয়। কিন্তু সুস্থ, স্বাভাবিক, তরুণী বা মধ্যবয়সী কর্মক্ষম নারী-পুরুষের জন্য কেউ সিট ছেড়ে দেয় না। সিট ছেড়ে দেয় না বটে, তবে অশালীন ঠেলা, ধাক্কা যৌন হয়রানি কোনোটাই করে না।

চীনা পুরুষদের এতো ‘ভদ্র’ হয়ে যাবার কারণ হলো কঠোর আইন। সেখানে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন রয়েছে। যদি এই আইনে কারও বিরুদ্ধে কোনোদিন অভিযোগ ওঠে, তাহলে ‘খবর আছে’। ওই পুরুষের ক্যারিয়ার শেষ। তার প্রোফাইলে কলংক পড়ে যাবে। ফলে চাকরি, লেখাপড়া সবকিছুতেই সে ‘অচ্ছুত’ হয়ে যাবে। সে ভালো চাকরি পাবে না, ছাত্র হলে কোথাও ভর্তি হতে পারবে না, ইত্যাদি। কে আর চায় নারীকে হয়রানি করে নিজের ক্যারিয়ারের বারোটা বাজাতে? তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই তাদের নারী-পুরুষ সব মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার শিক্ষা দেওয়া হয়।

আমাদের দেশেও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর আইন ও সে আইনের বাস্তব প্রয়োগ দরকার। মহিলা সিটের চেয়ে বেশি জরুরি হলো, বাসে যেন আমাকে উঠতে দেওয়া হয়। নারী বলে যেন বিশেষ ঠেলা ধাক্কা না দেওয়া হয়। আমি দাঁড়িয়ে যেতে রাজি আছি। ভিড়ের সাথে লড়াই করতেও রাজি আছি। আমি দুর্বলও নই, ডিজএবলও নই। বিশেষ সুবিধাভোগী হওয়ারও কোনো শখ আমার নেই। আমি সমঅধিকার চাই। কিন্তু কেবল নারী বলেই আমাকে অযথা যৌন হয়রানি করা হবে, অযথা বিশেষভাবে ধাক্কা দেওয়া হবে, শরীরে হাত দেবে, সেটা আমি মানতে রাজি নই। আর প্রতিবাদ করতে গেলে বাসের সব পুরুষ একজোট হয়ে আমাকে গালাগাল করবে, সেটাও আমি মানতে রাজি নই।

আমাদের দেশে নারী-বিরোধী একটা মনোভাব তৈরি হয়েছে পুরুষদের মধ্যে। যেকোনো ছুতায় নারীদের গালাগাল করা, নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করা এবং একজোট হয়ে নারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো পথচলতি সাধারণ মানুষের একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিকশাচালক, বাসচালক, হকার থেকে শুরু করে ছোট কর্মচারী, ছোট চাকুরে এমনকি ভিক্ষুকদের মধ্যেও এই প্রবণতা রয়েছে। রয়েছে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যেও। একজন নারীকে দেখলে অশালীন মন্তব্য করা, তার গায়ে হাত দেওয়া, তাকে যে কোনোভাবে হোক হয়রানি করতে পারলে যেন বিরাট সুখ পায় এরা।

এদের জন্য দরকার ‘বেতের বাড়ি’ অর্থাৎ কঠোর নারীবান্ধব আইন। এই ‘বেতের বাড়ি’ সব জায়গায় সময়মতো পড়লেই কেবল এই প্রবণতা বন্ধ হবে।  ছোটবেলা থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটা মানুষকে সম্মান করতে যেন শেখে এবং অসম্মান করলে প্রতিফল টের পায়।  

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.