ক্ষমা করো মেয়ে …

মেহেরুন্নেছা রোজী:

তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ি। যখনই ছুটি পাই, গ্রামের বাড়ী চলে যাই। বছরে কয়েকবার করে বাড়িতে যাওয়া আসা। বাড়ীর পথে প্রমত্তা পদ্মা। পদ্মা পারাপারের ঘাট। পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়াকখনো ফেরি। কখনো লঞ্চ। ফেরি পারাপারে আসা-যাওয়া করার সময় বেশ কয়েকবার একটা ঘটনার সম্মুখীন হতাম। দেখতাম যাত্রীবাহী বাসগুলো ফেরিতে উঠার কিছুক্ষণ পরেই এক মহিলা উঠতো বাসে বাসে। বয়স বছর তিরিশের কম বই বেশী নয়। পরনে জংলী ছাপা শাড়ি। বাচ্চা কোলে হাতে কখনো মন্দিরা কখনো বা খঞ্জনী। গান গেয়ে গেয়ে ভিক্ষা করতো। গানের গলা যাই হোক না কেন গায়কীর ভিতর অন্যরকম একটা দরদ থাকতো।

মনে হতো সে যেন তার নিজের জীবনের কথাই বলছে। সে দু থেকে তিনটা গান করতো। তার একটি গানের মর্মার্থ ছিলো এমন যে, সে সারাটা জীবন ফুটো নৌকার পানি ছেঁচে ছেঁচে এসেছে জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে দেখলো, নৌকার তলাটাই কখন যে ফুটো হয়ে গেছে সে টের পায়নি এতোদিনএখন জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় তার আর খেদের সীমা পরিসীমা নেই। এখন সে ব্যর্থ জীবনের, পরাজিত জীবনের বোঝা বইতে বইতে বড় ক্লান্ত, শ্রান্ত, পরিশ্রান্ত। যতবার আমি তার গান শুনেছি, ততবারই আমি তাকে কিছু না কিছু টাকা দিয়েছি।

দুতিনবার তার সাথে দেখা হবার পর আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ছোট্ট মেয়ে কোলে নিয়ে নিয়ে বাসে বাসে গান গেয়ে পয়সা উপার্জন করছে।তার পরিবারের আর কোন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছে কিনা।আমি তার সন্তানের বাবার কথা জানতে চেয়েছিলাম।আমি তাকে ভিক্ষা দিতাম।সে আমাকে নির্দ্বিধায় যে উত্তর দিয়েছিল যার অর্থ দাঁড়ায়—পথে তো কত পথিক চলে।পথ পথ চলতে চলতে যে পথিক একটা আধুলি ফেলে রেখে চলে যায় তার মালিকানা তার থাকে না,যে কুড়িয়ে নেয় মালিকানা তার।পথিকের খোঁজ করা বৃথা মাত্র।

এক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার পাট চুকিয়ে ফেললাম।চাকরী হল।ঘর হল।বর হল।সংসার হল। আমার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া কমে গেল।গ্রামে যাবার রুট বদল হল।দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনও কাটল । একদিন মহিলার কথা মন থেকে মুছেও গে্ল।

২০০৯ সাল। আমার মা গুরুতর অসুস্থ।মায়ের চিকিৎসার জন্য আবার সেই পুরাতন পথে যাওয়া আসা। আবার ফেরিঘাট।আবার ফেরি পারাপার।কিন্তু সেই মহিলাকে আর দেখলাম না।কত কত বার বাস থেকে নেমে ফেরিতে হেঁটেছি। যদি আজও সে গান গেয়ে ভিক্ষা করে! তারপর একদিন আমার মনে হলো, তার মেয়েটি নিশ্চয়ই এতদিনে ষোড়শী। তার নিজের বয়সও থেমে নেই। দারিদ্র, ক্ষুধা, অপুষ্টি হয়তো বা তাকে বয়সের চেয়ে আরো বেশী বয়স্ক করে তুলেছে। আমার আর জানা হলো না। তার ফুটো নৌকাখানি কূলের দেখা পেয়েছে কিনা। শেষ পর্যন্ত সে জিততে পেরেছে কিনা। আমার জানা হলো না তার কাঙ্খিত জয়ের সীমানাও।

আমার জানা হলো না তার ষোড়শী মেয়ে এই সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পেরেছে নাকি, সেও মায়ের মতো জীবনের ফুটো নৌকার পানি ছেঁচে ছেঁচে……………

তারপর একদিন মনে হলো, কী হবে অন্য একজন অচেনা অজানা নারীর খবর জেনে! সকল নারীই কি তার নিজের সীমানা জানতে পারে? প্রতিটি মানুষই কি সেটা জানতে পারে? কোনো নারী কি জানে কিসে তার জয়? কিসে তার পরাজয়? কোনো মানুষ কি জানে কিসে তার জয়? কিসে তার পরাজয়? মানুষের জীবন তো আর ফুটবল খেলা নয় যে, যে পক্ষের গোল বেশী সে পক্ষের জয়। সে পক্ষের হাতে ট্রফি।

একেক জীবনের চাওয়ার হিসাব তো একেক রকম। একেক জীবনের লক্ষ্য তো একেক রকম। একেক জীবনের জয়ের ধরনও তো একেক রকম। কিন্তু পরাজয়ের বেদনা? পরাজয়ের গ্লানি? সে তো একই রকম। প্রত্যেক পরাজিতই একই সুরে বলতে পারে সারাটা জীবন কেবল ফুটো নৌকার পানিই ছেঁচে ছেঁচে এলাম। অর্থাৎ ফুটো নৌকার পানি ছেঁচাই পরাজিত জীবনের সার কথা।

যেন-

দরজা খুঁজে পাইনি রাজবাড়ির

সিঁড়ি খুজে পাইনি মন্দিরের

ক্ষমা করো

আমি পারিনি

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.