নারী সাংবাদিকতা: পর্দার পেছনে কিছু ভয়ংকর গল্প

মারজিয়া প্রভা:

ধরি নারী সাংবাদিকটির নাম জয়িতা। কাজ করেছেন টানা সাত বছর এক নামকরা বেসরকারি টেলিভিশনে। একদিন সন্ধ্যায় অ্যাসাইনমেন্ট থেকে ফিরে এসে তাকে ডাকা হলো এইচআর এর রুমে। ঘরে ছিল আরও দুজন। ক্রিমিনালের ক্রুর হাসি তাদের চোখে। জয়িতার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে নিলো লোকগুলো। ঘরের দরজা লক করে দিলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো, “কোম্পানি আপনাকে আর চাইছে না। আপনি এক্ষুণি রিজাইন লেটারে সাইন করুন”।

এতোগুলো লোকের শ্যেন দৃষ্টির কাছে কুঁকড়ে গেলো জয়িতা। চাপের মুখে এবং ভয়ে-আতংকে রিজাইন লেটারে সই করলো। এরপর একগাদা সিকিউরিটি দিয়ে বের করে দেওয়া হলো জয়িতাকে। পরদিন হাউজে জানিয়ে দেওয়া হলো, জয়িতাকে বিদায় দেওয়া হয়েছে। সেই পদে এলো অফিসের চেয়ারম্যানের পরিচিত তিনজন। চাকরি হারানোর একবছর পরেও জয়িতা জানে না কেন তার চাকরিটি গিয়েছিল সেই দিন!

আমরা তুলে ধরতে পারি চালচলনে ভীষণ স্মার্ট মিতুর (ছদ্মনাম) কথা। প্রথম সাংবাদিক জীবন শুরু বাংলাদেশের নামকরা একটি চ্যানেলে। চাকরির প্রথম দিন থেকেই দেখলো, বয়সে এবং পদমর্যাদায় বড় একজন পুরুষ সহকর্মী মেয়েদের নিয়ে খেতে যায়, মেয়েদের গালে হাত দেয়, ইঙ্গিতপুর্ণ দৃষ্টি দেয়। কথায় কথায় একদিন মিতুর গালেও হাত দিলো। মিতু সোজা উপর মহলে অভিযোগ করলো। কিন্তু উল্টা শুনতে হলো, ‘কই, আর কোনো মেয়ে তো অভিযোগ করেনি এমন, আপনার বেলায়ই ঘটলো’? ‘তদন্ত কমিটি’ হয়, সঙ্গে খেতে যাওয়া মেয়েরা কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি। মিতু নিজেই ছেড়ে আসে চ্যানেলটি। এই ঘটনার পর একবছর বসে ছিল মিতু। পরে অন্য এক অভিযোগে ওই লোককে বের করে দেওয়ার পরে মিতু জব পায় আবার ওই চ্যানেলে।

ক্রাইম বিটে কাজ করে শিল্পী (ছদ্মনাম) নামের একজন জার্নালিস্ট। এক গার্মেন্টসে আগুন এর লাইভ নিউজ করতে গিয়েছে। একপর্যায়ে দেখে তাকে ঘিরে আছে গার্মেন্টসের লোকেরা। এই মুহূর্তে তাদের বিরোধিতা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। চড়াও হবে। লাইভে কল এলো তখনই, ‘নিরপেক্ষ কথাবার্তা’ বলতে থাকল শিল্পী। কিন্তু হাউজের ঠাণ্ডা রুমে বসে অন্যরা বলছে, “ওদের পক্ষে কেন কথা বলছো! বিপক্ষে বলো”।

টিআরপি ম্যাটারস! সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নয়! এরকম হাজার হাজার গল্প প্রতিদিন ঘটছে। যেসব সাংবাদিক নিজের জীবনের নিরাপত্তা তোয়াক্কা না করে প্রতিদিন অন্যদের জীবনের গল্প তুলে আনছেন, তাদের দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস, তাদের কথা বলার জায়গাটাও আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি, তাদের বিরুদ্ধে ঘটা অন্যায়গুলো চ্যালেঞ্জ করতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও নেই। যা আছে তাহলো সাংবাদিকদের কিছু সংগঠন। কিন্তু সেইসব সংগঠন কতোটা একজনের পাশে দাঁড়ায়, তা বলা বাহুল্য। নারী সাংবাদিক সংগঠনও আছে। তাদেরকেও পাশে দাঁড়াতে দেখা যায় না খুব একটা।

সাংবাদিক মানেই ঝুঁকিপূর্ণ জীবন। চ্যালেঞ্জ নিতে যারা ভালোবাসে তারাই সাংবাদিকতাতে আসে। কিন্তু নিজের সেফটি আগে না নিরাপত্তা! সাংবাদিক যখন নারী হয়, তখন খবর সংগ্রহের নিরাপত্তার বাইরেও আরও দুটি নিরাপত্তা নিয়ে তাকে ভাবতে হয়। একটা হচ্ছে ফিল্ডে নানা মানুষ, অফিসের পুরুষ সহকর্মী কিংবা বসের হাত থেকে নিজের শরীরের নিরাপত্তা। অন্যটি মাতৃত্বের সময়ে আর্থিক নিরাপত্তা।

এই নিরাপত্তা নিয়ে নারী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা জানতে এবং বিপদ প্রতিরোধ করার বিভিন্ন মেকানিজম নিয়ে সচেতন করতে গত ১৬ই মার্চ থেকে ১৮ই মার্চ ICS ( Institute of Communication studies) আয়োজন করেছিল এক তিনদিনব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালার। এতে প্রায় ১৫ জন নারী সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। ইউনেস্কো পুরা ফান্ড করেছে ট্রেইনিংটির। উইমেন চ্যাপ্টারকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমিও ছিলাম সে কাতারে।

সাইবার জার্নালিজম এর সাথে যুক্ত থাকার কারণে, আমার সাইবার সিকিউরিটি নিয়েই জ্ঞানটা বেশি। কিন্তু যারা প্রিন্ট এবং টিভি মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত তাদের অভিজ্ঞতা শুনে শিউরে উঠেছিলাম সেদিন।

কোনো একটা ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনায় নিউজ করতে গেলে একজন সাংবাদিক কি পরবে না পরবে সেটা সে নিজেই ভালো বুঝে! তাকে কখন শাড়ি, কখন কুর্তা, কখন শার্ট বা কখন সালওয়ার পরতে হবে সেটা সে জানে! কিংবা রিপোর্টিং ড্রেসকোড নিয়ে কথা বলতে পারে অফিস। কিন্তু একটা জার্নালিস্ট রিপোর্টিং এর বাইরে হাতে বালা বা ব্রেসলেট পরলো কীনা, শাড়ি বা শার্ট পরলো কীনা, তা নিয়েও মাথা ব্যথা হয় অফিসের। আর সাংবাদিক যদি নারী হয় তাহলে তো কথাই নেই! তাকে চলনে-বলনে কতোটা “মেয়ে” লাগছে সেটা নিয়ে রীতিমতো রিসার্চ শুরু হয় কলিগদের মধ্যে।

তার উপর তো রয়েছেই অফিসের বাইরে রাতের বেলা পুরুষ সহকর্মীর অনাকাঙ্ক্ষিত ফোন। সময়ে-অসময়ে একলা রুমে ডাকা। অযাচিতভাবে গায়ে হাত দিয়ে ফিজিক্যাল হ্যারাস করে, যার সঙ্গে গায়ে হাত দেওয়ার সম্পর্কটা কোনদিন ছিলই না!

পুরো প্রশিক্ষণ জুড়েই মন খুলে নিজের কষ্টের অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করতে পেরেছে নারী সাংবাদিকরা। পরবর্তীতে যাতে নিজেদের সমস্যাগুলোর কথা, অভিজ্ঞতাগুলোর কথা বলতে পারে, সেজন্য একটা সাপোর্ট সেন্টারের ভীষণ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন ট্রেইনিং এ উপস্থিত প্রতিটি নারী সাংবাদিক।

তাছাড়া প্রতিটি হাউজে একটি করে অভিযোগ বাক্স এবং জেন্ডার নিরপেক্ষ একটি কমিটি গঠন করার কথা সবাই বলেছেন। এর বাইরেও ঝুঁকিপূর্ণ খবর করতে গিয়ে কোন সমস্যায় মুখোমুখি হলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য হেল্প লাইনের ব্যবস্থা চেয়েছেন তারা। প্রতিটি সাংবাদিকের জন্য একটি আলাদা বীমা থাকা খুব জরুরি। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে বিশ্বে বহু সাংবাদিক নিহত হয়েছে। তাই এই বীমা থাকাটা খুব জরুরি, যা জেলা প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সব সাংবাদিকের জন্য একই থাকবে।

এই ট্রেইনিং থেকে যা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হলো তাতে বোঝা গেলো, আসলে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কখনোই হাউজের কাছে ম্যাটার করে না। ম্যাটার করে ইউনিক সংবাদ! ম্যাটার করে টিআরপি। টর্নেডোর ছবি তুলতে পারলে বাহবা পাওয়া যাবে অফিসের! কিন্তু সেই ছবি তুলতে গিয়ে আহত কিংবা নিহত হলে কিচ্ছু যায় আসে না হাউজের। অন্তত অফিস পলিসি এমন কিছু দেখায়নি যে যায় আসে।

দুফোঁটা চোখের পানি আর শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে আঁকুপাঁকু স্মৃতিচারণ! তাও যদি নামকরা সাংবাদিক হোন, তবেই ওইটুকু জুটতে পারে কপালে। নাহলে তাও নেই!

জানি না এই ট্রেইনিং নীতিনির্ধারকদের কতটুকু বোঝাতে সক্ষম হবে! তবুও সাধুবাদ জানাই এই উদ্যোগকে। একটু একটু করেই তো বদল আসবে!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.