জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় চাই সচেতন অংশগ্রহণ

লীনা পারভীন:

 “জঙ্গিবাদ” বর্তমানে বিশ্বজুড়ে খুব পপুলার একটা চ্যাপ্টার। তাই এই চ্যাপ্টারকে কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ রেখে পড়তে গেলে পাস মার্কস আসবে না। সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির যে আধিপত্য শুরু হয়েছিলো সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতন এবং পরবর্তীতে অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতনের মধ্য দিয়ে, সেই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলেই জন্ম নিয়েছে বিশ্বব্যাপী এই সন্ত্রাস।

বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি সব জায়গাতেই একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছিলো সমাজতন্ত্রের পতনের পর। সেই ভারসাম্যহীনতার রাজনীতি সারাবিশ্বকে ব্যস্ত রাখার জন্য অস্ত্র হিসাবে বেছে নিয়েছে ধর্মকে। তাই আজকের এই বিশ্বব্যাপী অস্থিরতাকে বুঝতে গেলে একে বিশ্লেষণ করতে হবে রাজনৈতিক দুনিয়ায় গিয়ে। যুগ যুগ ধরেই ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবেই ব্যবহার করেছে শক্তিশালী গোষ্ঠী। কারণ ধর্ম যখন বর্ম হয়ে সামনে আসে তখন ধর্মপ্রাণ মানুষ সে বর্মের সামনে নিজেক সমর্পণ করে হাসতে হাসতে।

পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলেও সেই বৈশ্বিক আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশ বাদ যায়নি। এই জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। তাই এর মোকাবিলার জন্য হয়তো সরকার সবদিক থেকে সুসংগঠিত না থাকলেও মোকাবিলা করে যাচ্ছে সাহসের সাথে।

সরকার এখনো কেন জঙ্গিবাদকে অস্বীকার করছে বলে আমাদের অনেকেই সরকারের পিণ্ডি চটকাচ্ছেন। তাদের টার্গেট কি সরকারের স্বীকার করা না করায়, নাকি দমনে তা ঠিক পরিষ্কার না। একটা দেশের সরকার মানে কিন্তু আপনার আমার মতো ব্যক্তি নয় যে যেকোনো কিছু বুঝে না বুঝে বা তার গভীরতা বা সামনে পিছনের প্রভাব চিন্তা না করে কিছু একটা বলে ফেললাম আর হয়ে গেলো। সরকারের স্বীকার করা না করা কিন্তু ফেইসবুকের স্ট্যাটাস দেয়া নয়। সরকারের একটা বাক্যের অনেক মানে হয়, অনেক ইম্প্যাক্ট পড়ে দেশে এবং বিদেশে। তাই চাইলেও অনেক সময় অনেক কিছু স্বীকার করার মধ্যে কৃতিত্ব নাই। দেখতে হবে সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা বা কার্যকর উদ্যোগ আছে কী না? এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সেদিকে অন্য অনেক দেশে চেয়ে এগিয়ে আছে।

গুলশানের হোলি আর্টিজান থেকে সর্বশেষ সিলেটে চলতে থাকা জঙ্গিদমন অভিযানে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি। আমাদের বিশেষায়িত বাহিনীগুলো নিজেদের জীবন বাজি রেখে একের পর এক আক্রমণকে মোকাবিলা করে যাচ্ছে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে।

আমাদের দেশে যে কোনো ঘটনা নিয়েই দেখা যায় পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলার মানুষ তৈরি হয়ে যায়। কেউ কেউ কিছু না বুঝেই ধামাকা আলোচনায় চায়ের টেবিল গরম করে তৃপ্তি পেতে চায়। আবার কেউ আছে যারা চোখ বন্ধ করেই ঘটনার সমাপ্তি পর্যন্ত কল্পনা করে বিশেষজ্ঞের মত প্রতিষ্ঠা করতে চান। কখনো বা দেখা যায় সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেই দেশবিরোধিতায় নেমে পড়েন। এই জঙ্গি ইস্যুতেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি।

একদল কিছু না বুঝেই বলছে সবই নাটক। নাটকে কিন্তু গায়ে আলতা মেখে মরার ভান করে, নাটক করতে গিয়ে কোন বাহিনী বা সরকার এতোগুলো মানুষের জীবন নিয়ে মজা লুটবে একথা যারা বলে তাদের কাছেই যদি উত্তর চাই যে এই নাটকের প্রয়োজনীয়তা কী? এতে সরকারের লাভ বা ক্ষতি কী? সরকারের পুলিশ বাহিনী, আর্মি, র‍্যাব সহ আরও যেসব বিশেষায়িত টিম আছে, এতে করে তাদের কী অর্জন হচ্ছে? নাটকের স্ক্রিপ্ট রাইটার কে? কেন তাহলে এতোজন পুলিশ বা আর্মি মারা যাচ্ছে? জঙ্গিরা না হয় আত্মহননের পথকে শপথ হিসাবে নেয়, কিন্তু আর্মিরা কেন নিলো? নাটকের প্রচারণার পিছনে আপনার হাতে প্রমাণ কী?

সেইসব সমালোচকদের কাছে আমি একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে উত্তর চাই এবং তা হতে হবে অত্যন্ত যৌক্তিক। যদি উত্তর দিতে না পারেন তাহলে সেসব লোকদের আমি বলবো অন্যকে বিভ্রান্ত করার কোনো অধিকার আপনার আছে কি? আমাদের যেসব বীর পুলিশ বা সেনা সদস্য তাদের জীবন দিয়ে আমাদের নিরাপদ করার কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের ব্যাপারে আপনাদের বক্তব্য কী?

আমাদের দেশে বর্তমানে সরকার নিরাপত্তার স্বার্থে অনেক বাহিনী তৈরি করেছে। প্রতিটা বাহিনী কিন্তু সবসময় ক্রিয়াশীল থাকে না। তাদের নিজেদের পারফরমেন্সের একটা বিষয় থাকে। তাই সরকারের জন্য এসব রেগুলার বা ইরেগুলার হাইভোল্টেজ টিমগুলোর মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। আমরা হয়তো সে জায়গাটাতে সরকারের আন্তরিকতা চাইতে পারি।

জঙ্গিবাদ ধীরে ধীরে একটি সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। তাই এর দমনে একা সরকার কিচ্ছু করতে পারবে না। সরকারের মুখের দিকে না তাকিয়ে আপনি আমি কী করছি, কী ভূমিকা রাখছি সেটা অনেক বেশি জরুরি এই মুহূর্তে। অথচ আমরা বেশীরভাগই আছি কেবল সরকারের দোষ খুঁজে বের করে দিনাতিপাত করার তালে। সরকারের সহযোগিতা করাটা এই মুহূর্তে নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্ব।

একদল আছে যারা নিরব দর্শক। তারা ভালো বলবে না, আবার খারাপটাও বলবে না। হয় তারা একদম গাব শ্রেণীর, না হয় অতি চালাক শ্রেণীর। মেঘ দেখে ছাতা ধরা পার্টি। এদের সবাই খুব ভয়ংকর। কেউ কেউ আবার আরেকধাপ এগিয়ে গিয়ে বলছেন, এই দেশ নিরাপদ না। তাদের জন্য রাজনীতিকে বুঝার পরামর্শ দেয়া ছাড়া আর কিছু বলার নাই। এসব লোকের বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ায় কিছু পরিবর্তন হয় না।

আসলে আমরা সবাই আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে। বাইরের শত্রু মোকাবিলা করা যায় অনেক সহজে, কারণ সে দৃশ্যমান থাকে, কিন্তু ভিতরের শত্রু মোকাবিলায় চাই অনেক বেশি সচেতনতা ও দেশপ্রেম। তাই আমাদের নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। সরকার নয়, দেশের প্রয়োজনে যেকোনোভাবে নিজেকে এগিয়ে দিতে সদা তৈরি থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। সবকিছুর আগে দেশ এই ভাবনাটাকে ধারণ করে ছড়িয়ে দিতে হবে চারপাশে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.