বাল্যবিয়ের বিশেষ বিধান বনাম আমার গবেষণা অভিজ্ঞতা

জিন্নাতুন নেছা:

ফলাও করে নিউজ করা হয়েছে চট্টগ্রাম আদালতে প্রথম বিশেষ বিধান অনুযায়ী বাল্যবিয়ে হয়েছে। এটা কিন্তু প্রথম শেষ না। সবে শুরু হলো মাত্র। আমি কেন জানি ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছি এই ভেবে যে এরপর থেকে বিশেষ বিধানে বাল্যবিয়ে কী পরিমাণ বেড়ে যাবে তার একটি দৃশ্যপট মাথায় এনে।

জিন্নাতুন নেছা

আমি ভয় পেয়ে যাচ্ছি এই ভেবে যে এরপর থেকে পত্রিকা, ফেসবুক, টেলিভিশন খুললেই দেখবো কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরিবার থেকে থানায় মামলা করা হয়েছে, ছেলেপক্ষ কিছু লম্বা অংকের কাবিন ঠুকিয়ে বিয়ে করেছে। ধর্ষণকারী পুরুষ হয়ে গেলো স্বামী, মামলা খারিজ, আহা কী শান্তি! বাবা- মাও ভেবে নিলেন এমন মেয়েকে কোথায় বিয়ে দিতাম, যাক বাবা ভালোই হলো।

কিন্তু এই ঘটনা যদি এই বিয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকতো, কিশোরী সংসার করতে পারতো, সুখী হতো, তাহলেও হয়তো এতো ভয় পেতাম না আমি। ভয় পাবার কারণ হলো এই পুতুলের সংসারের স্থায়িত্ব কতোটুকু? আমার বিভিন্ন গবেষণা কাজের অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের সংসার কাচের চুড়ির ন্যায় ঠুস করে ভেংগে যায়। আর তাই উত্তরোত্তর বেড়ে যাচ্ছে তালাক।

আমি বলবোনা যে তালাকের অন্য কোনো কারণ নাই। তবে বিবাহ বিচ্ছেদের একটি অন্যতম ও প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। কিছুদিন আগে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা জেলায় Development Research Initiative নামক এক বাংলাদেশী গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বিবাহিত কিশোরীদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা কাজের জন্য গিয়েছিলাম। দেখলাম ১২ থেকে শুরু করে ১৫ বছর বয়সের মাঝে প্রায় সকল মেয়ে বিবাহিত।

কুড়িগ্রামের এক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বললেন, “আসলে কী কুড়িগ্রাম খুব দরিদ্র জেলা। মেয়েদের ভাত- কাপড় দেয়া বাবা-মার জন্য বোঝা হয়ে যায়। তাই বিয়ে দিয়ে দেয় যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব। সরকার থেকে অনেক প্রচার, প্রচারণা চালাই আমরা, কিন্তু অভিভাবকগণ অন্য ইউনিয়নে নিয়ে গিয়ে রেজিস্ট্রি করার বদলে জমি বন্ধক রেখে বিয়ে দিচ্ছে। আমাদের করার কিছুই থাকে না।”

আর একটি বিষয় আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো, বাল্যবিয়ের প্রধান কারণ হিসেবে গবেষণার মাধ্যমে উঠে এসেছিলো প্রেম, প্রেম করে পালিয়ে যাওয়া। এখন যদি বিশেষ বিধানে বিয়ে হয়, তাহলে আর পালিয়ে যেতে হবে না, ধর্ষণ ধর্ষণ খেলতে খেলতেই সংসার শুরু করতে পারবে। অন্যদিকে যে পুরুষগুলোর লোলুপ দৃষ্টি আছে বিশেষ কোনো মেয়ের প্রতি তারা তো বিশেষ বিধান অনুযায়ী বিয়েটা সেরে ফেলতে পারবে অনায়াসেই, এক্ষেত্রে কেবল কিছু বিশেষ মামা, খালু দরকার।

কিন্তু আমি অতিশয় শংকিত এসব পুতুলের সংসার যখন ভেঙ্গে যাবে, তখন এই মেয়েদের কী হবে, তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সমাজ কি তাদের গ্রহণ করবে? যে দেশ, যে সমাজ বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত সম্মান দিতে পারেনি, সে দেশ এইসকল নারীকুলকে আর কী দিতে পারে, তা সত্যি বড় ভাবনার বিষয়। আর এই নারীরাই যখন নিজেকে সামলিয়ে একা চলতে চাইবেন, সামনে এগিয়ে যাবেন, তখন সমাজ ঐ নারীর গায়ে সেঁটিয়ে দিবেন কিছু বিশেষ তকমা, ‘নারী একা থাকলে হয় বেশ্যা…..’।

কোনো এক গবেষণা কাজে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহ এর এক উপজেলায়। দেখেছিলাম যত বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় সব বিয়েই হয়েছিলো কম বয়সে অর্থাৎ বাল্যবিয়ে। এমনকি গ্রাম্য সালিশী প্রথা থেকে শুরু করে নারীর জন্য তৈরিকৃত আইন (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ,পারিবারিক আদালত, যৌতুকবিরোধী আইন, ধর্ষণবিরোধী আইন) তার কোনটাই নারীবান্ধব কীনা, তাও গবেষণার দাবিদার।

বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে আনার জন্য যখন সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এতো সোচ্চার, ঠিক সেই সময় এই বিশেষ বিধান বলুন, আর সুযোগ বলুন, তা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের জন্য কতোটা কল্যাণকর তা ভাবনার বিষয়!!!

যে দেশের পিতামাতা এখনো বিশ্বাস করে “মেয়েদের বিয়ে দেয়া ফরজ কাজ”। তাই যেমন-তেমন ছেলে ধরে এনে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলেই যেন সওয়াব বর্ষিত হলো তাদের উপর। আর ধর্ষক তো স্বামী হতেই পারে, যার বৈধতা দিয়েছে এই বিশেষ বিধান সম্বলিত বাল্যবিবাহ আইন এবং প্রমাণ করেছে চট্রগ্রাম আদালতে ধর্ষক গোলাম মোস্তফার স্বামী হয়ে ওঠার নাটক!!!

জিন্নাতুন নেছা
গবেষক।
২৬/০৩/১৭

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.