‘মৃত্যুঞ্জয়ী হতে না পারার আক্ষেপ তাঁর’

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ধড়মড় করে ঘুম থেকে ওঠেন জহির সাহেব। দুপুরে খাওয়ার পরে লম্বা এক ভাতঘুম দেবার অভ্যাস আছে তার। আজকাল খুব ভোরে হেঁটে হেঁটে গোরস্থানে চলে যান। মায়ের কবরের পাশে বসে থাকেন দীর্ঘ সময়। আগে মধ্যরাত অবধিও থাকতেন। ঘুমিয়েও পড়েছেন কতদিন! একবার তো দুই তিনজন- লোক মাঝরাতে কবরের পাশে জহির সাহেবকে শুয়ে থাকতে দেখে জ্বীন -ভূত ভেবে বেড়া ভেঙে ভোঁ দৌড়!

জহির সাহেব বিয়েথা করেননি। মাকে ঘিরেই ছিল জগৎ- সংসার। মায়ের হাতের রান্না ছাড়া জীবনে কিছু মুখে দেননি সেসময়। মা ছিলেন স্বাধীনচেতা, রাজনীতি সচেতন, উদারমনা, রন্ধনপটিয়সী। দেশকে ভালোবাসতেন, তাই তো বুকের মানিককে যুদ্ধে যেতে বাধা দেননি। বছর কয়েক হলো, মায়ের মৃত্যুর পর থেকে জহির সাহেব একাকী, নিভৃত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভানুর মা এসে রান্না করে, ঘরের কাজ করে দিয়ে যায় একবেলা। পোষা হাঁস – মুরগি – কবুতর আর শাকসবজির বাগানেই অনেকটা সময় চলে যায়।

বয়স বাড়ছে ,  চৈত্র মাসের খাঁ খাঁ দুপুরে অসময়ে দরজার কড়া নাড়ার শব্দে বুকে হাঁপড় উঠে যায়। জহির সাহেব মাথার বালিশের বাঁ দিকটা হাতড়ে চশমা খুঁজে পরে নেন। বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে এগোন। পুরনো দিনের বাড়ি। বৈঠকখানার দরজার পাশেই বড় জানালা। ঝুল জমে থাকা পুরনো নেটের ওপাশে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে মাজেদ মিয়া দাঁড়িয়ে। সাথে এলাকার কিছু ছেলেপুলে। ভুরভুর করে সস্তা আতরের গন্ধ জহির সাহেবের নাকে এসে লাগে।

রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ” কী চাও মাজেদ মিয়া?”
জহির সাহেব ছাড়া এলাকার কেউ  আর এখন মাজেদকে ” মাজেদ মিয়া ” ডাকার সাহস পায় না। বাইরে থেকে কেউ এসে  “মাজেদ মেম্বারের বাড়ি ” খোঁজ করলে সবাই একনামে বিশাল গোলাপি রঙা “মাজেদ মঞ্জিল ” দেখিয়ে দেয়। মাজেদ মেম্বারের ম্যালা খরচাপাতি করে বানানো এই ম্যালামাইনের প্লেট-বাটির মতো নকশাদার বাড়িটি। ফুল – লতা -পাতার সাথে জায়গায় জায়গায় চাঁদ- তারার নকশা চোখে পড়ে।

এলাকার উন্নয়নে মাজেদ মেম্বারের বিস্তর অবদান। মায়ের নামে “মেহেরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়” ছাড়াও মসজিদ, মাদ্রাসা বহু কিছুই এই মাজেদ মেম্বারের করা। 

জহির সাহেবের বসার ঘরের একপাশে বিছানা পাতা চৌকি – সেখানে মায়ের জায়নামাজ আর তসবিহ রাখা,  খটখটে পুরনো কয়েকটা গদি-তোশক দেয়া চেয়ার, পুরনো বই ঠাসানো দেয়াল-তাকে। একটা ভাঙাচোরা টেলিভিশন। স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উঁচানো সেই বিখ্যাত ছবি। একটা সেকেলে ঘড়িও আছে ঘন্টা ঝোলানো। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে লুটপাটের ধ্বংসাবশেষ থেকে ঘড়িটাকে কীভাবে যেন অক্ষত পাওয়া গিয়েছিলো। এখন আর সময় দেয় না। কালের নীরব সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে জহির সাহেবের সাথে।

ছোটখাটো গড়নের শান্ত সৌম্য ব্যক্তিত্বের নিভৃতচারী জহির সাহেব – এককালের ডাকসাইটে ছাত্রনেতা জহিরুদ্দিন জহির, বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিলো সেই সৌভাগ্যবানদেরই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা জহির। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ডাকে যে কোটি কোটি বাঙালির রক্ত টগবগ করে ফুটেছিলো, মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, জীবনের পরোয়া না করে যাঁরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর “রাজাকার -আল – বদর, আল- শামস” নামের হায়েনা- শকুনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলো প্রিয় মাতৃভূমিকে, যে দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছিলো বাংলাদেশের লাল – সবুজ পতাকা – জহির সাহেব সেই বীর সন্তানদেরই একজন। চোখের সামনে সহযোদ্ধাদের কতজনকেই শহীদ হতে দেখেছেন…।

তাঁদের রক্তেই যে পবিত্র এ পূণ্যভূমি। সাগর, মিজান,  দেবাশীস – কেউই তো ফিরে আসেনি। জহির সাহেবের মতো তাঁদের দেখা হয়নি বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ, স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয়। তবুও জহির সাহেবের মনে কোথাও বুঝি আক্ষেপ রয়ে গেছে –  ওঁদের মতো মৃত্যুঞ্জয়ী হতে না পারার আক্ষেপ।
 
জহির সাহেবের চোখেমুখে তখনো কাঁচাঘুম ভাঙার বিরক্তি। তাছাড়া মাজেদ মিয়াকে দেখে খুশি হওয়ারও কোনো কারণ নেই।
এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক মাজেদ মেম্বার অতি আন্তরিক ভঙ্গিতে একখানা আমন্ত্রণপত্র মলিন কাঠের টেবিলে রাখে।
আগামী ২৬শে মার্চ, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মেহেরুন্নেছা উচ্চবিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জহির সাহেব যথারীতি সবিনয়ে আমন্ত্রণ রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে জানান। কিন্তু বাদ সাধে পাড়ার ছেলেপুলেগুলো। অনুষ্ঠানে না এলেও অন্তত একদিন বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করে। উদ্দেশ্য মহৎ। ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা তুলে ধরতে হবে।
“সে দেখা যাবে” বলে তখনকার মতো বিদায় জানান জহির সাহেব।

অন্য সবাই সামনে এগোলে মজিদ একটু কাছে এসে আঞ্চলিক টানে সবিনয়ে অনুরোধ করে, ” জহির ভাই, জীবনে তো দেশির জন্যি ভাল কিসু করি নাই, আপনাগের পা ধোয়া পানি খেলিও কম হবে নে। আপনাগে মতোন মানুষ ইশকুলি আসলি আমাগে পাপ যদি ইট্টু কমে। সাওয়াল পাওয়াল গুলান কিসু শেকপেনে  – তাই মনে কইরে না হয় আসপেন! “

মাজেদের ছায়াটাও মাড়াতে চায় না জহির সাহেব। তারপরও তাঁর কেন যেন যেতে ইচ্ছে করে, জানতে ইচ্ছে হয় আজকের ছেলেমেয়েরা কী ভাবছে, তাদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ কেমন? রাতভর চিন্তা করে জহির সাহেব সিদ্ধান্ত নেন তিনি যাবেন। বুক ফুলিয়ে বর্ণনা করবেন বীর বাঙালির বিজয়গাথা।

জহির সাহেব বসে আছেন স্কুলঘরের সামনের খেলার মাঠে। তাঁকে ঘিরে আছে সব ছাত্র-ছাত্রী। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ জনের মতো হবে। জহির সাহেব জানতে চান ২৬শে মার্চ কী? অধিকাংশ ছাত্রই বলতে পারে না! দুই – তিনজন উত্তর দেয় – ” বিজয় দিবস “!! মনে মনে আশাহত হলেও তা চেপে রেখে জহির সাহেব এগোতে চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন করার গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে আবার এক বিশাল ধাক্কা খান – “কন কী স্যার? জিয়াউর রহমান দেশ স্বাধীন করেনি?”  

জহির সাহেব দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন তিনি।
আরো ভয়ংকর বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষা করছিলো, তা টের পেলেন যখন শহীদ মিনারের ইতিহাস বলার সময় পেছন থেকে কোনো এক ছাত্র বলে উঠলো ” শহীদ মিনার তো তারেক রহমান বানায়েছে”! 

জহির সাহেব উঠে বাড়ির পথ ধরলেন। মাথার ওপরে দপদপ করে চৈত্র মাসের গনগনে রোদ, বুকের ভেতরে আগুনের ফুলকি। বুকে ব্যথা শুরু হয়। মনে জ্বলজ্বল করে সাগর, দেবাশীস, মিজানের মুখটা। মনে মনে বলেন, ” ভাগ্যিস ফিরে আসিসনি, এই দিন দেখতে হতো রে!”

বিকেল গড়িয়ে গেছে। পেছনের উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁস – মুরগিগুলোকে ঘরে তুলছিলেন জহির সাহেব। উঠোনের এককোণে রক্তজবা ফুটেছে। আজই খেয়াল করলেন। দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ। এখন তাঁর ভাত ঘুমের সময় না। তবুও বিরক্ত হোন জহির সাহেব। দরজার সামনে মাজেদ মিয়া একা দাঁড়িয়ে। হাতে কাগজের ঠোঙায় আপেল, কমলা, আঙুর – আরও কী কী যেন ফলফলারি।

জহির সাহেবের মাথায় আগুন খেলা করে –
” স্কুলটা তোমার জেনেও আমি গিয়েছিলাম শুধুমাত্র বাচ্চাদের কথা ভেবে। এই তোমার স্কুলের শিক্ষা? এই শিখাচ্ছো  ছাত্রদেরকে মাজেদ মিয়া? এভাবে মগজ ধোলাই করছো? তোমার স্কুল আমি বন্ধ করবো মাজেদ মিয়া। খবরদার! তুমি আর কোনোদিন আমার সামনে আসবে না। এগুলো নিয়ে দূর হও, যা–ও।  আবার যদি দেখি, আমি তোমাকে ধরিয়ে দেবো মাজেদ মিয়া।”

গলা খাদে নামিয়ে মাজেদ মিয়া মিনমিন করে বলে, “ভুল হয়েসে ভাই। আপনি তো আমারে বহু আগেই মাফ করে দেসেন। পুরনো কথা টেনে কী লাভ?”

জহির সাহেবের রক্তে তখন একাত্তর টগবগ করে – “তোমাকে দয়া করে আমরা শুধু প্রাণে মারিনি। সেদিন আমরা তোমাকে ক্ষমা করিনি। স্পষ্ট জেনে রাখো মাজেদ মিয়া, একজন মুক্তিযোদ্ধা কোনোদিন একজন রাজাকারকে ক্ষমা করতে পারে না।”
সেইরাতে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন জহির সাহেব।

স্কুলঘরের সামনে খেলার মাঠের বদলে এক বিস্তীর্ণ হলুদ শর্ষে ক্ষেত। এক দংগল স্কুলের ছেলেমেয়ে মনের আনন্দে দৌড়ে দৌড়ে পড়ছে – ” আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে? তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে “..
পতাকা হাতে কোত্থেকে যেন ধেয়ে আসে তিনটে খুব চেনা মুখ – তাদের মুখের “জয় বাংলা” ধ্বনিতে ঘুমের মধ্যে কেঁপে ওঠেন জহির সাহেব। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যায়।

আজ ২৬শে মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়, গৌরবদীপ্ত এক দিন। 
শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.