একলা মানে দ্বিগুণ শক্তিমান

ফারহানা আনন্দময়ী:  

নারীদের সামাজিক সম্পর্কের পরিচিতিতে প্রায়ই একটা শব্দ দেখতে পাই, ‘Single’, যার বাংলা প্রতিশব্দ ‘একলা’। সামাজিক জীবনে তিনি বান্ধবহীন নন, কিন্তু ব্যক্তিগত যাপনে তিনি নিঃসঙ্গী। তাই হয়তো তিনি সমাজে পরিচিত হোন single,  একলা হিসেবে। আর একজন নারী ‘একলা’ শুনলেই অনেকের কাছে প্রথমেই মনে হয় তিনি অসহায়, দুর্বল। তাঁর ঘরে কোনো পুরুষসঙ্গী নেই মানেই তিনি অনেকটা অরক্ষিত। কিন্তু আমি যখন একজন একলা নারীর সঙ্গে পরিচিত হই, প্রথমেই আমি মনে করি তিনি ‘একলা’ মানে দ্বিগুণ শক্তিমান, দ্বিগুণ সাহসী আর দ্বিগুণ সংগ্রামী… অন্ততঃ আমাদের তুলনায়।

আমাদের তুলনায় বলছি এই কারণে, আপনি কিংবা আমি সামাজিক জীবন, ব্যক্তি জীবন, কর্মজীবন, সন্তানের অভিভাবক জীবন যাপন করছি যৌথভাবে। দায় এবং দায়িত্বগুলো ভাগ করে নিতে পারছি। কিন্তু একজন একলা নারী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যিনি ‘একলা মা’, তিনি দুজনের দায়িত্ব একা পালন করছেন। সন্তানের দায়িত্ব, সংসারের দায়িত্ব তিনি একলাই বহন করছেন। সেই ‘একলা নারী’কে আপনি কোন্‌ বিবেচনায় দুর্বল ভাববেন? কোন্‌ বিবেচনায় অসহায় ভাববেন? তাঁর একজন পুরুষসঙ্গী হয়তো নেই তাঁকে সাহায্যের জন্যে… তার মানে কিন্তু তিনি অসহায় নন মোটেই।

একজন একলা নারীকে আরো একটি বিশেষ দৃষ্টিতে দ্যাখে এই সমাজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই সমাজের চোখে একজন একলা নারী ‘সহজপ্রাপ্য’। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, আমাদের আশেপাশের অধিকাংশ পুরুষ যে কোনো একলা নারীকে মনে করেন এদের সাথে সুযোগ নেয়াই যায়, কর্মস্থলে প্রতিযোগিতায় খুব সহজেই বঞ্চিত ক’রে পেছনে ফেলে দেয়া যায়। এমনকী ব্যাটে-বলে ক্লিক ক’রে গেলে রুটিন জীবনের বাইরে কিছুটা অর্থহীন সময় কাটিয়ে সাধুবেশে ঘরে ফেরা যায়। এবং  আমি এ-ও দেখেছি একই সংখ্যক নারী যারা বিবাহিত, তারা যে কোনো একলা নারীকে দেখলেই খানিকটা আতংকিত বোধ করেন, যেন এখুনি সেই নারী তাদের স্বামীকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে দখল করে নেবেন। এইসব সংকীর্ণমনা সন্দেহবাতিক পরগাছা নারীদের জন্যে ভীষণ করুণা হয় আমার।

অনেক ক’জন একলা নারী আছেন আমার বন্ধু, কয়েকজন খুব কাছের বন্ধু। আমি তাঁদের সঙ্গে মিশেছি, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়েছি, তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা যেটুকু নিজ থেকে বলেছেন শুনেছি, সমব্যথী হয়েছি। যারা কিছু বলেননি, কোনোদিন ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখাইনি, কেন তারা আজ একলা।  নিজ বিবেচনায় বুঝে নিয়েছি, একজন নারী নিতান্ত নিরুপায় হয়েই যৌথ সংসার ত্যাগ করেন, একলা জীবন বেছে নেন যাপনের জন্যে। একলা মানে একা নন, নিজ সন্তানকে সঙ্গে ক’রেই সমাজে একলা নারী হয়ে টিকে আছেন। তাঁদের সংগ্রামের কাছে আমি বারবার শ্রদ্ধায় নত হয়েছি।

এঁদের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় অবিবাহিত জীবন বেছে নিয়েছেন, কেউ সংসার ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন, কাউকে বাধ্য করা হয়েছে বেরিয়ে যেতে। তাঁরা সকলেই একলা একলাই দাঁড়িয়ে গেছেন, যার যার যোগ্যতা অনুসারে। কিন্তু এই দাঁড়াবার পথটা কারো জন্যেই মসৃণ নয়, ছিলও না। নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়েছে, সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে শিখতে হয়েছে, পুরুষের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে, নারীর ভ্রু-কুঞ্চনকে অবজ্ঞা করতে হয়েছে। পুরুষ সহকর্মীর কুৎসিত যৌন-ইঙ্গিতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়েছে, আবার সেইসব পুরুষেরই স্ত্রীদের আঙুল-নির্দেশের লক্ষ্য হতে হয়েছে সেই একলা নারীকেই। তারপরেও তাঁরা ঋজুভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন, এগিয়ে গেছেন… আমাকে এবং আপনাকে ছাড়িয়ে অনেকটা সামনে।

পুরুষের ছায়ায় নিশ্চিন্তজীবন যাপনকারী নারীদেরকে বলি, একবার আয়নার সামনে দাঁড়ান। একজন একলা নারীর জীবনসংগ্রামের কতটুকু আপনাকে করতে হচ্ছে, সেই হিসেবটা মেলান। লজ্জায় মুখ ঢাকবেন, আমি জানি। স্বাধীন-স্বনির্ভর একলা নারীকে ‘খারাপ নারী’ ট্যাগ দেয়ার আগে নিজস্বামী এবং কাছের পুরুষদের জীবনাচরণ রিভিউ করুন আরেকবার। আপনারা কেন মনে করেন, একজন একলা নারী সারাক্ষণ ‘ছেলাধরা’দের মতন পুরুষ ধরার কাজে নিয়োজিত থাকেন? আপনার কোনো ধারণাই নেই, একজন স্বাধীন স্বনির্ভর দায়িত্বশীল একলা নারীর সফল যাপিতজীবনের ঔজ্জ্বল্যের কাছে আপনার এই স্বামীব্রতা অনুগতজীবন কতটা বিবর্ণ!  

আপনি যে সময়টাতে টিভিতে বাংলা-হিন্দি সিরিয়াল দেখছেন, যে সময়টাতে পাশের অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিবেশী নারীর সঙ্গে আয়েশ ক’রে বসে আপনারই পরিচিত একজন একলা নারীর চরিত্রহনন করছেন, ঠিক সেই সময়টাতে সেই একলা নারী তাঁর সন্তানের স্কুল বা কলেজের টিউশন ফিজ জোগাড় করার জন্যে কর্মস্থলে বাড়তি সময়ের কাজটুকু করছেন। বন্ধুদের আড্ডায় পুরুষেরা যখন সেই একলা নারীকে নিয়ে বিকৃত তামাশা করছেন, আপনিও তাদের সুরে সুর মেলাচ্ছেন, আপনি হয়তো জানেনই না, সেই বিকেলেই ওই পুরুষটি সেই একলা নারীকে সপ্তাহান্তে শহরতলীর রিজোর্টে সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।

একজন একলা থাকা নারীকে খুব দ্রুত বিচার করতে যাবেন না। একটু মানবিক হোন, তাঁর জায়গায় নিজেকে রেখে ভাবুন। নিজের সংকীর্ণ  মানসিকতা বদলান, সেইসঙ্গে আপনার পুরুষসঙ্গীর মানসিকতা বদলাতে সাহায্য করুন। শুধু শিক্ষিত স্বনির্ভর নারীরাই নয়, অল্পশিক্ষিত নিরক্ষর একলা নারীরাও একইরকম দ্বিগুণ শক্তিমান, দ্বিগুণ সাহসী আর দ্বিগুণ সংগ্রামী।

যৌনকর্মী, গার্মেন্টস কর্মী, গৃহকাজে নিয়োজিত কর্মী, দিনমজুর নারী…অধিকাংশই দেখুন পুরুষ বা স্বামী দ্বারা প্রতারিত হয়ে, নির্যাতিত হয়ে কলোনিতে আলাদা ঘর নিয়ে একলা জীবনযাপন করছেন, সন্তানটিকেও লালল-পালন করছেন তাঁর সীমিত আয়েই। সংশ্লিষ্ট পুরুষটি কিন্তু সেই সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে, নারী পারেননি এড়াতে। এবং তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে সেই দায়িত্ব বহন করছেন। 

আমি কিংবা আপনি এই একলা নারীকে কীভাবে দুর্বল বা অসহায় বলি? দুজন মানুষের দায়িত্ব একা বহন করছেন, তিনি তো নিশ্চিতভাবেই আমাদের চেয়ে বেশী শক্তিমান।

এই সমাজে সংগ্রামরত আমার পরিচিত-অপরিচিত সকল এবং প্রতিটি একলা নারীকে অভিবাদন। আপনাদের জীবন সংগ্রামের কাছে আমাদের জীবন কিছুই নয়।     

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.