লুকানো ডায়েরি থেকে- ১৫

0

চেনা অপরিচিতা:

সেদিনটা অন্য সব দিনের মতোই ছিল। যথারীতি অফিস গেলাম। হঠাৎ বহু বছর পর আমার প্রথম প্রেম আমাকে ফোন করলো। কেন করলো? এটা কি বিধাতার আমাকে আগাম সান্ত্বনা দেওয়ার কিছু একটা ছিল? ওর সাথে কথা বলার পর ফোন পেলাম। আমার মাকে যে মেয়েটি দেখভাল করছে সে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করলো। বললো, আম্মার অবস্থা ভালো না। জলদি আসতে বললো।  আমি আমার উর্ধ্বতনকে বলে বেরিয়ে পড়লাম।

পথে অনেক ট্র্যাফিক জ্যাম ছিল। বিখ্যাত একটি স্কুলের পাশ দিয়ে যেতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় ওখানেই ব্যয় হলো। আমার বাবা বেশ ক’বার ফোন করলেন তাড়াতাড়ি আসতে। তার গলা ছিল কান্নাভেজা। বুঝলাম, এভাবে বসে থাকলে চলবে না। মাঝপথে রিকশা ছেড়ে দৌড়াতে লাগলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন মায়ের কেবিনে পৌঁছলাম তখন যে দৃশ্য দেখলাম, তা কখনও দেখতে হবে ভাবিনি।

আম্মার পেটটা ফুলে আকাশ ছুঁতে চাইছে। তার নাকে নল ঢোকানো। অচেতনের মতো। কেবিন ডাক্তার নার্সে ভর্তি। আমার বাবা কেবিনের পাশে বসে কাঁদছে। আমি কেবিনে গিয়ে ডাক্তারদের সাথে কথা বললাম। যেটা জানলাম সেটা হলো, পেটে কলন্সকপি করানোর জন্য যে স্যালাইন বা ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, তার ফলে পেটে গ্যাস ফর্ম করেছে এবং আম্মার যে শারীরিক কন্ডিশন তাতে অপারেশন করে ঐ ফোলা পেট কমানো সম্ভব না। (একটা সত্যি কথা বলতে চাই, তথ্যে কিছু ভুল থাকতে পারে, কারণ ভয়াবহ এই কষ্টের কথা আমি ভুলে থাকতে চেষ্টা করি। তাই তথ্যের সবটা আমার মনে নেই)।

আমি কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে ডাক্তারদের বললাম, “আমার মাকে বাঁচান, প্লিজ।“ ডাক্তাররা আমাকে কেবিন থেকে বের করে দিল আর বললো, “পুরুষ অ্যাটেনডেন্ট কই?” ওরা পরে জানালো, আম্মাকে লাইফ সাপোর্ট দিতে হবে, সেটা ওদের হাসপাতালে নেই।

আমি আমার বাবার পাশে এসে বললাম, “আমার ব্যাঙ্কে এখন ৮৯ হাজার টাকা আছে, চলো, আম্মাকে নিয়ে …(একটি বড় হাসপাতাল) হাসপাতালে যাই। কিন্তু বাবা বললো, সেটা অনেক দূর।

ওরা যে হাসপাতালের কথা বললো, ওখানেই আম্বুলেন্সে করে আমরা রওনা দিলাম। তার আগে, এক ডাক্তার আমায় ডেকে বললো, “ওনার ব্লাড গ্রুপ রেয়ার তো, আমাদের ব্লাড ব্যাংক থেকে ব্লাড নিয়ে যান। আমি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমার ব্লাড গ্রুপ এক।“ ডাক্তার অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আরেক  ডাক্তারকে বললো, “দেখছেন! আর আমরা ব্লাড খুঁজি।“

অপমান নতুন করে আস্বাদনের মুহূর্তে আমি নেই। আমার মাকে যে করে হোক বাঁচাতে হবে।

এ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর সময় সবাই তাকিয়ে থাকে আমার মায়ের দিকে, আমি ধমকে উঠি। আমার মাকে এভাবে দেখবে কেন ওরা? আমার মা বড় সুন্দর। তাকে এই অসুস্থ অবস্থায় কেন দেখবে পৃথিবীর মানুষ! এতো কিসের কৌতূহল ওদের?

আমি এম্বুলেন্সের সামনে বসি। পেছনে আমার বাবা আমার মাকে নিয়ে বসে। খুব বৃষ্টি ছিল সেদিন। বৃষ্টির কারণেই হোক, আর যে কারণেই হোক, গাড়ি এগোতেই পারছিল না। আমি পাগলের মতো হাত বাড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার জন্য জায়গা চাচ্ছিলাম। কিন্তু কারো কোনো সাহায্য পাইনি। ট্রাফিক পুলিশ সেদিন নির্বিকার ছিল। অ্যাম্বুলেন্সটার ছাদ হয়তো ফুটো ছিল। সেখান থেকে আমার মায়ের বুকে পানি জমছিল। আমি মাকে সারা পথ অভয় দিয়ে আসছিলাম।

বারবার বলছিলাম, “আম্মা, আরেকটু সহ্য করো…” আমার মায়ের চোখে জল জমছিল। কেন বলতে পারবো না। ছাদ থেকে পানি পরা ঠেকাতে কাগজ দিয়ে দিলাম বুকের উপর, চোখের জল মুছে দিলাম। তারপর যখন সেই আরেক হাসপাতালের কাছাকাছি যেতে পারলাম, দেখলাম, আমার মায়ের চোখের জ্যোতি কেমন ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। আমি ভয়ংকর আশংকা বুক থেকে ঠেলে ফেললাম। ভাববো না এমন সর্বনেশে ভাবনা। আমি যার এতো ইবাদত করি সে আমাকে এতো কষ্ট দিতে পারে না।

অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে ঢুকতেই আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে দিশেহারার মতো ইমারজেন্সির খোঁজে গিয়ে ডাক্তারকে যা বলার বললাম, ডাক্তার আমার অবস্থা দেখে আমাকে বসতে বললেন। আমার বুক কাঁপছিল। ওরা ওদের ডাক্তারি ভাষায় কী যেন “পেশেন্ট আম্বু করছে …এই সব বলছিল। আর আমি ভাবছিলাম, এটা কি ভয়ঙ্কর কোন ইঙ্গিত? আমি জানতে চাই না।

আইসিইউ’তে আম্মাকে ঢোকানোর একটু পরই বের করে আনলো। ওদের একজন স্টাফ আমাকে ডেকে বললো, “ডাক্তার সাহেব ডাকে।“ আমি বললাম, “বের করে আনলেন কেন?” ডাক্তার মাথানিচু করে বললেন, “আসলে উনি এখানে আনার আগেই এক্সপায়ার করেছেন।“ আমি আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমাদের দুজনেরই সেই মুহূর্তে দুজনের প্রয়োজন ছিল। আমি আমার নিথর মায়ের কাছে গিয়ে তার শ্লেষ্মা বেরোনো মুখের দিকে তাকালাম।

আমার মা বড় সুন্দর। তাকে এভাবে দেখবো কখনও ভাবিনি। আমি তখন সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পরা মানুষ। আমার ভেতরটা কাটা মুরগির মতো জ্বলে পুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আজ আর কিছুই ঢাকার নেই। আমি করিডরের মেঝেতে বসে পড়ে কাঁদি। চিৎকার করে কাঁদি। আহ! যন্ত্রণা আরও বাড়ে। ওরা আম্মাকে নিচে নামায় লিফটে। নিচে গিয়ে আমি আর পারি না, চিৎকার করি বাবার উদ্দেশ্যে, “এতো জিদ আপনাদের, এতো জিদ! আমার মা’টাকে মেরে ফেললেন!“

যাকে আদরে তুই বলতাম, তার সাথে যোজন দূরত্বে সম্পর্ক আপনি হয়ে গেছে। আমার খালা আমাকে থামতে বলে, আমি থামি না। এতদিন তো চুপ করেই ছিলাম। আজ আমার কিছু পাওয়ার নেই, আমি সব হারিয়েছি। যে আশায় এতোদিন ছিলাম, আমার মা আমাকে একদিন সব কিছুসহ বুকে টেনে নেবে, আমার সংসার দেখতে আসবে, আমার বাচ্চা মানুষ হবে আমার মায়ের কোলে, রাস্তায় কুচি করা শাড়ির সাথে হাঁটার জুতো পরা কাউকে দেখলে আমার মায়ের কথা বুকের ভেতর আকুলি-বিকুলি করে ওঠা, শুধু মাকে দেখার জন্য অপমান লজ্জা হলেও বাড়ি যাওয়া… সবকিছু শেষ হয়ে গেল।

আমি হাসপাতালের বাইরে একটা থামের পাশে বসে হাত-পা ছড়িয়ে রাস্তার একটা নিঃস্ব মেয়ের মতো কাঁদতে লাগলাম। আমার কান্নায় কারও কিছু যাবে আসবে না। পৃথিবী চলবে তার নিজস্ব নিয়মে।

(চলবে… )

লেখাটি ৬,৯৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.