নারীর পাশে নারীও থাকুক

সালমা তালুকদার:

সম্প্রতি একটা ওয়ার্কশপে গিয়েছিলাম। কর্মজীবী নারীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে ওয়ার্কশপ ছিলো। এই রকম অনুষ্ঠানগুলোতে যাওয়া উচিত আসলে। না গেলে বোঝা যায় না কত নারী কত ভাবে কত কষ্ট করছে। আর অনেকের কষ্ট, কষ্ট থেকে উঠে আসার গল্প, এগুলো শুনলে নিজেকে আর একা মনে হয় না।

সালমা তালুকদার

একটা মেয়ে চোখে কত স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘর করতে আসে। ২/৪ বছর পর দেখা যায় মেয়েটা আর ভালো নেই। তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা। অন্যের সুখের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়াই যেন তার কাজ। এজন্যই যেন সে দুনিয়াতে এসেছে।একসময় মেয়েটা কাঁদতে ভুলে যায়। কাঁদলে সন্তান মন খারাপ করবে তাই। হাসতে ভুলে যায়। বেশি হাসলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন বলবে,পাগলের মতো সারাদিন শুধু হাসে। স্বপ্ন দেখা ভুলে যায়। কারণ যে স্বপ্ন সে দেখবে তা কখনোই পূরণ হবে না। সে স্বপ্ন দেখে কী লাভ! মেয়েটা তখন শুধু দায়িত্ব পালনে নিজেকে নিয়োজিত করে।

বিয়ে না করেও যে একটা মেয়ে ভালো থাকে তাও কিন্তু না। একটা বয়সের পর মেয়েটার বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন আর মেয়েটাকে ঐ পরিবারে দেখতে চায় না যে পরিবারে ছোটবেলা থেকে সে বড় হয়েছে। সেই পরিবারটা একসময় খুব অচেনা মনে হতে থাকে।

দুটো কারণে এরকম হতে পারে। প্রথমত যে কোনো কারণেই হোক মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত মেয়েটা নিজেই বিয়ে করতে চাচ্ছে না। একটা মেয়ে বিয়ে করতে চাইছে না, সেটা তো মেয়েটার ব্যক্তি স্বাধীনতা, তাই না! মেয়েটা যদি জীবনে অনেক বড় হতে চায়, প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তাতে সমস্যাটা কোথায়? মেয়েটার কি কোনো একটা পুরুষ মানুষের সাথে থাকাই লাগবে? বাচ্চা পয়দা করাই লাগবে? সংসার আর রান্না-বান্না করাই লাগবে? অন্যের দ্বারা চালিত হওয়াই লাগবে?

স্ব-ইচ্ছায় যদি একটা মেয়ে বিয়ে করতে চায় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। কারণ সে বিয়ে করতে চেয়েছে। কিন্তু জোর করে কেন একটা বিয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়া? এরকম একজন নারীর সাথে পরিচয় হলো সেদিন, যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বিয়ে করতে চায় না বলে সবার কাছে সে আজকে অপরাধী। অথচ বিয়ে দেয়ার পর আদৌ মেয়েটার সুখ হবে কিনা, সেটা জানার প্রয়োজন কেউ মনে করে না।

সুখ না হলে মেয়েটা যে আবার নিজের জীবনটা নতুন করে শুরু করবে, সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে হয় না। কারণ বিয়ের প্রথম কয়টা বছরে স্বামীর ভালোবাসায় সে এক রকম পঙ্গু হয়ে যায়। স্বামীকে সকালে কাজে পাঠিয়ে তার জন্য দুপুরের রান্না করে। ঘর গুছিয়ে গান শুনতে শুনতে স্বামীর আসার অপেক্ষা করে। স্বামী এলে তার সাথে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া করে, গল্প করে। তারপর সন্তান জন্ম দেয়ার পর যখন স্বামীর আরেকটা রূপ চোখে পড়ে, এতোদিনের মজার মজার রান্না করা খাবার স্বামীর মুখে বিস্বাদ মনে হয়, আর সেটা প্রাণপ্রিয় স্বামী ফলাও করে স্ত্রীকে বলে, তখন কিন্তু মেয়েটা প্রথমে অবাক হয়। পরে কষ্ট পায়। তারপর কাঁদে। উম্মাদের মতো লাগে নিজেকে। একদিন ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যায়।

এতোসবের মাঝখানে কিন্তু বাবা-মা, আত্মীয়-বন্ধুদের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু একসময় যারা বিয়ে না করতে চাওয়া মেয়েটাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিল, এখন আর তারা কথা বলে না। যদিও বা বলে, মানিয়ে নিতে বলে বাচ্চার মুখ চেয়ে।সমাজের কথা ভেবে। আমার কথা হচ্ছে, মেয়েটার বিপদে যদি সাহায্যই করতে না পারে, তাহলে তাকে জোর করে বিয়ে দেয়া কেন? আর বিয়েই যদি দিতে হয়, তাহলে মেরুদণ্ড ভেঙ্গে বিয়ে দেয়া কেন?

মেয়েটাকে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেই। তারপর বিয়ে দেই! যাতে স্বামী নামক পদার্থটির সাথে যুদ্ধে টিকে থাকা যায়।আর টিকতে না পারলে একা থাকা যায়! কেন যেন সমাজ মেয়েদের একা থাকাটা মেনেই নিতে পারে না। একা থাকা মানেই যেন মেয়েটা পথভ্রষ্টা, নষ্টা।

ওই ওয়ার্কশপে আরো একটা ব্যাপার উঠে এসেছে। মেয়েরাই যেন মেয়েদের শত্রু। যেসব মেয়ে ঘরে বসে শুধু ঘরকন্যা সামলায়, তারাই অন্য মেয়েদের বাইরে যাওয়াটা পছন্দ করে না। পেছনে কথা বলে। সামনে খোঁচা মেরে কথা বলে। পেছন থেকে প্রতিনিয়ত টেনে ধরে। একজন নারী দুঃখ করছিলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর বোনকে দিয়েই তিনি নির্যাতিতা হয়েছেন। শূন্য থেকে তিনি আজ পূর্ণ। কিন্তু তাকে প্রতি পদে সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমার মনে হয় ঘরে বসা যেসব নারী অন্য নারীর মানসিক সমস্যার কারণ হোন, তারা নিজেরাও কিন্তু ভালো নেই। আর নিজেরা ভালো নেই বলেই অন্যকে ভালো দেখতে তাদের ভালো লাগে না।

ওয়ার্কশপে একজন পুরুষও ছিলেন আমাদের এতোগুলা নারীর মাঝখানে। তিনি একজন সাইকোলজিস্ট। তিনি এক পর্যায়ে বললেন, একজন নারী যখন বাইরে কাজ করতে যান, বা ঘরে থাকেন, তিনি অনেক কথা শোনেন, অনেক বাজে ব্যবহার পেয়ে থাকেন। সেগুলো চুপচাপ হজম না করে কিছু বলা উচিত। এমন কিছু যাতে যে বলছে সে চুপ হতে বাধ্য হয়। কথাটা আমার অনেক ভালো লেগেছে।

প্রতিনিয়ত নির্যাতিতা নারীরা চুপ থাকেন বলেই তারা নির্যাতিতা। সমাজ এগিয়েছে। কিন্তু আমরা নারীরা, নারীদের জীবন যেন একই জায়গায় থেমে আছে। ঘরে শান্তি নেই, বাইরে কাজের জায়গায় শান্তি নেই, সন্তানকে কষ্ট করে মানুষ করার পরও শান্তি নেই। যেন কষ্ট পাওয়ার জন্যই নারীদের জন্ম।

তবে সবাই যে নির্যাতিতা তা কিন্তু না। এর মধ্যেও ঘরে বাইরে অনেক মেয়ে অনেক ভালো আছেন। তাদের পুরুষ সঙ্গী, পুরুষ কলিগ, পুরুষ বন্ধুগুলো অনেক ভালো। মেয়েবন্ধু গুলো তাদের মানসিক শান্তির জায়গা। যারা ভালো আছেন, শান্তিতে আছেন, তারা যারা ভালো নেই তাদের পাশে দাঁড়াবেন। ঘুরে দাঁড়াতে শেখাবেন এই প্রত্যাশা থাকলো।

আমি ভালো আছি কিন্তু, আমার পাশের ফ্ল্যাটের একজন নারী যেন নির্যাতিতা না হোন, তিনি যেন তার মনের কথা খুলে বলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারেন আমরা সেই সুযোগ তৈরি করে দেবো। কষ্টের কথা লুকিয়ে জীবনটাকে নরক বানানোর মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই। বরং নিজেদের এই মহা মূল্যবান জীবনটা যেন অর্থবহ করে তুলতে পারি সেই চেষ্টাই আমাদের করতে হবে।

জগতের সকল নারী ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিক। শুভকামনা নিরন্তর।

(সালমা তালুকদার, প্রভাষক (বাংলা বিভাগ),নর্থ ওয়েস্টার্ন কলেজ, মিরপুর,ঢাকা।

শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.