জঙ্গি দমন অভিযানের কৌশল নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা !

নাসরীন রহমান:

‘পাঠানপাড়ায় এক বাড়িতে আমাদের প্রেস কনফারেন্সের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। আমরা সাংবাদিকরা সেখানে যাই। ব্রিফিং শেষে যখন আমরা ফিরছিলাম, ফেরার পথেই ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে দূরে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনলাম। যেখানে বিস্ফোরণ হয়েছে সেখান থেকে আমি বড় জোর ৫০/৬০ গজ দূরে ছিলাম।”
বিবিসিতে দেওয়া একজন সাংবাদিকের সাক্ষাৎকার।
নাসরীন রহমান

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সিলেটে আতিয়া মহল নামের ভবনটিতে জঙ্গি দমন অভিযানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এতোটা সময় নিল কেন? যার ফলে জঙ্গিরা এই আক্রমণ ঘটানোর সুযোগ পেল এবং খোদ সেনাবাহিনীর নাকের ডগায়। কতোটা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেই কোনো চক্রের পক্ষে এমন হামলা চালানো সম্ভব!

বাংলাদেশে জঙ্গি দমনের অভিযানের কৌশল নিয়ে এমনিতেও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা কম হচ্ছে না; এই যে  ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাসহ পাঁচজনের মৃত্যু (সংখ্যাটা আরও বেশিও শোনা যাচ্ছে), এই ক্ষতি তো পূরণ হবার নয়।

এর আগে ঢাকায় গুলশানে হোলি আর্টিজানে অভিযান পরিচালনার কৌশল নিয়েও কথা উঠেছিল। আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ বিশ্লেষক রোহান গুনেরত্নে ১২ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত পুলিশদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেছিলেন, গুলশানে হোলি আর্টিজানে অভিযান পরিচালনায় এতো সময় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অভিযান পরিচালনা করতে এতো সময় নেওয়ায় জঙ্গিরা সময় পেয়েছিল আরো সহিংসতা ঘটাতে।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি সিলেটেও!
সিলেটে কথিত এই আতিয়া ভবনে জঙ্গিরা অবস্থান করছে আজ দুদিন; পুলিশের ‘সোয়াট’ বাহিনী ঢাকা থেকে সড়ক পথে সেখানে যায় গতকাল বিকেলে, এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা অভিযানে ‘সোয়াট’কে কেন সড়ক পথে যেতে হবে ঘটনাস্থলে? আকাশপথে যাওয়া যায়নি সময় বাঁচাতে? তাছাড়া যে বাড়িটিকে ঘিরে এতো ঘটনা, সেটা নিশ্চয়ই একদিনে সন্দেহ জাগায়নি। তাহলে এতো জানান দিয়ে, ভিতরে এতোজন মানুষ রেখে, ঘেরাও করে অভিযান চালানো কেন? গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য হিসাবে নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনীকে দিয়েই তো অভিযানটা চালানো দরকার ছিল। এসবই অনভিজ্ঞ প্রশ্ন যদিও, তারপরও জাগছে মনে।
জঙ্গিরা আর সাধারণ অপরাধী তো এক নয়; জঙ্গিরা সবসময় একটা বার্তা দিতে চায় ; সিলেটে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ভেতরই জঙ্গিদের এই কমান্ডো কায়দায় আক্রমণ কী বার্তা দিয়ে গেল আশাকরি ভাববেন সকলে। সর্বশেষ খবর অনুয়ায়ী আইএস সিলেটের এই হামলার দায় স্বীকার করে কথিত বিবৃতি দিয়েছে, এর আগে ঢাকায় আশকোনায় নির্মীয়মান র‌্যাব সদর দপ্তরে যে আত্মঘাতী হামলা ঘটে এবং বিমান বন্দর সড়কের কাছে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে, সেইসব ঘটনাতেও আইএস দায় স্বীকার করে নিয়েছিলো হামলার পরপরই। আইএস এর এই দায় স্বীকারের মাধ্যমে একদিকে যেমন তাঁদের শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটে, তেমনি তাঁদের অস্তিত্বেরও। ফলে আইএস নাই -এই বক্তব্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ আইএস এর কথিত দায় স্বীকার শুধুমাত্র আক্রমণের দায় স্বীকার না, উপরন্তু তাঁদের অস্তিত্বের প্রমাণ দাখিল করা!
একের পর এক এসব জঙ্গি হামলা বা আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তাই সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে জঙ্গি দমনের কৌশল নিয়ে।
আজ জঙ্গিদের এতো বাড়-বাড়ন্ত দেখছি আমরা সবাই। তাদের দমনে সরকারের সবগুলো বাহিনীকেই নাকানি-চুবানি খেতে হচ্ছে। অথচ যখন একের পর এক ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা লেখক খুন হলো; এঁদের হত্যাকারী খুঁজেই পাওয়া গেল না ! জঙ্গিরা আজ তাই ব্লগার ,প্রকাশক, বিদেশী নাগরিক এর তালিকা পেছনে ফেলে তাদের টার্গেট করছে খোদ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। তাদের এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য আচরণ, সাহসের ক্ষেত্র একদিনে তো তৈরি হয়নি। অনেক রক্তের উপর হেঁটে হেঁটেই তারা আজ এই পর্যায়ে। এবং সেক্ষেত্রে কারও কারও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদ তো অবশ্যই রয়েছে। সেই মদদেরই বলী হচ্ছে আজ নিরীহ মানুষ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলি সরাসরি জঙ্গিবাদে জড়িত না থাকলেও তাদের উগ্রপন্থী মতবাদ সমাজে জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র তৈরিতে পরোক্ষভাবে ইন্ধন যোগায়, তা আজ স্পষ্ট। গত কয়েক বছরে আমরা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর কথিত প্রশ্রয়ের অভিযোগ শুনে আসছি। আজ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ যে পর্যায়ে তাতে রাজনৈতিক দলসহ ক্ষমতায় যারা আছেন সকলের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়াবার সময় এসেছে সমাধান খুঁজতে। এরপরও যদি আমাদের বোধোদয় না হয় তবে সামনে অন্ধকার ছাড়া আর যে কিছু নাই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সিলেটে এখনও জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যাচ্ছে, হতে পারে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে চাচ্ছে বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগ সিলেটের দিকে নিবদ্ধ রাখতে চাচ্ছে। এটা হতে পারে জঙ্গিদের কৌশল; তবে ঢাকা বা অন্যান্য বিভাগীয় শহর যেন সুরক্ষিত থাকে, সেদিকেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।
আর আগেও আমরা জঙ্গিদের দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা করতে দেখেছি ; সেটা মাত্র কয়েক বছর আগেরই ঘটনা।
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.