মাগো, তোমাদের লড়াইয়ের কাছে আমরা ঋণী

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

ডুমনির ছোট্ট দোতলা বাড়িতে শিল্পের চাষবাস। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে দোতলা থেকে নামলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, সাধারণ একটা লাল শাড়ি আর চিরচেনা বড় টিপ কপালে।

বললাম, আপনার নিজের বাড়ি? তিনি হাসলেন, ‘আরে না। আমার নিজের বাড়ি হবে না, নিশ্চিত থাকো’।

আমি তাঁর ধানমন্ডি ৩ নম্বরের বাড়িটাতে গিয়েছি। ছোট্ট উঠানে সাধ্যমতো প্রাকৃতিক বাগান। কোনকিছুর আড়ম্বর নেই। গাছের শেকড়-বাকড়, ফেলে দেওয়া কাঠ দিয়ে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর শিল্পকর্ম। বসার জন্য গাছের বাতিল গুঁড়ি, যার একপাশে আবার সবুজ পাতা ছেড়েছে! এতো ভালো লাগতো!

উনি বলতেন, ‘তোর যখনই ইচ্ছে করবে, আসবি, এই উঠানে বসে থাকলেও দেখবি মন ভালো হয়ে যায়। আমি না থাকলেও অসুবিধা নেই। আসিস’।

নাগরিক নানান পাকচক্রে পড়ে শুধুই মন খারাপের ওষুধ নিতে ওই উঠোনে যাওয়া হয়নি। ডুমনির বাড়িতে বসে সেসবের স্মৃতিচারণা করি আমরা। ২০০৪ সালে প্রথম ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম আমি। তারপর আরও অনেকবার। কিন্তু ঘুরে-ফিরে “আজকের কাগজ” এ ছাপা হওয়া ওই প্রথম ইন্টারভিউ এর কথাই বলেন তিনি। সেখানে একটা কথা আমার খুব মনে ধরেছিল।

স্বামী ভালুক সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, “ভালুক সবসময় আমার পাশে ছিল। কিন্তু জানো কী, না থাকলেও আমি যে মরে যেতাম, এমন না কিন্তু। হয়তো একাই লড়াই করতাম। আর বলেছিলেন, প্রথম প্রথম যখন সুলতানা কামালরা কাজটা শুরু করলো, আমাকে বলতো, আপনি যে সব প্রকাশ করতে চান, ভেবে-চিন্তে করছেন তো? আপনার সংসার আছে, ছেলে-মেয়ে আছে…আমি বলেছিলাম, এটা আমার জীবনের সত্য। আমাকে এই সত্য প্রকাশ করতে হবে। ছেলেমেয়েরা যদি মানতে পারে ভালো, না মানতে পারলে তারা বড় হয়েছে, তাদের সিদ্ধান্ত তারা নেবে। প্রথম প্রথম যখন এসব বর্ণনা করতাম, তখন প্রায়ই অজ্ঞান হয়ে যেতাম ওইসব বীভৎসতা মনে করে।”

আমি ডুমনির বাড়িতে বসে জানতে চাই, এখনও কি তাই মনে করেন ভালুক সম্পর্কে? তিনি বলেন, অবশ্যই।

অফিসের ক্যামেরায় ইন্টারভিউ শুরু হয়। তিনি কিন্তু কথা বলেন খুব ক্যাজুয়ালি। ক্যামেরা চলছে কী চলছে না তার ভ্রুক্ষেপ নেই। বললেন, এখনও কত নারী এরকম ঘটনা চেপে আছে। সমাজের ভয়ে, সংসারের ভয়ে। বিরাট সে সমাজ। কিন্তু এইসব ভয় ভাঙতে হবে। এসব ভয় না ভাঙলে মুক্তিযুদ্ধে নারী ধর্ষণের যে ভয়াবহতা ছিল, তা বোঝানো যাবে না। আর আমি তো সমাজ ভেঙে ভেঙেই এগিয়েছি। সমাজ তো আমি তৈরি করবো। রাষ্ট্রের কিন্তু এখন দায়িত্ব এইসব বীরনারীদের খুঁজে বের করা।

এখনও কি আগের মতোই মনে পড়ে ৭১ এর স্মৃতি? বললেন, “শোন, একটা ঘটনা বলি। ৭১ এর সম্ভবত আগস্ট মাস। আমি অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়ি। কার বাচ্চা তা বলার উপায় ছিল না। কারণ কতবার নির্যাতিত হয়েছি, তার গোনাগুনতি নাই। বাচ্চা যখন পেটের মধ্যে বড় হচ্ছে, কী যে অসহ্য যন্ত্রণায় একেকটা দিন পার করেছি আমি। আমার মনে হতো এইবার আমি মরবো। গলায় দড়ি দেবো, নয়তো বিষ খাবো। সমাজ কী বলবে তার চেয়েও বেশি মনে হচ্ছিল, এটা শত্রুর সন্তান। আমি এই শিশুকে মাতৃত্ব দিতে পারবো না।”

কীভাবে বাচ্চা অ্যাবরশন করেছিলেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বললেন তা। বললাম, দীর্ঘ একটা সময় পার করেছেন স্বাধীনতা বিরোধীদের শাসনামলে। কেমন লাগতো তখন?

বেশি কথা বললেন না, শুধু বললেন, ‘মনে হতো অস্ত্র নিয়ে যদি যুদ্ধ করতে পারতাম’!

এখনকার নারীদের কীভাবে দ্যাখেন? প্রশ্ন শুনে থমকালেন একটু। বললেন, ‘দ্যাখো এই যে আমি বড় টিপ পরি, ইচ্ছেমতো মালা পরি, খুব সাজি, এটাও কিন্তু প্রতিবাদ। আমি প্রতিবাদ করি এভাবেই। আর এটা যে প্রতিবাদ, তাও লোকে ঠিকই ধরতে পারে। আমাকে সেদিনও একটা অনুষ্ঠানে একজন পরিচিত মহিলা বলছিলেন, কী এতো সাজ? বিয়ে নাকি? আমি যে অনুষ্ঠানে গিয়েছি, সেটাতো আমারই মতাদর্শের মানুষদের। তো তারাও সকলে আমার এই সাজ, আমার এই টিপ মানতে পারে না। এই বয়সে এসেও আমাকে এই শ্লেষের শিকার হতে হয়। তো নিজের মতাদর্শের মধ্যেও কিন্তু নারীবিদ্বেষী থাকে। সেখানে অন্যরা কী করে মানতে পারবে?

এইটাই সমাজ। আর এই সমাজ ভেঙে ভেঙেই এগুতে হয়। এখনকার মেয়েদের আমি বলবো, উপেক্ষার চেয়ে বড় শাস্তি হয় না। উপেক্ষা করতে জানতে হবে। আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজের কাজটা করে যেতে হবে। যেকোনো শ্লেষকে চড় মেরে এগুতে হবে। শর্মিলা বসু নামে একজন আমার সম্পর্কে গবেষণা করে এই রায় দিয়েছেন, আমার উপরে হওয়া রেইপ নাকি আমি এন্টারটেইন করেছি, মানে আমার ইচ্ছা ছিল এরকম বলার চেষ্টা। আজও যখন সেসব দিনের কথা ভাবি, আমার মনে হয়, নারীর বেদনা, অন্তর্গত যন্ত্রণা, নারীর টিকে থাকার লড়াই আসলে এসমাজ গ্রহণই করতে শেখেনি। তা না করুক। আমি আমার কাজটা করে যাই।”

শেষ ফাল্গুনের রুক্ষ্ম একটা হাওয়া উঠছিল ডুমনীর বাড়ির এক চিলতে উঠোনে। আমি উঠে আসবো। বললাম, আরেকদিন আসবো, কখন এলে সুবিধা হয়? “দুপুরবেলা ঘুমের সময়… প্রিয়ভাষিণী হাসেন। আমি ঘুমাই না। সারা দুপুর কাজ করি। কাজ করাই। আসিস, যখন ইচ্ছে। ভাস্কর্য গড়ার কাজ চলছে”।

আমি ভাবতে থাকি, কী দারুণ, সংগ্রামময়, বেদনাকাতর, আবার গৌরবের একটা জীবন কাটালেন এই নারী! সার্থক জনম মাগো!

 

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.