‘আপনিও জঙ্গিবাদে মদদ দিচ্ছেন নাতো?’

অজন্তা দেবরায়:

একটা কথা আছে – নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। গত পরশু যে আগুন জ্বলেছে রাজীব-অভিজিৎ-অনন্ত-সামাদদের ঘরে, গতকাল সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে হোলি আর্টিজান বেকারিতে আসা নিরপরাধ জীবনগুলো, আর আজ সেই একই আগুনে জ্বলছে সিলেটের শিববাড়ি এলাকা। আগামীকাল, তার পরের দিন, তারও পরের দিন, এই করতে করতে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করার আগ পর্যন্ত এ আগুন নিভবে না, যদি না আমরা সময় থাকতে আজই এই আগুন না নেভাই।
 
বিগত কয়েক বছরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যাচাই করলেই বোঝা যায় ধর্মীয় মৌলবাদ কতোটা বেড়ে গেছে। ডালপালা ছড়িয়েছে একদম প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে। আর তার প্রধান কারণ কি জানেন? প্রধান কারণ হচ্ছে অধিকাংশ মানুষের চুপ থাকা, ‘অনুভূতি’ নামের ভয়ংকর ঘাতকের বেড়ে ওঠা। যে অনুভূতি আবার ক্ষেত্র বিশেষে জাগে, জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে।
 
এই অনুভূতিওলাদের চেনার কিছু সহজ উপায় আছে।
 
যেমন-
 
• গলা কেটে রাজীব হায়দারকে হত্যা করলে প্রতিবাদ করেন না – ৫ই মে’র হেফাজতিদের কল্পিত ফটোশপ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শোরগোল তোলেন।
 
• চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নাস্তিক ব্লগারদের হত্যা আপনাদের হৃদয়কে নাড়া দিতে পারে না – আপনারা ব্যস্ত হন ভারতে গরুর মাংস নিষিদ্ধ হলো কিনা সেই প্রতিবাদে বাংলাদেশের হিন্দুদের বংশ উদ্ধার করতে।
 
• কাবা শরীফের উপর শিবের মূর্তি জাহাঙ্গির আলম নামের লোক বসিয়েছে শুনে আপনাদের অনুভূতি আঘাত পায় না – অথচ সেই একই অপরাধের অপবাদে নাসির নগরের শত শত হিন্দু ঘর বাড়িতে আগুন জ্বলে, পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে জেলে দেয়া হয় বেচারা রসরাজ দাসকে।
 
• কোন নাস্তিক কোরানের একটা আয়াতের অর্থ নিয়ে কথা বললে অনুভূতির ঠেলায় তার ফাঁসির দাবি তোলেন – অথচ হিন্দুপাড়ায় দাঙ্গা লাগানোর জন্য জনৈক বিকৃত মানসিকতার লোক হাবিবুর রহমান কোরানের পাতায় মলমূত্র ফেলে রাখলে ও তাতে অনুভূতি জাগ্রত হয় না।
 
• জঙ্গি মারা পড়লে বলেন, সরকারের নাটক-জঙ্গি মারতে গিয়ে মারা পড়লে বলে,ন সরকার জঙ্গি তোষণ করছে।
 
– এই উপরোক্ত ক্যাটাগরিতে যারা পড়েন, তাদের সিলেক্টিভ মানবতাবোধ ও আজাইরা অনুভূতিই সব নষ্টের গোড়া। জঙ্গি সৃষ্টি, জঙ্গি লালন ও পালনের নাটের গুরু আপনারাই।
আবার অধিকাংশ লোকই দেখি ‘জঙ্গিদের কোনো ধর্ম নেই’ অথবা ‘জঙ্গিরা প্রকৃত মুসলমান নয়’ – শুধুমাত্র এই বক্তব্য দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন। এতে করে কি ধর্মের নাম ব্যবহার করে কৃত অপকর্মগুলো বন্ধ হচ্ছে?
হচ্ছে না। আর সেকারণেই আপনার ধর্মের নাম নিয়ে যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করছে, যাদের মুখে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি সাধারণের মনে আতঙ্ক তৈরি করে, সেই সকল অমানুষ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। খবরে জানলাম, এক বাবা তার নিজের দুই ছেলেকে ধরিয়ে দিয়েছেন জঙ্গি সন্দেহে। আপনারাও এগিয়ে আসুন।
দাঁড়ি টুপি লাগিয়ে, ধর্মের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সন্ত্রাসের পরিকল্পনাকারী যেই হোক না কেনো তাদেরকে প্রতিহত করুন। যে আদর্শের কারণে ‘ইসলাম’কে শান্তির ধর্ম বলে আপনারা দাবি করেন, সেই আদর্শের বিজয় দেখতে চাই। তা না হলে ধর্মের নামে হওয়া এই ‘অধর্মের’ দায় এড়াতে পারবেন না আপনিও।
 
এখনো সময় আছে বদলান। নিজেরা বাঁচেন, আমাদেরও বাঁচতে দিন। সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় অনুভূতির ব্যবসা বন্ধ করুন।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.