পুরুষের ইচ্ছাতেই বদলে যায় মেয়েরা!

নাসরীন রহমান:

গত দুদিন থেকে ফেসবুকের নিউজফিডে একগুচ্ছ ছবি সত্যি আমার মনোযোগ কাড়ছে ভীষণভাবে, যা নিয়ে কিছু বলতেও চাইছি। তাঁকে আমি জানি না, ফেসবুকে সকলের সাথে জানাশোনা থাকবে এমনও নয়, এখানে ফেসবুক ইউজাররা আসেন সকলের সাথে চিন্তাধারার আদান প্রদান করতে। এই ভদ্রলোক আমার ফেসবুক বন্ধুলিস্টেরই একজন, তিনি তাঁর বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে ফেসবুকে তাঁদের দাম্পত্য জীবনের বিভিন্ন সময়ের একগুচ্ছ ছবি দিয়েছেন।

তাঁদের দাম্পত্যের এই ছবিগুলোর শিরোনামটিও দিয়েছেন অত্যন্ত চমৎকার, ‘যুগলবন্দী’।

নাসরীন রহমান

এই যুগলবন্দী’ছবিগুলো তাঁদের দাম্পত্যের বিভিন্ন সময়কার; প্রথম দিককার ছবিগুলোতে দেখা যায় এই দম্পতিকে বেশ ফ্যাশননেবল পোশাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে ছবিগুলোতে পরিবর্তনটা চোখে পড়ে; ভদ্রলোকের পোশাকে ধর্মীয়পরিচয়টা প্রকাশ পেতে থাকে।

এক সময়ে এসে দেখা যায় ভদ্রলোক বেশ লম্বা দাড়ি রেখেছেন, বাহারি টুপি, লম্বা কোর্তা পরিহিত; বেশ বোঝা যায় তিনি ইসলামী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ তখন!

ভদ্রমহিলা তখনও আগের মতোই; কিন্তু ভদ্রলোকের দেওয়া যুগলবন্দী’ ফ্রেমের শেষ ছবি দুটিই বোধহয় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আমাকে অবাক করে দিতে, সেখানে অর্থাৎ ইদানিংকার ছবিগুলোতে ভদমহিলা রীতিমতোহিজাব‘ বা বোরখাপরিহিতা!

এই পর্যায়ে এসে এখানেই আমার বলার কিছু ছিল, আমি জানি না ভদ্রমহিলা বাধ্য হয়েছেন কিনা হিজাব‘ বা বোরখাপরতে স্বামীর চাপে; তা আমার পক্ষে জানা সম্ভবও নয়। কিন্তু ছবিগুলোতে একটু বুদ্ধি খাটিয়ে লক্ষ্য করলে কিন্তু দেখা যায় অনেকটা সময় পর্যন্ত ভদ্রমহিলা ফ্যাশনেবল পোশাকেই অভ্যস্ত ছিলেন, বা সেভাবেই চলছিলেন তাঁর স্বামীর পরিবর্তন সত্ত্বেও।

আমি একটি পরিবারকে জানতাম যেখানে পরিবারটির পুরুষ মানুষটি অর্থাৎ প্রচলিত ভাবে যাকে কর্তাবলা হয় (এ নামকরণ নিয়ে বিতর্ক আছে); তিনি প্রথম জীবনে বেশ ফ্যাশনেবল ছিলেন পোশাক, আচরণে; বিয়ে করেন শিক্ষিত পরিবারের সুশিক্ষিত একটি কন্যাকে, যেই মেয়েটি সুশিক্ষিত হলেও তেমন উগ্র ফ্যাশনেবল ছিলেন না; কিন্তু ভদ্রলোকের এই ব্যাপারটিই অপছন্দের ছিল, তিনি স্ত্রীকে চাপ দিতেন সবসময় পার্টিতে যেতে, বিভিন্ন আউট প্রোগ্রামে যেতে।

কিন্তু ভদ্রমহিলা একভাবে অভ্যস্ত জীবনে বড় হয়েছেন বলেই পারতেন না স্বামীর কথামতো নতুন ভাবে চলতে; এই নিয়ে স্বামী -স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি থাকতোই! একসময় ভদ্রমহিলা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন এইভেবে যে তিনি তাঁর স্বামীর পছন্দের না, বা পছন্দমতো হতে পারছেন না; এই হীনমন্যতাবোধ ভদ্রমহিলাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলে, একটা সময় তিনি মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন …।

এভাবেই চলছিল তাঁদের দাম্পত্য; মধ্যবয়সে এসে ভদ্রলোক কোনও কারণে হোক বা স্বেচ্ছায় অতিধার্মিক হয়ে যান! এবং ফের স্ত্রীকে চাপ দেন তাঁর এখনকার ‘ইচ্ছেমতো’ চলতে! অর্থাৎ হিজাব’ বা ‘বোরখা” অথবা মুখবন্ধনীপরতে!

প্রথমদিকে ভদ্রমহিলা চেষ্টাও করেন স্বামীর ইচ্ছেমতো চলতে, কিন্তু একসময় তাঁর বোধদয় হয় কত আর এভাবে স্বামীর ইচ্ছে পুতুলহওয়া যায়! এক দাম্পত্যে দু’দুবার সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী পরিবর্তন হতে হচ্ছে তাঁকে স্বামীর ইচ্ছেয়!
পুরুষতন্ত্রেরকী দাপট!!

আমার বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় (এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া) দেখতাম, একজন মহিলা তাঁর শ্বশুরমশাই যখন ছেলের বাসায় আসতেন, অনিচ্ছায় বোরখা পরতেন! শ্বশুর চলে যাবার পর আবার তিনি হিজাব‘, বোরখাছেড়ে দিতেন।
এখানে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, স্বামী নয় শ্বশুরভীতি!

কিন্তু সেই পুরুষতন্ত্রের ধারক-বাহকই তো পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করছে নারীকে হিজাব’ বা ‘বোরখাপরতে!

ধর্ম নিয়ে আমার কোনও আপত্তি নেই; আমি নিজেও নাস্তিক নই, কিন্তু ধর্ম যখন উপলব্ধিগত না হয়ে ব্যক্তির কাছে বাহ্যিক লোক দেখানোর বাগাড়ম্বরতা হয়ে যায়‘, সেখানেই আপত্তি আমার। অর্থাৎ মেয়েদের বাধ্য করা পুরুষতন্ত্রের ইচ্ছেমতো চলতে!

আমি যে দুটো ঘটনার উল্লেখ করলাম দুটো জায়গাতেই স্পষ্টত দেখা গেছে, ভদ্রলোক দুজনই প্রথমদিকে অন্যরকম জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন, তাঁরা যখন ধর্মীয় জীবনে অভ্যস্ত হলেন, তখন তাঁদের স্ত্রীদেরও বাধ্য করেন সেই জীবন যাপন করতে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন নারীরা এই জাতীয় ইচ্ছেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন; যা তাঁদের নিজেদের ইচ্ছের পরিপন্থী, বিশেষত প্রতিবাদের উপায় যেখানে তাঁদের সামনে খোলা!

এক্ষেত্রে অনেকে বলে থাকেন নারীরা তাঁদের ইচ্ছেয় পর্দা প্রথা মানছেন, কিন্তু ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ তা বলে না; অধিকাংশই স্বামীর ইচ্ছের প্রাধান্য দিতে যেয়ে তাঁদের কথা মেনে নেন, মেনে নেন এই কারণে যে সংসারে অশান্তি এড়ানোর জন্য। এই যে তাঁরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামীর হুকুম পালন করছেন, এতে কিন্তু তাঁদের অধস্তনতাই প্রকাশ পাচ্ছে।
উদার নারীবাদ বলে, পর্দা পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে অধস্তন ও অক্ষম করে রাখার একটি হাতিয়ার।

সে যাই হোক, পর্দা নিয়ে যত বিতর্ক থাক তা ভিন্ন প্রসঙ্গ; আপাতত এইটুকু বলতে চাই অধস্তনতা থেকে মুক্তির প্রয়োজন আছে। না হয় ব্যক্তিত্ব খর্ব হয়; তাই নারীদের যদি পর্দা করতে মনই চায় , আপন ইচ্ছেয় করুন ; ইসলামকে উপলব্ধি করুন; ধর্মকে আচার পালন সর্বস্ব না করে শুধু উপলব্ধি করুন আগে, তাতেই মুক্তি, তাতেই কল্যাণ।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.