মাতৃত্ব দেশে এবং বিদেশে 

0
তামান্না ইসলাম:
আমার দুই সন্তানের জন্ম দুই দেশে, সঠিকভাবে বলতে গেলে দুই মহাদেশে। একজনের জন্ম বাংলাদেশে, আরেক জনের কানাডায়। 
প্রথম মাতৃত্ব যে কোনো মেয়ের জন্য নিঃসন্দেহে এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে আমাদের দেশে, যেখানে মেয়েদেরকে সন্তান ধারণ প্রক্রিয়া, জন্মদান, লালন পালন এগুলো সম্পর্কে কোনরকম  শিক্ষাই দেওয়া হয় না। নিম্নবিত্ত বা কম শিক্ষিত পরিবারে হয়তো অনেক ভাইবোন থাকে, এতে করে ছোট ভাইবোনের জন্ম, লালন পালন দেখে মেয়েদের কিছুটা শিক্ষা হয়।

তামান্না ইসলাম

কিন্তু সমস্যায় পড়ে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত, নিউক্লিয়ার পরিবারের মেয়েরা। আমাদের পরিবারগুলোতে মেয়েদের সব ধরনের শারীরিক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা নিষিদ্ধ, একে এক ধরনের অসভ্যতা হিসাবে দেখা হয়। হাসপাতালগুলোতেও সন্তান ধারণ, বিশেষ করে জন্মদানের সময় এবং তারপরে কী কী সমস্যা তৈরি হতে পারে, কোন কোন বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে, সেগুলো নিয়ে কোনো ট্রেনিঙের ব্যবস্থা নেই।

অথচ আমার কাছে মনে হয় আমার জীবনে আমি যতো কাজ করেছি, তার ভিতরে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল আমার প্রথম সন্তানের জন্ম এবং তার লালন পালন। যদিও জন্মের পরে মা, খালাদের সাহায্য পেয়েছি কিছুদিন, কিন্তু আমার কোনরকম মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। কোন ধারণাই ছিল না যে মাতৃত্ব হচ্ছে মেয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। 
আমার ছেলের জন্ম ঢাকার নামকরা হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। ডাক্তারও আমার পরিচিত ডাক্তার। অপারেশনে কোন অযত্ন হয়নি, বিপত্তি হলো তারপর থেকেই। সিজারিয়ানের পর আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় পোস্ট অপারেটিভ সেকশনে। আমার জীবনে সেটাই প্রথম অপারেশন। যদিও অপারেশনের সময় পুরোপুরি অজ্ঞান করা হয়নি, কিন্তু অপারেশনের পর প্রচণ্ড খারাপ লাগছিল। এটাই স্বাভাবিক। অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব থাকে অনেকক্ষণ, সেইসাথে শক্তিশালী পেইন কিলারের। প্রচণ্ড মাথা ঘুরাচ্ছিল, বমি আসছিল আর চারিদিকে একটা ঝিমঝিমে ভাব। সেই অবস্থাতেই আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি যে কর্তব্যরত নার্সরা রোগীদের দিকে কোনো খেয়াল না করে উচ্চস্বরে গল্প করে যাচ্ছে।
আমার চোখ যদিও বন্ধ। চেতন-অচেতন এর মাঝে আছি, তার মাঝে উচ্চস্বরে একেকটা শব্দ আমার কানে কেমন যেন হাতুড়ির মতো শব্দ করছে, বুকের মাঝে এক ধরনের অস্থিরতা, খালি মনে হচ্ছিল চিৎকার করে বলি, ‘আপনারা দয়া  করে থামুন, আমাকে একটু শান্তিতে ঘুমুতে দিন।’  কিন্তু ঠোঁটও খুলতে পারছি না চেষ্টা করেও। খালি একটা বোবা কষ্ট বুকের মাঝে ঘুরপাক করছে। যারা এই অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যায় নাই, তারা এটা বুঝবে না। ভাবতে অবাক লাগে যারা নার্সিঙের মতো মহৎ পেশায় এসেছে, তারা কেন এই সামান্য সৌজন্যবোধ, সহানুভূতি দেখাতে পারে না? 
পরে যখন কেবিনে দেওয়া হলো, তখন শুরু হলো আরেক যুদ্ধ। আমার নবজাত শিশুকে অনেক অনুরোধের পর আমার কাছে আনা হলো। নিয়ে এসেই বলে, ‘বেবিকে খাওয়ান’। এমন একটা ভাব যেন প্রতিটা মেয়ে জন্মের পর থেকেই কোন না কোন শিশুকে বুকের দুধ খাইয়ে আসে। এটা যে প্রথম মায়ের জন্য সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যেক মা আর শিশুরই আলাদা আলাদা স্টাইল থাকে, বা অভ্যস্ত হতে সময় লাগে, এসব কোনো সাধারণ জ্ঞানই তাদের নেই।
কোন রকম  সাহায্য সহযোগিতা তো নয়ই, বরং কর্কশ ভাষায় বিভিন্ন নেগেটিভ কথা বলে আমার মানসিক অবস্থা শারীরিক অবস্থার মতোই খারাপ করে দিয়েছিল তারা। আমার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার মতো অবস্থা, নিজের অক্ষমতায় নিজেই কাঁদছি, অথচ সেই সময় তাদেরই আমার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব ছিল। আমাকে যে কেউ সঠিক পদ্ধতিটা দেখিয়ে দিচ্ছে না সেটা বুঝতেও কয়েকদিন পার হয়ে গেছে, যেই সময়ে বাচ্চাকে তারা বোতল দিয়ে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি একটি ধৈর্য সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এবং এ সময়ে মায়ের প্রচুর মানসিক সাপোর্ট দরকার হয়। 
নার্সদের সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারা আমি দেখেছি আমার দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময়। সে সময় আমার পাশে আমার মা, খালা, শাশুড়ি কেউ ছিল না। অথচ প্রথম বাচ্চার জন্মের অভিজ্ঞতা এবং হাসপাতালের নার্সদের অপরিসীম মমতা, কর্তব্যপরায়ণতা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে, এবং পুরো ব্যাপারটাই অনেক সহজ করে দিয়েছে। আধুনিক টেকনোলজি নয়, বরং নার্সদের নিজেদের পেশা সম্পর্কে ভালোবাসা, রোগীদের নিজের আত্মীয় পরিজনের চেয়েও আপন ভেবে সেবা করা এবং মাতৃত্ব পূর্বকালীন বিভিন্ন মানসিক প্রস্তুতি কানাডায় আমার সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতাকে অনেক আনন্দদায়ক করেছে।
একটা ছোট ঘটনা না বললেই নয়। আমার দ্বিতীয়বারও সিজারিয়ান হয়েছে। বিকেলের দিকে আমাকে রুমে আনা হয়েছে। কর্তব্যরত নার্স আমাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে তারপর বাড়ি যাচ্ছে। তার ডিউটির সময় শেষ। যাওয়ার সময় সে খুব লজ্জা পেয়ে আমাকে বললো, ‘আমার তোমার কাছে আরও কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু আমার বাচ্চার ডে কেয়ার বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আর দেরি করা যাচ্ছে না। আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
আমার ছেলেও ডে কেয়ারে যায়, আমি জানি এই সময়টা কী গুরুত্বপূর্ণ। আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি ‘তোমার তো ডিউটি শেষ।’ ও আর কথা না বাড়িয়ে হেসে চলে গেল। ঘণ্টাখানেক পরে আমার মাথার কাছের ফোনটি বেজে উঠলো। সেই নার্স বাসায় গিয়ে আমাকে ফোন করেছে আমার খোঁজ নেওয়ার জন্য। এরকম পরমাত্মীয় একজন নার্স পাশে থাকলে রোগীর আর কিছু লাগে? এমনকি রোগী যদি হয় নতুন মা? 
লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৮৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.